“তোমাকে তুমিই বলছি, রাগ করো না, তুমি ফকিরের ছোট ভাই।”
“বেশ বলুন।”
কিকিরা যে অন্ধকারে সন্তর্পণে কী করছিলেন, ফকিরও জানতে পারছিল না। কিকিরা বললেন, “এই কুঠিবাড়ি নিয়ে তোমাদের দুই ভাইয়ের ঝগড়ার মিটমাট হয় না?”
অমূল্য রাগল না, তবু গলার স্বর অন্যরকম শোনাল। “আপনি আমাদের মধ্যে নাক গলাতে কেন এসেছেন? বাড়ির ব্যাপার বাড়ির মধ্যেই মিটে যাওয়া ভাল।“
“তুমি আমায় ভুল বুঝছ! আমি নাক গলাতে আসিনি। তা ছাড়া আমি এসে খারাপ তো কিছু করিনি। ধরো, এই বাড়ির মধ্যে যে-জিনিসটা রয়েছে সেটার হদিস তো পেয়েছি।”
এবারে অমূল্য উপহাসের গলায় বলল, “আমার চোখে আপনি ধূলো দেবার চেষ্টা করবেন না। কলকাতা থেকে দুটো ছোকরার সঙ্গে করে এনেছেন। তার মধ্যে একটাকে আপনি পুলিসের নোক বলে চালাতে চাইছিলেন। সে ডাক্তার।”
কিকিরা ঘাবড়ালেন না। বললেন, “তোমার সব দিকে নজর আছে। লোকজনও জায়গা-মতন রেখে দিয়েছ, দেখছি। ফকিরের বাড়িও বাদ দাওনি। কিন্তু, এই ব্যাপারটায় ভুল করছ।”
“কোন ব্যাপারে?”
“এই বাড়ির মধ্যে কী আছে, তা আমি জানতে পেরেছি।”
“অসম্ভব। আপনি পারেন না।”
“বেশ, তা হলে তুমি আমার জানার একটা নমুনা দেখো। …যেখান দিয়ে তুমি উঠে এসেছ, সেখানে যাও। ওই জানলাটার কাছে। প্রথম জানলার ডান দিকের কাঠের মাথার দিকে হাত দাও। একটা জায়গায় ছোট্ট গর্ত-মতন দেখবে। একটা আঙুল বড় জোর ঢুকতে পারে। সেখানে আস্তে-আস্তে চাপ দাও…। সোজা চাপ দেবে। যখন বুঝবে লোহার মতন কিছুতে আঙুল ঠেকছে–তখন জোরে চাপ দেবে। যাও, দেখো।”
অমূল্য সামান্য চুপ করে থাকল, ভাবল।”কী হবে চাপ দিলে?”
“যা হবে, দেখতেই পাবে। জানলার ডান দিকের কাঠ সরে ফোকর বেরুবে।”
“আপনি যে সত্যি কথা বলছেন, তার প্রমাণ কী?”
“দেখতেই পাবে। সাধুবাবা ওই জিনিসটি হাতছাড়া করেননি।”
“তা হলে আপনিই বা করছেন কেন?”
“আমি যা বলেছি তুমি মন দিয়ে শোনোনি। আমি বলেছি, হদিস পেয়েছি, বলিনি সেটা আমার হাতে এসেছে।”
“আপনি হদিস পেয়েছেন অথচ হাতাননি? দাদা আপনাকে বৃথাই এনেছে?” অমূল্য বিদ্রূপ করল যেন।
“না, হাতাতে পারিনি। এক জায়গায় আটকে গিয়েছি।”
অমূল্য আর কোনো কথা বলল না, জানলার দিকেই ফিরে গেল।
কিকিরা তাঁর সেই ছড়ির মধ্যে থেকে লিকলিকে গুপ্তিটা আগেই বার করে নিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে নিঃশব্দে উঠলেন। ওঠার আগে ফকিরের হাতে। চাপ দিলেন সামান্য।
অমূল্য জানলার কাঠের ফ্রেমে হাত রেখে দাঁড়াল। বন্দুকটা বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে কাঠের চারদিক হাতড়াতে লাগল।
কিকিরা ছায়ার মতন অমূল্যর পিছনে গিয়ে গুপ্তির ডগাটা একেবারে তার ঘাড়ের কাছে ছোঁয়ালেন।
চমকে উঠে অমূল্য হাত নামাল।
কিকিরা শান্ত গলায় বললেন, “বন্দুক ধরার চেষ্টা আর কোরো না। আমার। গুপ্তি দিশি নয়, বিলিতি, উইনস্টন কোম্পনির, তোমার গলা ফুটো হয়ে যাবে।”
অমূল্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিকিরা ফকিরকে টর্চ জ্বালতে বললেন। টর্চ জ্বালালেন ফকির! আলোয় অমূল্যকে দেখা গেল। কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে।
কিকিরা তারাপদকে বন্দুকটা সরিয়ে নিতে বললেন। তারাপদ এগিয়ে এসে বন্দুক সরিয়ে নিল। একনলা বন্দুক।
ফকির কিকিরার পড়ে-থাকা টর্চটা মাটি থেকে উঠিয়ে নিয়ে সেটাও জ্বেলে ফেললেন।
সামান্য চুপচাপ। কিকিরা অমূল্যকে ঘুরে দাঁড়াতে বললেন।
জোড়া টর্চের আলোয় অমুল্যকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কালো প্যান্ট, কালো জামা, পায়ে মোটা কেডস। স্বাস্থ্যবান চেহারা।
কিকিরা বললেন, “তুমি যথেষ্ট সাহসী; কিন্তু চালাক নও। আমি ম্যাজিশিয়ান, কথায় ভুলিয়ে দশ আনা কাজ হাসিল করি। যাক গে, তোমার সঙ্গে সরাসরি কয়েকটা কথা বলতে চাই। ফকির এখানে রয়েছে। কথা বলতে রাজি আছ?”
