কবে আসছ।
আসব ঠিক।
কাকলীর সঙ্গে কথা বলে গেলে না।
ভয় লাগছে।
কীসের ভয়?
ঠিক জানি না।
এসো ওপরে এসো বসো! এখন চলে গেলে ভালো দেখাবে না। উনি আসুন।
ভানু কেমন বাধ্য ছেলের মতো ওপরে উঠে এল। মন্দাকিনীর বুকটা সেই যে কেমন হিম হয়ে আছে আর স্বাভাবিক হচ্ছে না। সে করিডোর দিয়ে যেতে যেতে বলল, খুকু দেখ ভানুকাকা চলে যাচ্ছিল।
কাকলীকে কখনও আদরের গলায় ডাকলে মন্দাকিনী খুকু বলে ডাকে। মন্দাকিনী দেখল কাকলী কিছু বলছে না। সে ভানুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। ভানুবাবু আর কী করে, সে কাকলীর ঘরে ঢুকে বলল, কিরে পড়ছিস না।
কাকলী এবার চোখ তুলে তাকাল। কিছু বলল না।
মন্দাকিনী ওপাশ থেকে বলল, তোর অঙ্ক কটা দেখে রাখ না।
কাকলী অঙ্কের খাতা বার করে ছুড়ে দিল ভানুবাবুর দিকে।
কত প্রশ্নমালা?
কাকলী উঠে গিয়ে দেখাল সব।
ভানুবাবু অন্য সময় হলে বলতে পারত। কাকলীর মন খারাপ আরও কতবার হয়েছে। ভানুবাবু তার স্বাভাবিক কথাবার্তায় ওকে সহজেই উৎফুল্ল করে তুলতে পারত। এবং কী কী কথা বললে, কাকলীর মেজাজ আবার স্বাভাবিক হবে সে জানে। অথচ কী একটা সংকোচ ভিতরে রয়ে গেছে। কাকলীর সঙ্গে সে খুব স্বাভাবিক কথা বলতে পারছে না। অঙ্ক বই—এর পাতা উলটে যাচ্ছে কেবল।
কাকলীই বলল, তুমি ভানুকাকা ভালো না।
কেমন চমকে গেল ভানু।
তুমি মার সঙ্গে আর মিশবে না।
ভানুর, এতটুকু মেয়ের এমন স্পষ্ট কথা শুনে, কান লাল হয়ে উঠল। এই মুহূর্তে আর বসতে ইচ্ছে করছে না।
কাকলী বলল, তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারতে!
এত সহজ করে এমন কথা মেয়েটা কী করে বলতে পারল!
কিছু বলছ না কেন?
ভালোবাসব।
কবে!
দেখি কবে পারি।
কথা দিতে হবে।
ভানু বলল, অঙ্ক করো। তোমার মা শুনতে পাবে!
তোমরা এতক্ষণ ও—ঘরে কী করছিলে!
কই কিছুই না তো।
সত্যি বলছ!
সত্যি।
তিন সত্যি।
তারপর ভানু কেমন মরিয়া হয়ে বলল, কী করছিলাম উঠে গিয়ে দেখলেই পারতে।
আমার সাহস হয়নি। একবার উঠেও কী ভেবে বসে পড়লাম। তোমরা ছোট হয়ে গেলে আমার কিছুই থাকবে না ভানুকাকা। বলে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল কাকলী।
ভারি বোকা মেয়েতো! বলে ভানু সেই স্বাভাবিক ভানুবাবুর মতো কাকলীর চুল এলোমেলো করে দিয়ে শিস দিতে দিতে নিচে নেমে গেল। মন্দাকিনী আর ভানুবাবুকে আটকে রাখল না।
সতেরো
কী গো, তোমার ঘুম ভাঙবে না?
ভুবনবাবু, স্ত্রীর আলতো গলার স্বর শুনতে পেলেন। তিনি চোখ বুজে পড়ে আছেন। সময় বড় দীর্ঘ, কিছুতেই তার সময় কাটতে চায় না। বিকেলে এ—সময় তিনি এক কাপ চা খান, তবু উঠতে ইচ্ছে করছে না।
নীরজা ফের বলল, ওঠো। কত আর ঘুমোবে। চায়ের জল বসিয়ে দিয়েছি কিন্তু।
ভুবনবাবু উঠে পড়লেন। বাথরুমে ঢুকে চোখ মুখে জলের ঝাপটা দিলেন। ভেজা গামছায় মুখ মুছে বের হয়ে এলেন। তারপর রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ভানু ফেরেনি এখনও?
