সেই যেদিন বাসায় ঢুকে দেখল, মেসো অসময়ে বসে আছে বাড়িতে, মার সঙ্গে হৈ—হল্লা করছে, মা পিঠে পায়েস করছে, যেন উৎসব বাড়িতে—সেদিন সে স্কুলের বইপত্র ফেলে সোজা বাইরে ছুটে চলে গেছিল—ভিতরে কীসের যে হাহাকার—সেই থেকে পড়াশোনায় সে মন বসাতে পারত না। কোনোরকমে সে ক্লাসের পর ক্লাস পার হয়ে গেছে, এই পর্যন্ত। পালাবে পালাবে করে তার কত বছর কেটে গেল! আজ আবার মনে হচ্ছে, সব ছেড়ে ছুড়ে পালালে কেমন হয়। তখনই দেখল সেই লীলার মুখ ছল ছল করছে। সে বুঝতে পারছে—জীবনের কোথাও দু’জনের মধ্যে একটা ভারি মিল রয়ে গেছে।
ষোলো
মন্দাকিনী কেমন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। সে ভারি চঞ্চল হয়ে পড়ছে। পা টিপে টিপে কোথাও যেতে না পারলে শরীরের জ্বালা মিটবে না। চোখ মুখ জ্বলছে। শরীরে এটা যে কী থাকে। কিছুতেই মরে না। স্বামীর মুখ সে ক’বার ধ্যানে দেখার চেষ্টা করল। যদিও কিছু ব্যভিচার ছিল মানুষটার, তবু যখন কাছে আসত ঠিক থাকতে পারত না। আসলে এই শরীর তাকে খুব সহজেই সহনশীল করে রেখেছিল। রাতে ফিরে মানুষটা অপরাধী মুখে তাকালেই কেমন জল হয়ে যেত সব রাগ! অভিমানটা শরীরে বেশিক্ষণ পুষে রাখতে পারত না। অথবা জ্বালা বলা যেতে পারে—মন্দাকিনীর যে চরম আকাঙ্ক্ষা বীজ বীজ করছে! কতক্ষণে শরীর জুড়াবে। সে দুটো একটা অভিমানের কথা বলেই হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকত। মানুষটা তখন তাকে লুটেপুটে খেলে সে পরম শান্তি বোধ করত এবং ঘুমিয়ে পড়ত।
এখন তেমনি জ্বলছে। স্বামীর মৃত্যুর পর; কিছুদিন শরীরটা বেশ ঠান্ডা ছিল। শোকতাপ বোধহয় কিছুদিনের জন্য শরীর ঠান্ডা করে রাখতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি কত উদার—সে কোনো শোকতাপই গায়ে জড়িয়ে থাকতে দেয় না। ক্রমে কেমন সব ফিকে হয়ে যায়।
ভানু আগেও আসত এ—বাড়িতে। তখন থেকেই ক্ষণে ক্ষণে মনে হত একটা প্রতিশোধ নেওয়া যেতে পারে সহজেই। কারণ সে সহজেই জানে কী আকর্ষণ এ—বাড়িতে ভানুর, কেন সময় পেলেই চলে আসে, মানুষটাকে সে দাদা দাদা করত। মানুষটা খুব একটা গ্রাহ্য করত না। কতটা আর লুটে খাবে। কিংবা এমনও হতে পারে, আমি যখন আর একটা লাট্টু ঘোরাচ্ছি, তখন এই পুরনো লাট্টু তোমাকে দিয়ে দিলাম বাপু। ইচ্ছে করলে ঘোরাতে পারো।
এবং তখনই মনে হত মন্দাকিনীর তবু মানুষের শেষ পর্যন্ত কিছু একটা থেকে যায়, ইচ্ছে হলেই হাত পাতা যায় না! কী যেন সংকোচ থাকে। অথবা শালীনতাবোধ মন্দাকিনীকে এতদিন পর্যন্ত পবিত্র রাখতে সক্ষম হয়েছে। পবিত্র কথাটা তার কাছে এ সময় খুবই হাস্যকর। তবু শ্বশুরমশাইর প্রতি এটা একটা কর্তব্য, অথবা শৈশবের কিছু ধর্মাধর্ম, যার ভেতর সে বড় হয়ে উঠেছিল, যার থেকে বের হয়ে আসা খুব সহজ নয় বলে মনে হয়েছে, এই বেলা তার মনে হল, সব ভেঙে তছনছ করে দেওয়া যেতে পারে।
সে পর্দা তুলে দেখল একবার। ভানু পাশ ফিরে শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে কী না বোঝা যাচ্ছে না। কেউ কী এমন একটা নিরিবিলি সুযোগ উপেক্ষা করে বসে থাকতে পারে! আর যে—দিনই সে ভানুর সঙ্গে রাত করে ফিরেছে, কিছু কোথাও খেয়ে যখন ফিরছে, সবসময় একধরনের সাধাসিধে কথা। অধিক কিছু না। অথচ কত কিছু সহজেই হতে পারত।
