ভুবনবাবু সহসা জেগে ওঠার মতো তাকালেন। বললেন, তুমি এখনও আছো!
থাকব না কেন। সহজ কথাটা মেনে নিতে এত বাধে কেন!
ওরা বাড়ি না থাকলে তোমার কষ্ট হয় না?
ওরা বড় হয়েছে।
বড় হলেও তুমি মা। তোমাকে তো কেউ বলে না, মা তুমি কেমন আছো?
ওরা ভালো থাকলেই আমি ভালো। সেটা বুঝতে পারে।
ওরা কী সত্য ভালো আছে!
আছে বইকি।
তোমার চোখ নেই নীরজা। তুমি কিছু টের পাও না।
সব টের পাই। মানুষ শিখতে শিখতে বড় হয়। একটু কিছু শিখুক না।
এটা তো শেখা না, শরীরকে পীড়ন করা।
নীরজা বলল, সবই সংসারে দরকার হয়। তোমার মতো ওরা যে ভীত হয়নি, উদাসীন হয়নি, এতে আমার সাহস বাড়ে।
তুমি কী সত্যি সত্যি তবে এটা চাইছ?
আমি কে চাইবার! চাইলেও যা হবে, না চাইলেও তাই হবে। সেজন্যে ভাবি না। সময়মতো সবাই ঠিক ফিরে আসে।
তোমার কথা শুনলে মনে হয় নীরজা, পৃথিবীতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না। সময়ে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়।
নীরজা এবার কী বলবে ভেবে পেল না। ধীরে ধীরে পরাজিত হওয়ার মতো বলল, ওরা তোমার সন্তান, তেমন কিছু করবে না।
ভুবনবাবুর মাথাটা আবার ঝুঁকে গেল। বলল, নীরজা, ওরা তোমারও সন্তান। ভুললে চলবে কেন!
আঠারো
কলেজ থেকে ফেরার পথে পিয়া মাঝে মাঝে মোড়ের পানের দোকানটার সামনে দাঁড়াত। বলত, তুই দাঁড়া, আমি একটা পান খেয়ে আসছি। সে পানের খিলি এনে বলত, তুইও খা। দেখবি কী সুন্দর লাল টুকটুকে ঠোঁট হয়। সামান্য পান চিবিয়ে ঠোঁট উলটে দেখাত, কীরকম রে!
খুব লাল।
জয়া বলত, আমার লাল হয় না।
যে যত বেশি ভালোবাসতে জানে তার ঠোঁট তত লাল হয় জানিস।
অদ্ভুত সব কথা বলত পিয়া। আমি এখন ভালোবাসায় ডুবে আছি। কী সুখ কথাটা বলেই পিয়া চোখ বুজে ফেলত। মুখটা পিয়ার আশ্চর্য লাবণ্যে ভেসে যেত। চোখ ভারী ভারী দেখাত। চিবুক রাঙা হয়ে উঠত। গোপনে বোধহয় পিয়া কিছু করছে। লজ্জা সংকোচ পিয়ার একদম আজকাল নেই। সুখ কত তীব্র একদিন জানার ইচ্ছে হয়েছিল জয়ার। বলেছিল, এই তোর কেউ আছে?
বলব কেন?
