দৌড়ে ছুটে মন্দাকিনী কাপড়চোপড় সামলে—যাই বাবা, আপনিতো খুব যা হোক ঘুমোলেন। কাকলি কখন গেছে ফেরার নাম নেই, ও ভানুবাবু ওঠো, বেলা যেতে দেরি নেই—সহসা এত সব কথা বলে মন্দাকিনী চোখে মুখে বাথরুমে ঢুকে জল দিতে লাগল। ভানুবাবু ফের সটান শুয়ে পড়েছে। এবং যত জোরে সম্ভব নাক ডাকাবার চেষ্টা করছে!
প্রিয়নাথই শেষ পর্যন্ত উঠে এসে ভানুবাবুর ঘুম ভাঙালেন। কী হে খুব যে ঘুম। তা হবে। এই বয়সে সব কিছুই বেশি বেশি থাকে। ঘুম, আহার, তারপর কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন প্রিয়নাথ কাকা। প্রিয়নাথকাকা কি শেষ কথাটা মৈথুন ভেবেছিলেন! সে উঠে পড়তেই মন্দাকিনী এক কাপ চা রেখে গেল। মুচকি হেসে গেলে বোঝা গেল দু’জনের ভেতর শেষ পর্যন্ত যখন জানাজানি হয়ে গেছে তখন সময় বুঝে আহারে বসে গেলেই হবে।
প্রিয়নাথকাকা তাঁর ঘর থেকে হাঁকলেন, হবে নাকি আর এক হাত।
ভানুবাবুর মন মেজাজ কেমন তিরিক্ষি হয়ে গেছে। এবং ভেতরে অসহ্য কষ্ট—বোধ, যেন যেটা হবার কথা ছিল, সেটা শেষ পর্যন্ত এই স্বার্থপর লোকটার জন্য হল না, তার সঙ্গে খেলতে তার আদপেই আর ইচ্ছে নেই। কিন্তু না খেললে সারাটাক্ষণ থাকে কী করে! এই একটা বড় রকমের সুবিধা প্রিয়নাথকাকা এ বাড়িতে আসার জন্য করে রেখেছে। হেলায় হারানো ঠিক না। সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে প্রিয়নাথকাকার ঘরে ঢুকে গেল। প্রিয়নাথ একবার মুখ তুলেও দেখল না। হাত তুলে ইশারায় বসতে বলল। তারপর কী ভেবে বললেন, বেশিক্ষণ খেলব না।
এবং কাকলী ফিরে এলেই খেলা বন্ধ করে উঠে পড়লেন। বললেন একটু ঘুরে আসি।
প্রিয়নাথকাকার এই ব্যবহারটা ভানু বুঝতে পারে। কাকলী ওর মায়ের প্রহরী। কিন্তু প্রিয়নাথকাকা কী জানে আজই মন্দাকিনী বউদি তাকে সাপটে ধরেছিল! এতদিন সে যেটা চাইছিল, কারণ ভানু বুঝতে পারে, তার ভেতর ভুবনবাবুর কাপুরুষতা বেশ বর্তে গেছে। কাপুরুষ না হলে এক স্ত্রীতে কেউ বেশিদিন মত্ত থাকতে পারে না। সব সময় মুখে সাধু সাধু ভাব, যেন গোল্লায় যাচ্ছে সব, এবং আহাম্মুকির এক শেষ। ভানু এ কারণেই নিজে সাহস করে সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। সে যুবতীদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশাও করেনি। তাছাড়া মেয়েদের চরিত্র সে ঠিক বোঝেও না। অনেক সুযোগ এ বাড়িতে সে আজ বুঝতে পারল, হেলায় হারিয়েছে। আজই স্পষ্ট বুঝতে পারল, সে যে লোভে এ বাড়িতে আসে মন্দাকিনী বউদির সেই লোভ। কেবল দুজনেই সাহসের অভাবে পরপর এতগুলো দিন অকারণে কাটিয়ে দিয়েছে।
প্রিয়নাথকাকা এখন ধর্মসভায় বসে ঈশ্বর সম্পর্কিত ভাবনায় ডুবে আছেন, না বাড়িতে বউমা কাকলী ভানুবাবু তিনজন কে কী করছে তার একটা ছায়াছবি চোখে তাঁর ভাসছে।
