আবার সংক্ষিপ্ত জবাব, না।
মিতা কোথায়?
দেখতে গেছে কেন এল না।
নানু ফিরে আসেনি?
জানি না।
এরপর আর কী করা যায়। তিনি উঠে পড়লেন। একটু চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে এসেই তার চা খাবার অভ্যাস। তিনি রোজ হাত মুখ ধুয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পান কাজের মেয়েটা চা দিয়ে গেছে। আজ কপালফেরে তাও জুটবে না। তিনি ডাকলেন, নিধু। তুই একবার যা তো পঞ্চাননের কাছে। ওদের বস্তিটা জানিস কোনদিকে?
সে বলল, জানি কর্তা।
এই নিধুই সংসারে একমাত্র সরল মানুষ যার কোনো চাহিদা নেই। সে এসেছিল, দূর বালেশ্বর থেকে। রাসবিহারীর হাতে পায়ে ধরে একটা বেয়ারার কাজ জুটিয়েছিল। এবং রিটায়ার করার চার পাঁচ বছর আগে নিধু রাসবিহারীর খাস বেয়ারা হয়ে যায়। সেই থেকে দশ বারো বছর ধরে দু’জনের একসঙ্গে জীবন কাটছে। এই নিধুকেও খুব একটা পছন্দ নয় হেমর। উটকো লোক মনে করে থাকে নিধুকে। বাড়ির বাগান দেখাশোনা করার জন্য দুবেলা, দু—কেজি চালের ভাত খাওয়ানোটা কোনো বিবেচক গেরস্থর কাজ নয়। রাসবিহারী জানেন, এটাও হেমর বাড়াবাড়ি, নিধু ভাত সামান্য বেশি খায়—আটা খেয়ে ওর সহ্য হয় না, সে—জন্য নিধু এ বাড়ির দুবেলাই অন্ন ধ্বংস করে। ধ্বংস শব্দটি হেমর দেওয়া। এই শব্দটি তিনিও এ—সময় ব্যবহার করলেন এ—জন্য যে নিধুর উচিত ছিল খোঁজ খবর নেওয়া। হেম ইচ্ছে করলে নিধুকেই পাঠাতে পারত। কিন্তু ভেতরে এত জ্বালা এই রমণীর যে মিতাকে পাঠিয়ে এক সঙ্গে রাসবিহারী এবং নিধুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া গেল। বুঝে দেখো তুমি যাকে গুরুঠাকুর করে রেখেছে সংসারে তাকে দিয়ে কী কাজটা হয়!
রাসবিহারী নিধুকে পঞ্চাননের খোঁজে পাঠিয়ে সামান্য বিশ্রাম নেবেন ভাবলেন।
বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুলেন, ঘরে এসে পাখা ছেড়ে দিলেন। তারপর মুখে এক টুকরো হরীতকী ফেলে চিবুতে থাকলেন। জিভে লালা জমতেই মাথার ঘিলুর মধ্যে কে যেন খোঁচা দিতে থাকল। বুঝতে পারলেন নানুর জন্য চিন্তা হচ্ছে। খচ খচ করছে মনটা। এই ছেলেটা বাড়ি না থাকলেই আজকাল কেমন একা লাগে রাসবিহারীর। অমলা কখনও বাসায় ফিরে যাবার আগে বাড়ি হয়ে যায়। অমলা তার আরও কাছের। সে কী করছে না করছে এই জন্য কেন যে তেমন চিন্তা হয় না। যা হবার হবে। তিনি নানুর জন্যও এমন ভাবতে পারলে অনেক দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেতেন। আসলে তিনি বুঝতে পারেন মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলেই পর হয়ে যায়। সম্পর্ক আলগা হয়ে যায়। একটি পুত্র সন্তান থাকলে সম্পর্ক এতটা বোধ হয় আলগা হত না। একটা দীর্ঘনিশ্বাস বুক বেয়ে এ—সময় তাঁর উঠে এল। তারপরই মনে হল, আসলে সবারই হাজার সমস্যা। মানুষের বয়স যত বাড়ে সমস্যা তত বাড়ে। এখন তাঁর মেয়েদেরই হাজার রকমের সমস্যা। কোনো কোনো সমস্যার খবর তিনি রাখেন, কিছু তাঁকে আঁচ করে নিতে হয়—বাকিটার তিনি কিছুই জানেন না। আর তখনই মনে হল বারান্দা পার হয়ে কেউ চলে যাচ্ছে। তিনি ডাকলেন, কে রে?
