চন্দন বলল, “এই কাঁচা কাজটা করলেন কেন, কিকিরা? একেবারে আলটিমেটাম দিয়ে দিলেন?”
“উপায় ছিল না।”
“কিন্তু কুঠিবাড়িতে কী আছে, আপনি জানেন না।”
“জানি না বলেই তো ধাপ্পা দিলাম।”
“ধাপ্পায় যদি কাজ না হয়?”
“না হলে আর কী করব! …তবে আমি যা যা সন্দেহ করেছিলাম, তার অনেকগুলোই মিলে গেল।”
“যেমন?”
“যেমন ধরো প্রথম হল, ফকির সব কথা বলছে না। দুই হল, ফকিরের ছোটকাকা বেঁচে আছেন। তিন হল, কুঠিবাড়ি নিয়ে সমস্ত গণ্ডগোল বেধেছে। সাধুবাবা এখানে আসার পর, কাজেই ওই কুঠিতে এমন-কিছু আছে, যার কথা সাধুবাবা ছাড়া অন্য কেউ জানে না…।”
কথার মধ্যে তারাপদ বলল, “আপনার কথা থেকে মনে হচ্ছে, ফকির আর অমূল্য দুই তরফই সাধুবাবাকে চোখে-চোখে রেখেছিল।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“চিনতে পেরেছিল বলে।”
“কাকা বলে চিনতে পেরেছিল?”
“অবশ্যই।”
“তা হলে বাড়িতে আনল না কেন?”
“জানি না। হয়ত আনতে চায়নি।”
চন্দন বলল, “আপনার বন্ধু ফকিরই আপনাকে ঠকাল, কিকিরা।”
কিকিরা বললেন, “আমি এই ব্যাপারটায় বড় অবাক হয়ে গিয়েছি, চন্দন। ফকির কেন এমন করবে? …যাক গে, কালই এর একটা হেস্তনেস্ত করব, না হয় পরশু।“
.
১০.
পূর্ণিমার পরের দিন কিকিরা দলবল নিয়ে ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে হাজির হলেন। তখন সন্ধে হয়-হয়। কুঠির বাইরে জিপগাড়িতে লোচন আর নকুল। চারদিকে নজর রেখে বসে থাকার কথা, কিন্তু এই বিশাল কুঠিবাড়ির চারদিক তাদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। যতটা চোখ যায়, দেখছিল। কাল কোজাগরী গিয়েছে, আজও ফুটফুটে জ্যোৎস্না, আকাশ মাঠ ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়।
কিকিরা আজ ফকিরকে সঙ্গে নিয়েছেন। ফকির প্রথমটায় আসতে চাননি, কিকিরা তাকে বুঝিয়ে বলেছেন, “তোমার যাওয়া দরকার। তুমি না গেলে আমার কাজের কাজ কিছুই হবে না। কাজেই, ফকিরও এসেছেন। সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন।
নিচের তলায় ঘোরাঘুরির কোনো দরকার ছিল না; সোজা দোতলায় উঠে এসে কিকিরা বারান্দায় দাঁড়ালেন। সন্ধে যত ঘন হয়ে আসছে, জ্যোৎস্না তত উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। গাছপালার মাথায় জ্যোৎস্না, অর্ধেকটা বারান্দায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে। চারদিক নিঝুম। বাতাস দিচ্ছিল। অনেকটা তফাতে রাশি-রাশি জোনাকি উড়ছে।
কিকিরার হাতে বড় টর্চ, আর সেই সরু ছড়ি। ফকিরের হাতেও রড় টর্চ। তারাপদর এক হাতে লণ্ঠন বাড়ি থেকে বয়ে আনতে হয়েছে; কেননা, কুঠিবাড়ির ঘরে যে-লণ্ঠনটা আছে, সেটা জ্বলবে কি না কে জানে। এসব কিকিরার পরামর্শ। তারাপদর অন্য হাতে একটা ঝোলানো ব্যাগ, তার মধ্যে খুচরো কতক জিনিস, চন্দনের কাঁধে বন্দুক। ফকির বন্দুকটা সঙ্গে করে এনেছেন। চন্দন বন্দুক বইছিল।
বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কিকিরা ফকিরকে বললেন, “চলো, ঘরে যাই।”
দোতলায় সেই ঘর যেমন ছিল, সেই রকমই পড়ে আছে। তারাপদ লণ্ঠনটা জ্বালাল। কিকিরা জানলা দুটো খুলে দিলেন।
চারজনে বসে-বসে সিগারেট শেষ করলেন। তারাপদ একবার বারান্দায় গেল, ফিরে এল।
ফকির বললেন, “তুমি কি সত্যিই মনে করো, অমূল্য আসবে?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “আসবে। আসা উচিত।”
চন্দন বলল, “যদি না আসে?”
