নানু বলল, খেলতে চাইলেই খেলতে দেবে। সময় অসময় নেই?
জেঠি বলল, আর বলিস না। কুটুকে নিয়ে আর পারছি না। একদম কথা শোনে না। কী যে হয়েছে!
নানু অগত্যা খাটে পা ঝুলিয়ে বসল। এবং একবার জেঠিকে বলবে ভাবল, যাবার সময় কিন্তু আজ আবার তালা মেরে যেও না। তোমার ঘরে এমন কিছু মহার্ঘ বস্তু নেই যা হারাবার। কারণ তুমি জীবনের সব কিছু আগেই হারিয়ে বসে আছ। বয়স বাড়বে, এখন পেটের আন্ত্রিক গোলযোগ, পরে সেটা বুকে উঠবে, শেষে মুখে—জীবনের সবটাই ব্যর্থতায় তোমার ভরা। আমার বাপকে দেখে শেখা উচিত ছিল জীবন কাকে বলে।
যাই হোক নানু শেষ পর্যন্ত লুডু খেলতে বসে গেল। জেঠি বাজারে যাবার আগে সেই কিশোরীকে ডেকে বলল, জল হলে ভাত বসিয়ে দিবি। মশলা বাটবি—জিরে ধনে লংকা আদা। চাবির রিংটা বটুয়াতে ভরে নিয়ে বের হবার মুখে বলল, ভাত বসিয়ে ঘরদোর ঝাঁট দিয়ে মুছে ফেলবি। পেছনে লেগে আমি কাজ করাব না। একদিন বললে শুনে রাখবি। সেই একদিন আজই কী না নানু বুঝতে পারল না। জেঠি গড় গড় করে বলেই যাচ্ছে, চায়ের বাসন ধুয়ে তুলে রাখ। ছাড়া সায়া শাড়ি জলে ধুয়ে দড়িতে ঝুলিয়ে দিবি। ক্লিপ এঁটে দিবি। গোনা গুনতি ক্লিপ বুঝিয়ে দিতে হবে। একটা যেন না হারায়। তারপর বের হবার মুখে বলল, বিকেলে কিছু গোবর কুড়িয়ে আনবি।
বাড়ির চারপাশে এখনও কিছু ফাঁকা মতো জায়গা আছে। সেখানে গোরু চরে বেড়ায়। অনায়াসে একটু হিসেবি হলে ঘুঁটে কিনতে হয় না। আর জেঠি বাজার থেকে ফিরে এসেই বলল, তাড়াতাড়ি মাছটা বসিয়ে দে। একটু চাটনি কর। এবং দশটা বাজলেই বলল, সব নামিয়ে রাখ। এই নে টাকা, রেশন নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি আসবি। তারপর কিশোরী মেয়েটির নাম ধরে বলল, লীলা প্লাসটিকের বালটিতা কোথায় রেখেছিস। খুব মৃদু শব্দ এল রান্না ঘর থেকে—আমি জানি না মাসিমা।
জেঠির ঝংকারে বাড়িটা মুহূর্তে কেঁপে উঠল, তুমি জান না তো কে জানে! আর কে এ—বাড়িতে খেতে আসে!
লীলা আর কিছু বলল না। নানুর কেন জানি এ—সময় কিশোরী বালিকাটির মুখ দেখতে ইচ্ছে হল। পৃথিবীতে কেন এরা জন্মায়, বড় হয়! কী দরকার এমন মুখ ঝামটা খাওয়ার। ওর বুকের মধ্যে কোনো জলছবির রং ধরা আছে কী না একবার প্রশ্ন করে জানলে কেমন হয়। চোখ দুটো বড়ই মায়াবী। একবার মাত্র নানুর দিকে সামান্য চোখ তুলে তাকিয়ে ছিল—বড়ই বিহ্বল চোখ। অবোধ। নানুর কেন জানি জেঠির গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে হয়েছিল তখন।
তখনই কুটু বলল, আর খেলব না। তুমি পার না। বাবাকে বলল, তোমার কিছু হবে না বাবা। তুমি বার বার হেরে যাচ্ছ।
নানু বলল, হারলি তো তুই।
বাবার জন্য হারলাম।
নানু বলল, খেললি তুই আর হারলি বাবার জন্য।
তাই ত। বাবার গুটি বাঁচাতে গিয়েই তো দান নিলাম না।
অবনীশ বলল, তাই হয় নানু। তোমার মা চিঠি দিয়েছে তোমাকে?
দেয় মাঝে মাঝে।
আসবে লিখেছে?