বল না। আমি কাউকে বলব না। আমারও তো কী যে হয় রে। রাতে বিছানায় গেলেই যেন একজন যুবার শরীর আমার পাশে শুয়ে থাকতে চায়। এত দুষ্টুমি আরম্ভ করে দেয় কী বলব, ঘুমই আসে না।
যুবকটি কে? আমি চিনি? প্রিয়া বলল।
পৃথিবীর সব যুবকদেরই বলতে পারিস। সুন্দর মতো যুবক দেখলেই সারাদিন মনটা আনচান করে। রাতের বেলা কী করি বল। বিছানায়ও দেখতে পাই সে লম্বা হয়ে পাশ ফিরে আছে।
পিয়া বলল, খুকি। তোমার কিছু হবে না।
আমার ভয় করে।
এবং এই ভয় সূত্রে ধীরে ধীরে তার সব জানা হয়ে গেছে। কোথায় কত নম্বর ধর্মতলায় কত টাকার বিনিময়ে শরীর ফের পবিত্র হয়ে যায় তাও তার জানা। কী কী ব্যবহারে রহস্যময় আধারে ডুব দিলেও দাগ ধরে না তা জানতেও বাকি নেই। কেবল ভেবেই গেছে। মানুই তার একমাত্র মানুষ যার কাছে সহজেই সে তার ইচ্ছের কথা বলতে পারে। মানুকে সে যেটুকু দিয়েছিল, পৃথিবীর কোনো কাকপক্ষী টের পায়নি, জয়া মানুর চোখে চুমো খেয়েছে! কী আরাম! ট্রামটা তখন গড়িয়াহাটের মোড়ে এসে গেছে। এখানে নেমে উলটোদিকে যাবে। পঁয়তাল্লিশ নম্বরেই সহজ হবে। কালিদাসকে না হলে এড়ানো যেত না। সে ভাবল এবার সেই দোকানটায় যাবে। একবার পিয়া লাল ত্রিকোণ চিহ্নিত কিছু কিনে বলেছিল ‘তুইও কিনে নে’। কখন কাজে লেগে যাবে টেরও পাবি না। সে পিয়ার মতো মহিলা হতে পারেনি, বরং পিয়ার এমন একটা নষ্ট চরিত্র তাকে পীড়া দিয়েছে। অথচ আজ ওর কী যে হচ্ছে যেন সে লাল ত্রিকোণের সাহায্য না নিয়ে কিছুতেই আর বাঁচবে না। মানুটা কোথায় কী করছে কে জানে।
সে খুব বিনীতভাবে কথাটা বলল। এবং দোকানি বোধহয় সামান্য বিস্মিত হয়েছে কথাটায়। কারণ এ মুখ তার ঠিক চেনা নয়। এখানে এ—পাড়ায় কোনো কোন বাড়িতে কী কী ভাবে পরিবার পরিকল্পনা চলছে মোটামুটি তার জানা। জানাশোনার ভিতর এ মেয়েটা কিছুতেই পড়ছে না। জয়া মুখ ঘুরিয়ে প্যাকেটটা কিনে কোনোরকমে দোকানিকে সে দু টাকার নোট দিয়ে দিল। এত বেশি ঘামছিল যে কিছুতেই ফেরত পয়সাটা আর হাত পেতে নিতে পর্যন্ত পারেনি। এবং বাসে উঠেও মনে হয়েছিল সবাই দেখে ফেলেছে। কার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই ওর ভীষণ সংকোচ হচ্ছিল।
সারাটা বাস কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। এবং সেই প্রবল এক পুরুষ বিশাল দু বাহু নিয়ে সাপটে ধরেছে এমনই একটা দৃশ্য সারাক্ষণ চোখের ওপর ভেসে চলছিল। শহরের গাছপালা, বাড়ি, ঘর, ট্রাম, বাস, ভিড় কিছুই সে অনুভব করতে পারছিল না। বটুয়ায় সেই নিষিদ্ধ বস্তুটি সারাক্ষণ তাকে উদভ্রান্ত করে রেখেছে।
এবং সে বাড়ি ফিরে এলেই মা বলল, জয়া এলি। আমার পাশে একটু বোস না। সারাদিন কোথায় যে টো টো করিস।
বারে আজ আমাদের কবিতার আসর ছিল না।
কোথায়?
কালিদাস বিনয় এসে নিয়ে গিয়েছিল। ভবানীপুরের দিকে।
তুই কবিতা পড়লি?
বারে পড়ব না।
কোন কবিতাটা পড়লি।
ওগুলো তোমাকে শুনাই নি।
জয়া যে কবিতা পাঠ করেনি, সে চলে এসেছে এবং ভেতরে মানু নামক যুবকের ভয়ংকর দাপট সারাক্ষণ মাতালের মতো রেখেছে, এবং এই বটুয়ার ভেতরে রয়েছে এক সঞ্জীবনী সুধা, যার বিনিময় সে জীবনে প্রথম গভীরে আরও সুগভীরে ঢুকে যাবার জন্য ছটপট করছে—সে সম্পর্কে মাকে কিছুই আঁচ করতে দিল না। খুব স্বাভাবিক গলায় গান গাইল। হাতের আঙুল বটুয়া ঘোরালো! পায়ে পায়ে বাঘা ঘুর ঘুর করল। সেলফের অত্যধিক নিচে লুকিয়ে রাখল তার অন্তর্যামীকে। এবং বাথরুমে ঢুকে তারপর শুধু স্নান। কী কী আছে এই শরীরে প্রায় নাভিমূলে সেই স্বর্ণ কেশদামের মতো অতীব বিলাসিনী রাই। সে স্নান করতে করতে ডাকল মন্টু মন্টু।
