ছোটমাসি নভেল পড়ছে।
তোমার ন’মাসি কোথায় জান?
মানে অমলা মাসি। সকালে একবার দেখেছিলাম। তারপর আর দেখিনি। দাদুকে ডেকে দেব। দাদু জানতে পারে।
এই দাদুই খেল ছোকরাটাকে। একটা কথার সোজা জবাব দেয় না। একেবারে সব সময় আশ্চর্য রকমের বেয়াড়া কথাবার্তা। অরুণ বলল, তাই দাও।
তখনই ও—পাশ থেকে আবার কথা—ছোটমাসি এসে গেছে।
তুই কার সঙ্গে এত কথা বলছিস নানু?
অরুণ মেসো। অমলা মাসিকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মানে?
মানে অরুণ মেসো জানতে চাইছে—এখানে অমলা মাসি আছে কি না। বলেই সে ফোন ছেড়ে আবার রা রা করে গান গাইতে থাকল।
অরুণ ও পাশ থেকে সব শুনে আরও অস্থির হয়ে উঠল। বুঝতে পারছে নানু নামে ছোকরাটা যথার্থই ইতর।
মিতা বলল, অরুণদা।
হ্যাঁ।
দিদিতো ছোটকাকার বাসায় যাবে বলে দুপুরে বের হয়ে গেছে। মুখটা অরুণের ভারি ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল।
তারপরই মিতা বলল, আপনি কোত্থেকে বলছেন? বাসায় দিদি ফিরে যায়নি।
অরুণের সত্যি মনে হল ভুল করে ফেলেছে। আগে বাসায় না গিয়ে এভাবে ফোন করা ঠিক হয়নি। কাকে না কাকে স্কুটারের পেছনে বসে থাকতে দেখে এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়া ঠিক হয়নি। সে কেমন নিস্তেজ গলায় বলল, না এমনি ফোন করেছিলাম। তারপর অরুণ ভাবল আর কী বলা যায়। শেষে সামান্য বানিয়ে বলল, বাসায় ফিরতে একটু দেরি হবে দিদিকে বলো।
যদি সোজা চলে যায়!
তা হলে আর বলতে হবে না। তোমাদের ফোন করতে পারে!
অরুণের মাথাটা তারপরেই কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। সামনে রমা দাঁড়িয়ে আছে—এই রমাকে নিয়ে আজ পাতালে প্রবেশ করার তালে ছিল—সামান্য একটা স্কুটার তার মাথার মধ্যে কীসব গণ্ডগোলের ছবি জুড়ে দিয়ে গেল—আর সেই থেকে কী যে ভীষণ সংশয়। সে পাগলের মতো রমাকে বলল, যাচ্ছি!
রমা অত্যন্ত ক্লান্ত অবসন্ন। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে পারছে না।
ভুবনবাবু তখন দৈনিক কাগজটা নীরজাকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন। নীরজা চোখে আজকাল ভালো দেখতে পায় না। দিনের বেলাতে সাত পাঁচ কাজের মধ্যে ডুবে থাকে। সন্ধের সময় তিনি নীরজাকে একটু অবসর বুঝে কাগজটা পড়ে শোনান। তিনি পড়তে পড়তে বললেন, শুনতে পাচ্ছ।
নীরজা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ পড়ে যাও না।
তিনি আবার বললেন, শুনতে পাচ্ছ। বাকিটা যেন এমন শোনাত সিঁড়িতে পায়ের শব্দ…।
তুমি পড়ে যাও না!