মন্দাকিনী তাড়া লাগাচ্ছিল, কাকলী পড়তে বসগে। ভানুবাবু এঘরে এসো। তুমি থাকলে ও পড়তে চায় না।
ভানু বলল, এই কাকলী পড়তে বোস। তোর মা বকছে আমাকে।
তুমি যাবে না। গেলে পড়ব না বলছি।
বউদি তোমার মেয়ে পড়বে না বলছে।
চুপ করো ভানুকাকা। সে মুখে দুহাত চাপা দিল ভানুর। তারপর কী ভেবে কেমন অভিমানের গলায় বলল, আচ্ছা পরে দেখবে। বলেই সে টেবিলে চলে গেল। ভানু দরজা পার হয়ে মন্দাকিনীর ঘরে ঢোকার মুখে বলল, যাই। খুব চিন্তা করবে।
মাসিমা জানে তুমি কোথায় আছো। মায়েরা সব বোঝে।
ভানু বলল, তবু এখন যাওয়া উচিত।
বাবা এসে খোঁজাখুঁজি করবেন।
বলবে চলে গেছি।
বোস না!
বসে কী হবে?
মন্দাকিনী মুচকি হাসতে পারল না এবার। ভেতরের দাহ আগুনের ফুলকির মতো দু চোখে ভেসে উঠল। কী যে করে! কিছু করতে না পারলে এই মহামূল্য সময় তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে। খুব বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছিল মন্দাকিনী। যেন এক্ষুনি পারলে কাকলীকে নীচের তলায় অথবা অন্য কোথাও ছলছুতোয় পাঠিয়ে এই সর্বনাশা আগুনের প্রজ্বলন থেকে রেহাই পায়। পবিত্র আধারে প্রবিষ্ট হতে না পারলে কারও আজ রেহাই নেই। সে দুবার উঁকি দিল। এবং কতটা বেপরোয়া হলে সে ঝাঁপিয়ে টেনেহিঁচড়ে ভানুবাবুকে তুলে নিতে পারে, এবং কাকলী যে ও ঘরে পড়ছে, মাথায় তাও কোনো বিদঘুটে শব্দ তুলছে না, কেমন একটা মাতাল রমণীর মতো দরজার পাশে আড়াল তৈরি করে ডুবে গেল তারা। কোনো পরোয়া নেই। প্রায় পাগলিনীর মতো সাপটে ধরেছে ভানুবাবুকে। এবং অতীব পবিত্রতা বিরাজ করছিল চোখে—মুখে। পৃথিবীর সবকিছু এখন এই নারী এবং পুরুষের কাছে অকিঞ্চিৎকর।
ও—ঘরে কাকলীর সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। বাথরুমে যাবার সময় মন্দাকিনী কেমন সতর্ক। এবং অপরাধীর মতো চোখ তুলে একবার দেখতেই বুকটা হিম হয়ে গেল। জানালায় চোখ কাকলীর। কেমন উদাস চোখমুখ। কাকলী কি…….আর ভাবতে পারছিল না। যেন এতক্ষণে চৈতন্য হয়েছে, কাকলী বাড়িতেই ছিল। কাকলী যদি……আর এসব মনে হতেই ভানুবাবুর উপর কেন যে মনটা ভীষণ বিষিয়ে গেল। সে হাতে মুখে জল দিয়ে বাইরে বের হয়ে দেখল, ভানুবাবু চলে যাচ্ছে। যাবার সময় কাকলীর সঙ্গে কোনো কথা বলে গেল না। কতকাল থেকে এই বাড়িটা ধ্রুবতারার মতো কেবল ভানুর মগজের ভিতর দপ দপ করছিল। সব চেনাশুনা হয়ে গেলে বুঝি রহস্য মরে যায়। মন্দাকিনী সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে ডাকল, ভানুবাবু।
ভানুবাবু ভালোভাবে তাকাতে পারছে না।
তুমি চলে যাচ্ছ?
ভানু চোখ না তুলেই বলল, হুঁ।
