কোনো সাড়া নেই।
মা মন্টুর সাড়া নেই কেন!
মা শুনতে পাচ্ছে না কিছু। বিছানায় শুয়ে থেকেই বলছে, কিছু বলছিস জয়া।
মন্টু কোথায় মা?
মন্টু কোথায় জানি না, তো।
আজ আসুক! মাথাটা ভাঙব—বাড়ি না থাকলে স্বাধীন।
বাথরুম থেকে বের হয়ে ঘাড় গলা এবং চুল মুছতে নীল আলোটা জ্বেলে দিল করিডোরের। তারপর ফের ডাকল, মন্টু তুমি কী আমার মতো মরেছ!
মন্টু বলল, যাই দিদিমনি! আমি মরিনি।
দ্যাখ তো, মানুবাবু বাড়ি আছে কিনা!
কিছু বলব?
থাকলে এই চিঠিটা দিয়ে আসবি। খুব দরকার।
আর এসব কথাগুলো বলতে গলা কাঁপছিল জয়ার এবং কেমন একটা জ্বরের মতো ঘোরে পড়ে আছে। ঘোরের ভেতরই সে এতসব করতে পারছে। সামান্য অসুস্থতা শরীরে না জন্মালে বুঝি এতটা বেপরোয়া হওয়া যেত না। সে হাত পা লম্বা করে শুয়ে পড়ল। আলোটা চোখে বড় লাগছে। উঠে আলোটা নিভিয়ে দিল। এবং পৃথিবীতে মা বাবা কিংবা পিসির আদুরে সব ন্যাকামো চিন্তাভাবনা কিছুই আর মাথায় নেই। কেবল এক যুবককে দেখতে পাচ্ছে, সুদূর থেকে হেঁটে আসছে, কত কাল, কত যুগ ধরে হেঁটে আসছে আর বারবার শরীরে মিশে যাচ্ছে। সে কেমন জ্বালা বোধ করল। চোখ জ্বলছে। ওর মনে হচ্ছিল, মানু আসতে না আসতেই সে মরে যাবে।
স্কুটারটা কিছুদূর বাতাসে ভেসে গিয়ে ঝুপ করে একটা জায়গায় থেমে গেল।
রমা বলল, কী হল অরুণ!
অরুণ দেখল, নাকের ডগা দিয়ে আর একটা স্কুটার বের হয়ে যাচ্ছে। এত দ্রুত বের হয়ে গেল বোঝা গেল না কিছু। আরোহী একেবারে বাঘের মতো বাতাসের ওপর দিয়ে লাফিয়ে চলে গেল। মরীচিকা মতো সে কিছু দেখেই তার গতিপথ পালটে সামনের আরোহীকে ধাওয়া করল।
রমা বলল, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ!
অরুণ কিছু বলল না। চোখে ভারী গগলস। মাথায় লোহার টুপি এবং কোমরে বেল্ট থাকলে তাকে এখন দস্যুর মতো মনে হতে পারত। সে রেড রোড ধরে হাওয়ার আগে ছুটে যেতে চাইছে।
রমা দেখল, নিমেষে বাস—স্ট্যান্ড পার হয়ে কখন মিন্টের পাশ দিয়ে অরুণ বেগে ছুটে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে স্কুটারের স্পিড তোলার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কোথায় যাবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
স্কুটারটা বাঁক ঘুরতেই দূরে আর একটা স্কুটার রমার চোখে ভেসে উঠল। ঠিক ওর মতো কেউ যেন পিছনে বসে রয়েছে। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সোজা ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে একটা হলুদ বলের মতো দিগন্তে চলে যাচ্ছে স্কুটারটা। রমা এবার আর্ত গলায় বলল, অরুণ কোথায় যাচ্ছ! এত জোরে চালিয়ো না। মরে যাব অরুণ।
