খাওয়া হয়ে গেলে রমা বলল, দেখি বিল।
বয় বিল নিয়ে এলে অরুণ পার্স বের করল।
আমি দিচ্ছি। রমা ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গেল।
অরুণ ঠান্ডা গলায় বলল, না।
একদিন না হয় আমি দিলামই।
কী দরকার। সে তিনটে দশ টাকার নোট বের করে দিল। আইসক্রিমের সুগন্ধ এখনও নাকে লেগে আছে তাদের।
তুমি রাগ করছ কেন?
কোথায় রাগ দেখলে। সে খুব আস্তে আস্তে বলল শুধু, সত্যি, বোকা মনে হচ্ছে নিজেকে।
কথাটা ভেতরে গিয়ে কেন যে বিঁধল রমার। সে বলল, আমিও তো কম যাই না। তোমার কী দোষ? তারপর গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, অরুণ, তুমি বুঝবে না।
এতে আর বোঝাবুঝির কী আছে?
আছে বইকি? আমি কি পাথর, আমার কি শরীরে কিছু নেই! আমার কি ইচ্ছে টিচ্ছে বলে কিছু নেই!
অরুণ উঠে দাঁড়াল। সিগারেট জ্বালল। তারপর বের হবার সময় বলল, বার বার মনে হচ্ছে রমা, নিজেকে শুধু অসম্মান করে গেছি। অমলাকে অসম্মান করেছি। তুমি সেই মজাটা কতদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে কেবল চোখ মেলে সেটাই দেখতে চেয়েছ। কাজের সময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছ, এটা ঠিক না।
অরুণ রাস্তায় নেমে আরও কেমন ক্ষেপে গেল। বলল, ন্যায় অন্যায় বোধটা আমারও কম নেই রমা। তবু বুঝি মানুষের অসুখটা ভেতরেই আছে। সে কিছুতেই নষ্ট হতে না পারলে শান্তি পায় না। তোমার ধারণা কিছু হলেই পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়। সেটাতো আমার দিক থেকেও হতে পারে। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ।
রমা মাথা নিচু করে রেখেছে। রোদ্দুর। ভীষণ গরম। এই রোদ্দুর এবং দাবদাহ ওদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করছে না। একটা কঠিন সংকটের মুখে ওরা পড়ে গেছে এখন।
বরং আমারই বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা। তুমি তো যে—কোনো দিন শরীর পবিত্র আছে বলে, নতুনভাবে জীবন গড়ে ফেলতে পারবে। আসলে আমি তো তোমার মনের মানুষ না। আর তুমিও জানো আমরা যত দূরেই যাই না কেন একটা বিন্দুতে গিয়ে কখনো আমরা মিলতে পারব না। অমলা তো কোনো দোষ করেনি।
রমা বলল জানি।
সহসা অরুণের মনে হল সত্যি সে একজন অপরিচিতার সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। রমার মুখ কঠিন থমথমে। সে কেমন ভয় পেয়ে গেল। বলল, চল, দিয়ে আসি, ওঠো।
রমা পিছনে বসতেই কী যে হয়ে যায়—সেই এক সুমধুর সমীরণে যেন ভেসে যাচ্ছে। পাশের একটা দোকানে আশ্চর্য মিউজিক বাজছে। মিউজিক বাজলে ভেতরে রক্তের ঝড়টা প্রবল হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারছিল, ভয়ংকর অবমাননায় অরুণ কাতর হয়ে পড়েছে। একজন পুরুষের এমন উদার এবং নিবিষ্ট আপ্যায়ন সে কেন যে কিছুতেই ঠেলে ফেলতে পারছে না। ভেতরটা কেমন অবশ অবশ লাগছে। ঘুম পাচ্ছে মতো। যা হয় হবে। জীবনটা তো সত্যি ব্যাকরণ নয়। সে বলল, অরুণ আমি যাব।
নিয়ে তো যাচ্ছি।
তোমার সেই ফ্ল্যাটে যাব!