তিনি পড়লেন, বাড়ছে পারিবারিক হিংসা। কমছে মানুষের সহিষ্ণুতা। বিবাহ বিচ্ছেদ তো বাড়ছিলই। বাড়ছে আত্মহত্যা। অজ্ঞাত রহস্যময় মৃত্যু বিশেষত নারীদের। তিনি কাগজটা রেখে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাবেন ভাবলেন। কিন্তু যেতে সাহস পেলেন না! রমা বিপর্যস্ত হয়ে ফিরছে। হিংসা দ্বেষ লোভ, শারীরিক মোহ, স্বার্থপরতা সব মিলে মেয়েটার অস্তিত্বে ঝড় তুলেছে বুঝি।
রমা তখন সোজা বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিল। বিকট শব্দ করে জল চারধারে লাফিয়ে ছড়িয়ে ওকে ক্রমে ঠান্ডা করে দিতে লাগল। আর একটা ব্যথাতুর কাতর যন্ত্রণা শরীর বেয়ে যা তাকে সারাদিন অতিশয় সব নিষ্ঠুরতার ভিতর দৌড় করিয়ে মেরেছে ক্রমে শীতল হতে হতে কেমন হিমঠান্ডা হয়ে গেল। আর আশ্চর্য এত কান্না কেন বুক গুমরে উঠে আসছে তার! কী যে থাকে, অপমান আর লাঞ্ছনার যেন শেষ নেই জীবনে। যুবতীর সব ঐশ্বর্য হেলায় লোকটা আস্তাকুঁড়ে কোন অহংকারে ছুড়ে দিতে পারল বুঝল না। তার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল।
আরও রাত করে ফিরল ভানু। সে কেমন গুমরে বসে থাকল কিছুক্ষণ। মানু ফিরে এলে নীরজা বলল, জয়া তোকে যেতে বলেছে কী একটা বই নিয়ে। মানু বলল, কাল যাব।
দুবার খোঁজ করেছে। তাছাড়া একটা ছেলে এই চিঠিটা দিয়ে গেছে। নীরজা বলল।
করুকগে। মানু রেডিয়োর নব ঘুরিয়ে আর একটা নতুন সেন্টার ধরার চেষ্টা করার সময় চিঠিটা খুলে ফেলল—সেই অহংকারী ছেলেটার চিঠি। চিঠিতে লিখেছে, বুঝতে পারছি তুমি আর ভালো নেই। বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় মানুষ ভালো থাকে না। এখন চাই সৎ মানুষ, পরিশ্রমী মানুষ। ঠিকঠাক বেঁচে থাকার জন্য আজ এটা আমাদের বড় বেশি দরকার। মানু রেডিয়ো বন্ধ করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সামনে বিরাট উদার আকাশ। তার নিচে কত অবহেলিত জনপদ। সে যেন কবে থেকে কোথাও যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠছে।
সবাই ঠিক ঠিক ফিরে আসায় ভুবনবাবু আজকের মতো রাতে ভালো ঘুমাতে পারবেন। কাল পরশু এবং তারপর অন্য কাল পরশু কী হবে তিনি জানেন না। শুধু এটুকু জানেন, যতদিন আছেন নির্বিঘ্নে আর জীবন কাটাতে পারবেন না। সমস্যা দিন দিন সবার মতো তারও কেবল বাড়ছে। আগে একমাত্র সমস্যা ছিল তিনি নিজে, নীরজা এলে দু’নম্বর সমস্যা। সন্তান হলে তিন নম্বর সমস্যা। ওরা যত বড় হতে থাকল, তত অজস্র সমস্যায় নিপীড়িত হতে থাকলেন তিনি।
উনিশ
নানুর ঘুম আসছিল না। সে পাশ ফিরে শুল। জানালা খোলা। আকাশে কিছু নক্ষত্র। সে শুয়ে শুয়ে এক দুই করে নক্ষত্র গুনতে থাকল। সব দেখা যায় না। যতবার গুনছে ততবারই মনে হচ্ছে অসংখ্য নক্ষত্র বাদ পড়ে গেল। অনেকক্ষণ এসব করার পর হাতে মুখে জল দেবার জন্য বারান্দায় এল। পাশে বাথরুম। বাথরুমে ঢুকে ঘাড়ে গলায় জল দিল। চোখে জলের ঝাপটা দিল। বেশ নিশুতি রাত—কিছুক্ষণ বাইরের ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকল। একটা রেলগাড়ি এইমাত্র চলে গেল। শেষ বাস গুমটিতে ঢুকে যাচ্ছে। সে মানুর কাছে গিয়েছিল, ভেবেছিল মানু কলেজে আসবে। ওর সঙ্গে পরামর্শ করার দরকার ছিল। সে একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এত বড় শহরে মানুকেই সব খুলে বলতে পারে।