আমি।
তিনি বুঝতে পারলেন, মিতা ফিরে এসেছে।
কী বলল?
আসবে। ওর মেয়েটার জ্বর হয়েছে।
এই আসবে। শব্দটিতে রাসবিহারী আশ্চর্য রকমের একটা স্বস্তি বোধ করলেন। না হলে রাতের খাবার নিয়ে এই বাড়িতে একটা কুরুক্ষেত্র হত। মিতা রান্নাঘরে গেলেই সব ভণ্ডুল করে দেয়। সুতরাং হেমর শরীর খারাপ সত্ত্বেও কাজ কাম করত, সায়া শাড়ি ঠিক থাকত না আর রাসবিহারীর চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করত, বে—আক্কেলে মানুষের কপালে এই লেখা থাকে বলত। এমনকি এক সময় চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে ফিট হয়ে যেতেও কসুর করত না। যেন তেন প্রকারেণ বুঝিয়ে দেওয়া কাপুরুষ মানুষের এমনই হয়। কেউ ভয় পায় না, কেউ ভয় পায় না। সেদিনকার নানু সেও মুখের ওপর কথা বলে।
তিনি ফের ডাকলেন, মিতা চলে গেলি!
মিতা দূর থেকে জবাব দিল, আমাকে কিছু বলছ।
একটু শুনে যাবি।
মিতা বলল, আসছি।
তারপর খানিকটা সময় কেটে গেছে। নিধু ফিরে এসেছে। সে গলা বাড়িয়ে বলল, এসে গেলি! আর নিধুর মুখটা সহসা আলোর মধ্যে আবিষ্কার করে কেমন ভড়কে গেলেন রাসবিহারী। আশ্চর্য নিশ্চিন্ত মুখ। মানুষের এমন নিশ্চিত মুখ কী করে হয়! তিনি কতদিন পর, কতদিন পর কেন, যেন এই প্রথম তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোর আর কে আছে? তুই এখানে আর কতদিন পড়ে থাকবি! তোর জমানো টাকা বুঝে নিয়ে দেশে চলে যা। ওতে বাকি জীবন আরামে কেটে যাবে তোর। তারপরই মনে হল নিধু ওর চেয়ে বয়সে বড়ই হবে। নিধুর দেশে ছেলেমেয়ে সবই আছে। একবার মাত্র ছুটি নিয়ে দেশে গিয়েছিল, বউর অসুখ শুনে। তিনমাস পরে এল। বলল, চুকে বুকে গেল সব বাবু। তারপর আর কোনো টান বোধ করেনি দেশে ফিরে যাবার! বরং এখন দেখলে মনে হয়, তিনি শহরের প্রান্তে যে খোলামেলা জায়গা নিয়ে বাড়িটা করেছেন এটাই তার প্রাণ। ফসল তোলার সময় কিছুদিন সোনারপুর তাকে চলে যেতে হয়। সেখানে পঞ্চাশ বিঘার বড় একটা জোত আছে রাসবিহারীর। ধান, পাট, কলাইর দিনে কলাই সবই সে বুঝে আদায় করে নিয়ে আসে। তারপর বলতে গেলে বাড়ির দুটো গাভী, গোয়ালঘর আর এই বাগান মিলে তার জীবন। মানুষ কীভাবে কোথায় যে অবলম্বন পেয়ে যায় কেউ বোধ হয় বলতে পারে না।
তখনই হাজির মিতা! বলল, ডাকছিলে কেন?