অমূল্য ভাবল কিছু। বলল, “রাজি। কিন্তু একটা কথা, আমি আপনাদের কাউকে গুলি করতে চাইনি। চাইলে করতে পারতাম। আমার গুলি ফসকায় না। তা ছাড়া, আমি কিন্তু একা আসিনি। আপনাদের মতন আমারও লোক আছে নিচে। আমার যদি কোনো ক্ষতি হয়, তা হলে..”
কিকিরা বললেন, “না, তোমার ক্ষতি হবে না। আমি জানি, তুমি আমাদের কারও ওপর গুলি চালাওনি।”
“বেশ, তা হলে বলুন।” কিকিরা গুপ্তিটা নামিয়ে নিলেন। বললেন, “তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে এই কুঠিবাড়ি নিয়ে রেষারেষি শুরু হল কেন হঠাৎ?”
অমূল্য কোনো জবাব দিল না।
কিকিরা বললেন, “সাধুবাবা এখানে আসার পর তোমাদের এই রেষারেষি। ওই সাধুবাবা যে তোমাদের ছোটকাকা, তা নিশ্চয় জানতে পেরেছিলে!”
“পেরেছিলাম। কাকা নিজেই লোক মারফত গোপনে খবর দিয়েছিল।”
“তাঁকে তোমরা বাড়িতে নিয়ে যাওনি কেন?”
অমূল্য একবার ফকিরের দিকে তাকাল।”সেটা অসম্ভব ছিল।”
“তোমাদের কাকা তা হলে এখানে এসেছিলেন কেন?”
“দাদাকে জিজ্ঞেস করুন।”
কিকিরা ফকিরের দিকে তাকলেন।
ফকির সামান্য চুপচাপ থাকার পর বড় করে নিশ্বাস ফেললেন। বললেন, “আমি যা বলতে চাইনি, কিঙ্কর, এবার আর তা না বলে উপায় নেই। আমি যা বলছি, তা সত্যি। …আমাদের ছোটকাকা আমাদের বংশের কুলাঙ্গার। অনেক কাল আগের কথা, আমার বাবা, মেজকাকা–মানে অমূল্যর বাবা–দুজনেই জীবিত। মেজকাকার নতুন বাড়িও তৈরি হয়ে গিয়েছে। আমাদের তখন বয়েস কম, বাড়িতে প্রায়ই ছোটকাকাকে নিয়ে গণ্ডগোল হতে শুনতাম। দিন দিন অশান্তি বেড়েই চলল। শেষে একদিন ছোটকাকা উধাও হয়ে গেল। কিছুদিন পরে ফিরে এল গেরুয়া পরে। আবার একদিন উধাও। তারপর শুনলাম, কাকা আমাদের বংশের সমস্ত সৌভাগ্যের যা মূল সেটা চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। আমাদের বাড়িতে চার পুরুষের এক মনসামূর্তি ছিল, সোনার মুর্তি, অপরূপ দেখতে, মূর্তির চোখে হীরে। আরও কিছু দামি পাথর ছিল গায়ে। মূর্তির সঙ্গে ছিল একটা সোনার সাপ, তার দু চোখে দুটো লাল চুনি। এই মূর্তি কোনোদিন বাইরে থাকত না, থাকত সিন্দুকের চোরা-খোপের মধ্যে। মনসাপুজোর দিন তার পুজো হত বাড়িতে। ঠাকুরঘরে। আবার সেটা সিন্দুকে তুলে রাখা হত।” ফকির থামলেন, যেন একটু দম নিচ্ছিলেন।