অরুণের যেন কিছু শোনার সময় নেই। সামনে আড়াল পড়ছে একটা ট্রাকের। দেখা যাচ্ছে না আর। সূর্য এবার দিগন্তে হেলে পড়ছে। কিছু কাঞ্চন ফুলের গাছ দু—পাশে। মাঠ, জলা জমি, উর্বরা শস্যক্ষেত্র পার হয়ে সে চলে যাচ্ছে। রমা কিছুতেই আঁচল কোমরে গুঁজে রাখতে পারছে না। খোঁপা খুলে গেছে। এবার সব চুল পালের মতো উড়বে। সামনের ট্রাকটা অরুণ নিমেষে পার হয়ে গেল। জীবন নিয়ে এক আশ্চর্য ছিনিমিনি খেলায় মেতে উঠেছে অরুণ। দূরের স্কুটার তার আরোহী এবং যুবতী কিছু যেন চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে, অরুণ যত দ্রুত পারছিল তাদের চেষ্টা করছে ধরার।
রমা বলল, অরুণ তোমার কী হয়েছে।
বাতাসের বিশাল থাবায় সব শব্দ গন্ধ ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। রমার কোনো কথাই আর তার কাছে স্পষ্ট নয়। সে কেবল পাগলের মতো হাঁকপাঁক করছে সামনের স্কুটারটা ধরার। আর তারপরই বিশাল একটা দ্রুতগামী যান উঠে এল রাস্তায়। সবকিছু আড়াল দিয়ে একেবারে চিরস্থায়ী হয়ে গেল। যেন আশ্চর্য নিয়তি খাড়া হয়ে আছে সামনে। দ্রুতগামী যান নিশ্চল নিথর। সে চিৎকার করে উঠল, শা…আর কিছু প্রকাশ করতে পারল না। টলতে টলতে স্কুটার থেকে নেমে লাফিয়ে গেল সামনে। আর দূরে দেখল স্কুটারটা বিন্দুবৎ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমে ছোটো হতে হতে তার আর দেখা পাওয়া গেল না। প্রকৃতি ভীষণ নির্দয় নিষ্ঠুর। হা হা করে যেন গাছপালা মাঠ, আকাশ হাসছিল।
রমা বলল, কী হয়েছে তোমার।
পেছনে কে বসেছিল।
রমা বলল, লোকটার কেউ হবে।
তুমি মেয়েটার মুখ দেখেছ?
স্পষ্ট কিছু দেখিনি। চুল খোলা ছিল।
অরুণ কেমন নিস্তেজ গলায় বলল, আমি শেষ।
কী বলছ যা তা!
আমার আর অহংকার করার মতো কিছু থাকল না।
অরুণ কী হয়েছে তোমার, বলবে তো?
কিছু হয়নি। চলো।
এবং সোজা সে রমাকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, একটা ফোন করব।
রমা অরুণকে নিয়ে নিচের তলায় গেল। ফোনে অরুণ বলল, অমলা আছে?
কে?
আমি অরুণ বলছি।
ও অরুণ মেসো। কেমন আছেন।
অরুণ বুঝতে পারল না কে কথা বলছে। বিরক্তি এবং অধৈর্য আর কী যে বলবে, যেন পারলে সে এখন গালাগাল দিতে পারলে বাঁচে। তারপরই মনে হল মেজদির ছেলে এখানে বেশ কিছুদিন থেকে আছে। বেয়াদপ ছোকরাটার সঙ্গে তার এখনও দেখাই হল না। যখনই গেছে তখনই শুনেছে বাড়ি নেই। বোধহয় সেই। এবং এতসব ভাবার তার সময়ও ছিল না। তড়িৎপ্রবাহের মধ্যে সব কথাগুলি বড় দ্রুত টরে টক্কা বাজিয়ে গেল। সে বলল, অমলা আছে?
অমলা মাসির কথা বলছ?
তবে আর কার কথা বলব?
অমলা বলতে কত মেয়ে আছে পৃথিবীতে।
সামনে থাকলে হয়তো গালে চড় বসিয়ে দিত একটা। ছোকরার মার সঙ্গে বনিবনা হল না বলে এখানে চলে এসেছে। অমলা কতবার নাকি বলেছে, যাস আমাদের বাসায়। ধুস সে কেন আবার মাথার মধ্যে এতসব টরে টক্কা নিয়ে বেঁচে থাকবে। চোখমুখ জ্বলে উঠছিল। রাগে দুঃখে সে কী যে বলে ফেলত। কিন্তু নিজেকে খুব সামলে নিয়ে বলল, মিতা আছে? মিতাকে ফোনটা দাও।