অরুণের ভেতরটা সহসা বিদ্যুৎ চমকের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সে বলল, সত্যি বলছ রমা। সত্যি।
রমা কিছু বলল না। কেবল মুখটা পিঠে ঘসে দিল অরুণের। অরুণ আবার বাতাস কাটিয়ে বের হয়ে যেতে থাকল। অতীব অকিঞ্চিৎকর, জীবনের অন্য সব কিছু—নতুন গ্রহ সন্ধানের মতো মনে হচ্ছে রমার সবকিছু। সে ভেসে যাচ্ছে, রমা ধরে রেখেছে, কেমন এক গোলকধাঁধার ভেতর মাথাটা দুলে উঠছে তার। তখনই মনে হল তার, কিছু টুকিটাকি জিনিস সঙ্গে নেওয়া দরকার। সে বাইক ঘুরিয়ে দিল সাঁ করে।
পনেরো
রাসবিহারী সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে বাড়ি ফিরে দেখলেন, কেমন নির্জন এবং ফাঁকা বাড়িটা। বাইরের বাগান থেকে নিধু খুরপি কোদাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে কলতলায়। কেউ আলো জ্বালেনি বাড়ির। হেম কিংবা মিতার তো যাবার কথা নেই কোথাও। দরজা জানালাও সব হাঁট করে খোলা। তিনি প্রথমে দরজার ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরের আলো জ্বেলে দিলেন। তারপর লাঠি এক পাশে রেখে বেশ জোর গলায় ডাকলেন, মিতা মিতা। কোনো সাড়া নেই। নানু এখনও ফিরে আসেনি। অবনীশ কি নানুকে থেকে যেতে বলেছে! নাদন কী আবার এ—বাড়িটায় এসেছিল। মিতা কি নাদনের সঙ্গে কোথাও গেছে। তিনি এটা পছন্দ করেন না। মিতা বাবার পছন্দ অপছন্দের দাম দেয়। বাবা অপছন্দ করে বলেই একসময় রাসবিহারী দেখেছেন, নাদন এ বাড়িতে আসা কমিয়ে দিয়েছে। মিতা বলতেও পারে নাদনকে, তুমি আর আমাদের বাড়িতে এসো না। বাবা তোমার আসা পছন্দ করেন না। সেই মেয়েটাও নেই। তিনি বুঝতে পারছেন বয়স যত বাড়ছে তত সংকট চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে তাকে। তিনি আবার ডাকলেন, হেম তোমরা কোথায় সব! আর তখনই যেন ও—ঘর থেকে হেমর ক্ষীণ গলা পাওয়া গেল। —এখানে, কেন কী হয়েছে?
বাড়িটাতে আলো জ্বালা নেই।
কী হবে জ্বেলে?
রাসবিহারী পাশের ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বেলে দেখল হেম শুয়ে আছে। শরীর খারাপ। না হলে হেমর শুয়ে থাকার কথা না। তিনি মোড়া টেনে পাশে বসলেন। —শরীর ভালো নেই?
না। খুব সংক্ষিপ্ত জবাব।
কী হল?
কিছু হয়নি!
সহসা রাসবিহারীর চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে হল, কিছু হয়নি তো শুয়ে আছ কেন। কিন্তু তিনি জানেন, এতে সংসারের অনর্থ বাড়বে বই কমবে না। তিনি দেখেছেন, বাড়িতে ঝি চাকর কামাই করলেও হেমর শরীর খারাপ হয়ে যায়। বিকেলে ঠিকা ঝি বীণার কামাই হলে হেম গজ গজ করে। সব একটা মানুষের আসকারাতে গেল এমনই ভাব হেম। মাইনে কাটলে ঠিক শিক্ষা হয়—কিন্তু রাসবিহারী জানেন, লোকজনের যা সমস্যা তাতে এক দু দিনের মাইনে কেটে কিছু হয় না। আবার নতুন একটা লোক ঠিক করতে রাসবিহারীর মাথার ঘাম পায়ে নেমে আসবে। অথচ কাজের লোক এলেই দেখা যাবে হেমর সংশয় বেড়ে যাচ্ছে। এবং এমন নিষ্ঠুর আচরণ করবে মাঝে মাঝে যে রাসবিহারীর মনে হয় হেমর মন বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কেমন নির্মম এবং অবিবেচক হয়ে পড়ছে দিনকে দিন। একে ঠিক অবুঝ বলা যায় না, বরং যেন ছ’টি মেয়ের জননী করার জন্য শেষ বয়সে প্রতিশোধ নিচ্ছে। রাসবিহারী সে—জন্য ঠান্ডা মাথায় বললেন, রান্নার লোকটা আসেনি!
