নানু আজ ফিরে আসবে ত।
আমাকে কিছু বলে যায়নি।
আমাকেও তো বলেনি।
নানু কাকে বলে!
সত্যি নানু কাউকে কিছু বলে যায় না। পৃথিবী সুদ্ধু লোকের ওপর নানুর আক্রোশ। অমলা কতবার বলেছে, আমাদের বাসায় যাস নানু। যদি একবার যেত! সেজ মাসি কত বলে গেছে, যাস। কিছুই তোয়াক্কা করে না ছেলেটা। মা যার এমন তার আর কী হবে! তাঁর মনে হল, মেয়েদের জন্মসূত্রেই দোষ থেকে গেছে। এখন বুঝতে পারেন সব কটা মেয়েই ছিল তার অবাঞ্ছিত। ওদের কপালেও অবাঞ্ছিত কিছু লেখা থাকবে তাতে আর বিস্ময়ের কী!
রাসবিহারী বললেন, ও তো অবনীশের বাড়িতে গেছে। বিকেলেই ফেরার কথা। বলে ঘরের দেয়ালে চোখ রাখলেন। তাঁর ঘরটার দেয়ালে কিছু ছবি আছে। বিশেষ করে একটি ছবি খুবই বড়। ছবিটি সি আর দাশের। পাশে নেতাজীর ছবি। উত্তরের দেয়ালে আছে মহাত্মা গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথ। তা ছাড়া বিদ্যাসাগর মশায়েরও একটা ছোট ছবি টাঙানো আছে। এত সব মহাজনের এই দেশ, এই দেশে তিনি জন্মেছেন বলে গর্বিত। অথচ তাঁর পরের প্রজন্ম থেকেই কেমন দোষ পেয়ে গেল।
রাতে নানু ফিরলে রাসবিহারী বললেন, তোমার মা চিঠি দিয়েছে।
নানু বলল, আচ্ছা দাদু, বাবা আমার নামে কিছু টাকা রেখে গেছেন। সেটা কত টাকা?
এমন কথায় রাসবিহারী খুবই বিস্মিত হলেন। বললেন, দেখতে হবে।
তুমি জান না কত?
সুদে আসলে যা আছে তা মন্দ না।
ঠিক আছে কত টাকা আমার জানার দরকার নেই। আমাকে কালই ব্যাংকে নিয়ে চল, তুমি তো জান, বছরখানেক হয়ে গেল আমি সাবালক হয়ে গেছি।
দাদু বললেন, টাকার খুব দরকার?
দরকার অদরকারের কথা হচ্ছে না। বাবা তাঁর দুঃসময়েও এ’ কটা টাকা আমার অ্যাকাউন্ট থেকে তোলেননি। এখন আমি সে টাকা সদ্ভাবে খরচ করতে চাই।
রাসবিহারী বললেন, ঠিক আছে, তোমার টাকা তুমি বুঝে নেবে। তবে তোমার মাকে জানালে হত না।
নানু চিৎকার করে উঠল, সে কে?
অগত্যা রাসবিহারী প্রসঙ্গ পালটে বললেন, নবনীতা বলে কেউ আছে?
হ্যাঁ আছে।
তোমাকে ফোন করেছিল!
কখন?
দুপুরে।
কিছু বলল?
না। বাড়ি নেই জেনে কিছু বলল না।
ঠিক আছে। নানু তড় তড় করে নিচে নেমে ফোন করল, এবং অপর প্রান্ত থেকে গলা পেয়ে বলল, কাকিমা আমি নানু বলছি। নবনীতা আছে?
এত রাতে কোথায় যাবে?
এই কোথাও যদি বেড়াতে যায়।
না বাড়িতেই আছে। দিচ্ছি। ধর।
নবনীতা।
আমাকে ফোন করেছিলে?
হ্যাঁ। কেমন ঘুমকাতুরে গলা। নানুদা আগামী রোববার আমাদের সঙ্গে যাবে?
কোথায়?
আমরা হাজারদুয়ারী যাচ্ছি।
কে কে?
আমার মাসি, মেসো, দাদা, দাদার বন্ধুরা। আমি যাব, মা যাচ্ছে। বাবা শুধু যাবে না।
নানু মুখ কুঁচকে বলল, তোমার আবার দাদা এল কোত্থেকে?
ন’মাসির ছেলে। বরুণদা। খুব ভালো গিটার বাজায়।
খুব গেঞ্জাম হবে মনে হচ্ছে।
তা একটু হবে।
নবনীতা তুমি যদি না যাও কেমন হয়?