মন্দাকিনী কিছুতেই মুখ খুলতে পারছিল না। আর ভানু নিজে থেকে কোনো কথা তুলতে পারছিল না। কোনো অঘটনের আশায় দু’জনেই বসে আছে। যে ভাবেই হোক সহসা সেটা ঘটে যাবে! এমন সুযোগ ভানু অবহেলায় নষ্ট করে দিচ্ছে কেন, ভানু ভানু! সে চিৎকার করে উঠত প্রায়, তখনই প্রিয়নাথের নাকের শব্দ আরও প্রবল, ভানু তুমি কী করছ, কেউ নেই। তুমি কী ঘুমোচ্ছ! মন্দাকিনীর শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছিল। সে দ্রুত পায়ে পর্দার ভেতর ঢুকে আরও সতর্ক হয়ে গেল। ভানু পাশ ফিরে তেমনি শুয়ে আছে। একটা কাপুরুষ! সামান্য সাহসটুকু নেই। একজন মেয়ের পক্ষে এটা খুবই অশোভন। নীচে মনে হল কেউ সিঁড়ি ভাঙছে। সে ফের দরজায় মুখ বাড়াল। না মনের ভুল। এবং নিজেকে ভারি বেহায়া মনে হচ্ছে। সে তো চেয়েছিল একজন পুরুষমানুষ যেমন বেড়ালের মতো ওৎ পেতে থাকে, ভানুও মাছ খাবার লোভে তেমনি ওৎ পেতে থাকবে। সময় এবং সুযোগের অপেক্ষা। তারপর বেশ আরামে আহার।
আহারের কথা মনে হতেই মন্দাকিনীর প্রবল জ্বর এসে গেল শরীরে। চোখ জ্বালা করছে। তবু অশোভন, খুবই অশোভন, কিন্তু শরীর ক্রমে নিরালম্ব হতে থাকলে সমাজ সংস্কার বিনষ্ট হয়ে যায়। সে ডাকল, ভানুবাবু ঘুমোলে!
ভানু বলল, ওম।
ঘুমোলে!
না—আ!
পুরুষমানুষের অত ঘুম ভালো না।
মন্দাকিনী আর কী বলবে! বসবে পাশে! মানুষটা কী! উঠতে পারছে না। সে আর কতদূর এগোবে।
মন্দাকিনী বলল, তুমি এবারে বিয়ে করো ভানুবাবু।
করব ভাবছি। বাবা ঠিকুজি কোষ্ঠী মেলাচ্ছে।
করব নয়। করে ফেলো। নিশ্চিত হই।
তোমার কী চিন্তা।
পুরুষমানুষ বিয়ে না করে থাকে কী করে!
করব।
না, করে ফেলো।
ভানু এবার মন্দাকিনীর দিকে চোখ তুলে তাকাল। তাকাতে পারছে না। মন্দাকিনীর চোখের পাতা জড়িয়ে আসছে, এবং কেমন অভিমানীর মতো জানালায় ঠেস দিকে দাঁড়িয়ে আছে। ভানু উঠে বসল। মাথাটা তার ধরেছে। সে ঠিক করতে পারছে না কী করবে! একবার প্রথম দিকে ভানুর একটু হাত লাগতে মন্দাকিনীর প্রবল ধমক খেয়েছিল। মন্দাকিনীর হয়তো তা মনে নেই। কিন্তু বেচারা পুরুষ মানুষ সেই যে মনে করে বসে আছে আর এগোতে পারছে না। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে আবার ঠিক প্রিয়নাথকাকার কানে উঠাবে। এখানে আসাই বন্ধ হয়ে যাবে। কী যে আছে এ বাড়িতে! কাকলি এবং মন্দাকিনী দুজনেই তাকে ভারি বশে রেখেছে। বরং কাকলীর সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ খোলাখুলি। সে যদিও খুব একটা বাড়াবাড়ি করতে পারে না, কারণ সেই ধার্মিক পিতা ভুবনবাবুর মুখ মাঝে মাঝে অসহায় করে রাখে তাকে। লম্পট নিজে হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু লম্পটের ছেলে লম্পট হয়, এবং ভুবনবাবু নামক ব্যক্তিটি তবে হয়তো আত্মহত্যা করেই বসবেন। মুহূর্তে ভানুর মগজের ভেতর এতগুলো চিন্তা ভাবনা করাত চালাচ্ছিল। তার সামনে সেই লাস্যময়ী নারী, শুধু বুকের কাপড় আলগা করে নেই, যেন দু ফুট মতো জায়গায় পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দাকিনী! এবারেও যদি বেড়াল লাফ না দেয় তবে মন্দাকিনী আর কতটুকু সাহায্য করতে পারে। মন্দাকিনীর এ হেন দৃশ্য দেখে ভানুবাবুর চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। এবং তখন মন্দাকিনী সরল বালিকার মতো ভানুর হাত ধরে কাছে টেনে নিল। লেপ্টে যেতে গিয়ে মনে হল ও—ঘরে প্রিয়নাথ নামক ব্যক্তিটি হাই তুলছে। মা তারা করুণাময়ী। বউমা ও বউমা। জল দাও ওষুধ খাব।