কোথায় আর ফিরল।
ওরা কি কেউ বাড়ির কথা ভাবে না?
যা দিন কাল, ভেবে আর কী হবে?
ভুবনবাবুর মনটা কেমন অস্বস্তিতে ভরে গেল। ছেলের জন্যে তো মায়েরই ভাবনা থাকার কথা। কিন্তু নীরজার অদ্ভুত নিস্পৃহ স্বভাব। জীবনের এই শেষ অঙ্কে যেন আরও বেশি নিস্পৃহ স্বভাব। তিনি হয়তো বলেই ফেলতেন, পেটের দোষ, কিন্তু তিনি জানেন, বললেই পার পেয়ে যাবেন না। এমন সব কুৎসিত কথা নীরজা অনায়াসে বলে যাবে যে তখন আর দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না।
ওপাশের রাস্তার তিনতলার কার্নিশের নিচে সূর্য হেলে গেছে। বারান্দায় ছায়া আছে এখন। বোধহয় মানদা এসেছে। বারান্দা মুছে দিচ্ছে। বারান্দায় কিছু বেতের চেয়ার আছে। একটা ইজিচেয়ার আছে। ইজিচেয়ারটা ভেঙে গেছিল, বাবার অসুবিধা হচ্ছে ভেবে রমা সারিয়ে দিয়েছে। শরীর এলিয়ে দিলেন চেয়ারটাতে। মানুষের এ সময়টা বুঝি খুবই অর্থহীন। ছেলের বিয়ে মেয়ের বিয়ে দিতে পারলে সংসারটাতে বেঁচে থাকার একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যেত। কিছুই হচ্ছে না।
প্রথম যৌবনে মনে হত, ছেলেপিলেরা দাঁড়িয়ে গেলেই এ জীবনের জন্য ছুটি নেওয়া যাবে। এবং প্রথম যখন ভানু অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে নিয়ে এসেছিল, তিনি যথার্থই কিছুটা হালকা বোধ করছিলেন এবং ক’মাস আগে যখন রমার চাকরি হয়ে গেল; বেশ বড় রকমের একটা দায়িত্ববোধ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন ভেবেছিলেন। কেবল মানুটার চাকরি। সেটাও হয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু ইদানীং মনে হচ্ছে তার কোনো কাজই শেষ হয়নি। তাঁর মুক্তি মেলেনি। বরং তিনি এখন আরও বেশি টেনসনের মধ্যে আছেন। মুখের ওপর কিছু বলতে সাহস পান না। দশ রকমের অজুহাত দেখিয়ে দেবে। বাড়ি সময়মতো না ফিরলে যে বাবা—মার চিন্তাভাবনা থাকে এটা তারা আজকাল একেবারেই বুঝতে পারে না বুঝি।
নীরজা চা রেখে গেল আর সঙ্গে দুটো বিস্কুট একটা সন্দেশ। ভুবনবাবু প্রথম সন্দেশ ভেঙে খেলেন। তারপর চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেলেন। মেয়েটা এখন কী করছে কে জানে। আজকাল তো হামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুটা বের হয়ে গেল। একবার বলেও যায় না কোথায় যায় এরা! সবাই ধীরে ধীরে আলাদা সত্তা ধারণ করছে। একই সংসার একই আবাস, একরকম দুঃখ। তিনি এতদিন বাড়ি থেকে যে দুঃখটা দূর করার জন্য আপ্রাণ খেটেছেন সেটা একবিন্দু নড়েচড়ে বসেনি।
বরং মনে হয় সবাই এখন ঠিক ওর মতো নিজেদের জগৎ তৈরি করতে ব্যস্ত। তিনি যেমন নীরজা ভানু রমা মানুকে নিয়ে একটা সত্তা আবিষ্কার করেছিলেন, ওরাও তেমনি, কোনো মন্দাকিনী, কোনো জয়া, কোনো অরুণ ছানাপোনা নির্মাণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওরা যে তাঁর কেউ না, এটা উপলব্ধি করে কেমন হতাশ হয়ে পড়লেন। চা কেমন যেন বিস্বাদ লাগছিল। চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে।