আসতে পারে।
তোমার মাকে নিয়ে, তারপর কী ভেবে, অবনীশ সবটা শেষ করল না। স্ত্রীর নাম ধরে ডাকল। ও—ঘর থেকে তখন জবাব, অত চিল্লাচ্ছ কেন। বলতে হয় এখানে বলে যাও। অবনীশ সুড় সুড় করে উঠে গেল। তারপর ফিরে এসে বলল, তোমার মা এলে এখানে নিয়ে আসবে। ক—দিন এখানে থাকবে।
নানু বলল, দেখা যাবে। বলেই সে বাইরে বের হয়ে বারান্দায় পা দিতেই দেখল, জেঠি দরজায় দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে বকছে। —এতক্ষণ লাগে! ওখানে কী পাত পেড়ে খেতে বসেছিস। আজ একবার ফিরে আয় কত ধানে কত চাল দেখাচ্ছি। এক ফোঁটা জল রেখে যায়নি বাথরুমে।
নানু বলল, কখন তুলবে। এক দণ্ড তো বসে নেই।
জেঠি নানুকে যে—কোনো কারণেই হোক ভয় পায়। সেটা সেই বাবার আত্মহত্যাজনিত অপমান বোধ কী না নানু জানে না।
জেঠি খুব বিপদে পড়ে যাচ্ছিল নানুর কাছে। সুতরাং বিপদ থেকে ত্রাণ পাবার জন্য বলল, যাও চান সেরে নাওগে। কী করবে কপাল। জেঠির বাড়িতে এসেছ বেড়াতে, সেখানেও জল তুলে চান করতে হচ্ছে।
নানু জল তুলে চান টান করে বের হয়ে দেখল জেঠি দরজা হাট করে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ লাল। এবং মনে হচ্ছে, রাগে দুঃখে জেঠির এবার চুল খাড়া হয়ে উঠবে। বাথরুমে ঢোকার মুখে দেখেছিল, জেঠির খোপা বাঁধা। বের হয়ে দেখল, খোপা খোলা, এবং মনে হল কিছুক্ষণের মধ্যেই চুল পট পট করে দাঁড়িয়ে যাবে। নানু বুঝতে পারল, আজ লীলার কপালে খুবই দুর্ভোগ আছে। ঘণ্টা দেড়েক হয়ে গেল। কী করছে মেয়েটা?
এমন সময় লীলা চাল, চিনি, গম, তেল নিয়ে বাড়ি এল। আর অমনি জেঠি করালবদনী হয়ে গেল—লম্বা দুই হাত আরও লম্বা করে দিল, অনায়াসে লীলার বড় বড় চুল খামচে ধরল—তারপর টানতে টানতে ভিতরে নিয়ে সজোরে লাথি, মুখে পিঠে পায়ে—যেখানে যতটা সম্ভব লাথি চালাতেই নানু মাথা ঠিক রাখতে পারল না। বলল, এ—সব কী হচ্ছে!
জেঠু বলল, মাই লিটল চ্যাপ, তুমি মাথা গলিও না। সব এক সময় ঠিক হয়ে যাবে। সংসার এমনই জায়গা।
নানু বলল, তার মানে!
মানে ঝড় একদিক থেকে কেটে গেল। যে রক্ত তোমার জেঠির মাথায় উঠে গেছিল চড়াৎ করে তা সহজেই এবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। নইলে অনর্থ ঘটত। তোমার জেঠি হয়তো সংজ্ঞা হারাত। মাথায় রক্ত ওঠা বলে কথা।
নানু বসার ঘরে গুম মেরে বসেছিল। কারণ লীলার এই নির্যাতন তার মাথার মধ্যে কে আবার রেল গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে। তার মনে হয়েছিল, জেঠুর তবে এই সংসার! জেঠুর এই হেনস্থা দেখে তাজ্জব। জেঠুর সামনে লীলাকে এত মারধোর করতে সাহস পায় কী করে! জেঠুকে বিন্দুমাত্র সমীহ করেন না মহিলা বোঝাই যায়। জেঠির সঙ্গে জেঠুর একদা প্রেম হয়েছিল—কেমন সব অবিশ্বাস্য ঠেকে। কুটু আস্তে আস্তে তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। কেউ আর কোনো কথা বলছে না। লীলা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রান্না ঘরে একটা আহত জন্তুর মতো ঢুকে গেল। একটুও কাঁদল না। বাড়িটা এখন ঠান্ডা। জেঠি খাটে বসে হাঁপাচ্ছিল বোধ হয়। এবং লোডশেডিং বলে, জেঠু পাখা খুঁজছে। সংসার এত বিরক্তিকর—জেঠু বলল, এই লীলা পাখা কোথায়? কোথায় যে সব তোরা রাখিস! কুটু বাথরুমে মাথায় জল ঢালছে—কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। নানু তখন চিৎকার করে বলল, পাখা দিয়ে কী হবে?