নবনীতা কেমন অপর প্রান্তে আমতা আমতা করতে থাকল।
সে কী করে হবে! মা আমাকে রেখে যাবে না।
কেন রেখে যাবে না!
নবনীতা বলবে কী বলবে না করেও বলে ফেলল, ধরা পড়ে গেছি।
আমরা তো কিছু করিনি। তুমিই বল। আমরা কিছু করেছি।
আজকালকার মায়েরা ও সব বিশ্বাস করতে চায় না। আমরা তো এ বয়সে কত কিছু জেনে ফেলেছি।
যাকগে যাবে কী যাবে না তুমি বুঝবে। তারপরই দুম করে বলল, আমি গেলে কাকিমা মনে কিছু করতে পারে।
মাকে বলেছি।
তুমি জানলে কী করে আমি যাব।
বা রে আমি যাব, তুমি যাবে না সে কী করে হয়। তাই বললাম, নানুদা যাবে বলেছে।
তোমার মা কী বলল!
বলল, এই মানে!
ঠিক করে বল। মানে ফানে বুঝি না।
বলল, ওর মাথার ঠিক নেই। সঙ্গে নিবি, সামলাতে পারবি তো।
নানু কেমন কাতর গলায় বলল, সত্যি নবনীতা আমার মাথার ঠিক নেই। কী করতে কী করে বসব আমি নিজেও আগে থেকে বুঝতে পারি না। তুমিই বরং ঘুরে এসো। বলে নানু ফোন নামিয়ে রাখল।
তারপর সে কিছুক্ষণ ফোনের পাশে গুম হয়ে বসে থাকল। তার মধ্যে মাথা খারাপের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে—কিন্তু সে বুঝতে পারে আসলে যদি একজনও সুস্থ মানুষ থাকে, তবে সে। কারণ সে যখনই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় অথবা কখনও বাসে কিংবা কোনো গাছের নিচে যখন দাঁড়িয়ে থাকে তখন মনে হয় রাস্তার ফুটপাথে বড়ই দুঃখী মানুষের ভিড়। লীলার কথা তার মনে হল। কিছু একটা করার মতো হাতের কাছে কাজ পেয়ে সে মুহূর্তে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল।
সে উঠে আবার সিঁড়ি ভেঙে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। সে ভেবে ফেলেছে পড়াশোনা আর তার হবে না। মাথার মধ্যে নানা রকম চিন্তা ভাবনা—এবং সংসারে বড় হতে হতে সে যা দেখল, খুব কম মানুষের জীবনেই বোধ হয় এত কম বয়সে এমন বোধোদয় ঘটে। আজই যা সে দেখে এল, তাতে মনে হয়েছে মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত যদি তার জেঠু অবনীশের মতো হয়ে যায়, অথবা বাবার মতো হয়ে যায় কিংবা দাদুর মতো—তা হলে জীবনযাপনের মহিমা কোথায়। সংসারে সে নিজেকে বড়ই অসহায় বোধ করল। মানুষ এমন অসহায় বোধ করলেই বুঝি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার ঝুঁকি নেয়। যদি তাই হয়, তবে জেঠুর তো বেঁচে থাকার কথা না। এমন একটা নিষ্ঠুর মেয়েমানুষ নিয়ে জেঠু কোন প্রবল প্রাণশক্তির জোরে এখনও বেঁচে আছে, ভাবতেই তার বিস্ময় লাগল।
আর তখনই নানু দেখতে পেল, কুটু, সেই ছোট্ট মেয়ে বব করা চুল, দু চোখ পৃথিবী সম্পর্কে অপার বিস্ময় নিয়ে জেগে আছে। কুটুর কত রকমের প্রশ্ন, বাঘ কেন মানুষ খায়, ভিখিরি ভিক্ষা চায় কেন, পাখিরা উড়ে কোথায় যায়, আকাশের তারারা দিনের বেলায় কোথায় থাকে, চাঁদের বুড়ি সুতো কাটে কেন এবং শেষ প্রশ্ন তার বোধ এমন সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মানুষ চলেই বা যায় কেন। এগুলো খুবই জটিল প্রশ্ন। সহজে তার পক্ষে উত্তর দেওয়া সম্ভব না। বিকেল বেলাটা কুটু এমন অজস্র প্রশ্ন করেছে তাকে। এই কুটুই সংসারে বেঁচে থাকার মতো একমাত্র জেঠুর শেষ অবলম্বন। আত্মহত্যার আগে কুটুর মতো বাবা যদি তার কথা ভেবেও অন্তত আর কিছুদিন বেঁচে থাকত—অন্তত মার শেষ বয়স পর্যন্ত, তাহলে কোনো অঘটনই ঘটত না।