“তা হলে বুঝব, আমার চালাকি খাটল না।”
ফকির আর কিছু বললেন না। চন্দন তারাপদকে নিয়ে আবার বারান্দায় চলে গেল।
সময় যেন আর কাটছিল না। চুপচাপ বসে থাকাও যায় না। কিকিরা ফকিরের সঙ্গে মাঝে-মাঝে কথা বলছিলেন। তারাপদ আর চন্দন ঘরে এল।
তারাপদ বলল, “কোথাও কোনো ট্রেস পাচ্ছি না কিকিরা, অমূল্য বোধহয় এলেন না।”
কিকিরা বললেন, “দেখো, শেষ পর্যন্ত কী হয়।”
আরও খানিকটা সময় কাটল। কিকিরা উঠে ঘরের মধ্যে পায়চারি করলেন। ফকিরকে মাঝে-মাঝে এ-কথা সে-কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। আবার একসময় ফিরে এসে লোহার খাটটায় বসলেন।
ফকির ক্লান্ত হয়ে হাই তুললেন। চন্দন হতাশ হয়ে নিশ্বাস ফেলল। বলল কিছু।
কিকিরাও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।
হঠাৎ একেবার আচমকা ঘর কাঁপানো শব্দ হল, আর সঙ্গে-সঙ্গে ছিটকে গেল লণ্ঠনটা, কাঁচ ভাঙল, মাটিতে পড়ে দপদপ করে জ্বলতে জ্বলতে নিবে গেল। ঘরের মধ্যে কেমন ধোঁয়াটে ভাব, কেরোসিম আর গন্ধকের গন্ধ।
কিকিরা আর ফকির প্রায় লাফ মেরে খাটের তলায় বসে পড়েছেন ততক্ষণে, তারাপদ আর চন্দন দেওয়ালের দিকে সরে গেছে।
জানলার দিকে তাকালেন কিকিরা। জানলা দিয়ে এসেছে গুলিটা। ঘর অন্ধকার। টর্চ জ্বালানো উচিত নয়, জ্বালালেই বিপদ। কিকিরা ফকিরের হাতে। চাপ দিলেন, ফিসফিস করে বললেন, “টর্চ জ্বেলো না।”
ঘর থমথম করতে লাগল।
জানলা দিয়ে কেউ ভেতরে আসছিল। বাইরের জ্যোৎস্নার দরুন তাকে অস্পষ্ট, ভুতুড়ে ছায়ার মতন দেখাচ্ছিল।
“কে, অমূল্য?” ফকির অস্ফুট গলায় আচমকা বললেন।
মূর্তি ততক্ষণে ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে, জানলার কাছে। বলল, “হ্যাঁ।”
“তুমি আমাদের ওপর বন্দুক চালালে?”।
“বন্দুক চালাইনি। পটকা চালিয়েছি। বাতিটা নিবিয়ে দিলাম। টর্চ। জ্বালাবার চেষ্টা করো না। তোমার সেই পুরনো বন্ধু কোথায়?”
ফকির চুপ করে থাকলেন। কিকিরা জবাব দিলেন, “আমি হাজির। রয়েছি।”
“হাজির রয়েছেন, তা জানি। আমিও হাজির। আপনি আমায় আসতে বলেছিলেন?”
“শশিপদ বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
“হ্যাঁ, বলেছিলাম।”
“কেন?”
“কথা বলব বলে।”
“কিসের কথা?”
