জেঠু বলল, বাতাস!
নানু বলল, কাকে?
অবনীশ বলল, তোমার জেঠিকে। কেমন করছে দেখে যাও।
নানু বলল, তুমি দেখ। আমার দেখে কাজ নেই।
অবনীশ বড়ই একা। সে পাখাটা দেখল খাটের ও—পাশে পড়ে আছে। টেনে আনল পাখাটা। তারপর হাওয়া করতে লাগল। বোঝাতে থাকল—তুমি কেন মিছিমিছি মাথা গরম করো বুঝি না। মাথা গরম করলে কার ক্ষতি। তোমার না লীলার।
নানুর মুখে তখন কূট হাসি খেলে গেল। —জেঠু তাহলে তোমার এই সংসার। এই জীবন। জেঠু লীলাকে মুখ দেখাতে ফের তোমার লজ্জা হবে না! আমার কিন্তু হবে। এমন অসহায় একটা মেয়ের ওপর নির্যাতন করো তোমরা! তোমাদের ফাঁসি হওয়া উচিত না! বল, বিচারে তোমাদের কী কী শাস্তি প্রাপ্য। অথচ সে একটা কথা বলতে পারছে না। নবনীতা যদি জানে, তার পরিবারে এসব হয়, একজন অসহায় মেয়ের ওপর নির্যাতন হয়—কী ভাববে!
এত স্বার্থপরতা মানুষের মধ্যে থাকলে লীলারা যাবে কোথায়! কী সুন্দর চোখ মেয়েটার। নিরীহ নিরপরাধ। সে সহসা ডাকল, লীলা লীলা।
তারপরই ভাবল সে এটা কী করতে যাচ্ছে।
নানুর মাথার মধ্যে রেলগাড়ি চলছে! নানু বারান্দা পার হয়ে গেল। দেখল, জেঠু পাখায় বাতাস করছে। সে দাঁত শক্ত করে ফেলল। এবং রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, লীলা তোমার এত দেরি কেন?
লীলা জবাব দিল না।
কেন এত দেরি? বল। চুপ করে থাকলে কেন?
অবনীশ তাড়াতাড়ি পাখা ফেলে ছুটে এল—কী হচ্ছে নানু। তুমি আবার কী আরম্ভ করলে!
নানু শান্ত গলায় বলল, জবাব না দিলে, লীলাকে আমি খুন করব।
পুলিশ আসবে নানু।
যা হয় হবে।
অবনীশ বলল, লীলা বলে দে মা। কেন নানুকে রাগাচ্ছিস, জানিস ত এ—বাড়িতে রাগলে মাথা কার ঠিক থাকে না।
তখন লীলা বলল, দাদাবাবু লাইনে অনেক লোক ছিল। না দিলে আসি কী করে।
অবনীশ বলল, নে এবারে যা লীলা বলেছে, লাইন পড়েছিল লম্বা। আসে কী করে! আর ওর দোষ কী বল! সমাজে শোষণ নানাভাবে চলছে। ফেরেববাজ না হলে এ—দেশে নেতা হওয়া যায়! সুস্থ মস্তিষ্কের লোক কটা আছে। আয় এবার।
নানু হাত ছাড়িয়ে নিল, তারপর বলল, লীলা তুমি কেন এখানে মরতে এসেছ।
লীলা চুপ।
অবনীশ কেমন হতবাক।
জেঠি উঠে বসেছে।
লীলা আজই তুমি চলে যাবে।
অবনীশ চিৎকার করে উঠল, নানু তোর সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
নানু ফের বলল, লীলা আজই তুমি চলে যাবে।
লীলা ঘরের কোণ থেকে জবাব দিল, কোথায় যাব দাদাবাবু।
নানু আর একটা কথা বলতে পারল না। সে কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। সত্যি তো কোথায় যাবে? মেয়েটির যাবারও জায়গা নেই। সে সোজা বসার ঘরে ঢুকে পায়চারি করতে থাকল। সমস্ত পরিবারটাকে তার এ—সময় পুড়িয়ে মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কুটু, কুটু বড় ভালো মেয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে বলছে, দাদা আয়। খাবি না।
কুটুর কথার মধ্যে কী যেন আশ্চর্য নিরাময়ের সঞ্জীবনী সুধা ছিল। নানুর মাথার মধ্যে ফলে রেলগাড়িটা আর চলছে না। কুটুকে সে কাছে ডেকে আদর করল। এক মাথা চুল, মিহি উলের বলের মতো। সে মাথার চুল এলোমেলো করে দিল কুটুর। তারপর ভাবল, কুটু বড় হলে যদি তার মার মতো, জেঠির মতো হয়ে যায়। সে কুটুকে বলল, চল আমরা কোথাও চলে যাই।
বিকেলে নানু দেখল সবাই ঘুমিয়ে আছে। সে বসার ঘরে শুয়ে ছিল। কুটুকে নিয়ে ওর বাবা মা দরজা বন্ধ করে ঘুমচ্ছে। লীলা রান্নাঘরেই বোধহয় সব সময় থাকে। খাওয়া শোওয়া সব তার ও—ঘরে। লীলার কোনো সাড়া—শব্দ সে পাচ্ছিল না। তাছাড়া কেন জানি লীলার কথা ভেবে আশ্চর্য এক দুঃখ বোধে সে নিরন্তর পীড়িত হচ্ছিল। সংসারে মানুষের যে কত রকমের দুঃখ। এক সময় সে ডাকল, লীলা আমাকে এক গ্লাস জল দেবে।
মুহূর্তের মধ্যে দেখল, লীলা দরজায় এক গ্লাস জল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, ভিতরে এসো।
লীলা সন্তর্পণে ঢুকে জল এগিয়ে দিল।
নানু বলল, বোস।
লীলা দাঁড়িয়েই থাকল।
নানু বলল, তোমার কে কে আছে?
লীলা কিছু বলল না।
নানু পকেট থেকে কিছু এক টাকার নোট বের করে বলল, তোমার কাছে রাখো। ভালো মন্দ খেতে ইচ্ছে হলে খাবে। আর মাইনে পেলে শাড়ি কিনে নেবে। তোমার আর ফ্রক পরে থাকা ঠিক না।
লীলা কী—বলতে গিয়ে বলতে পারল না!
নানু অভয় দিয়ে বলল, বল ভয় কী!
আমার টাকা নেই দাদাবাবু। সব টাকা মাকে পাঠিয়ে দেয় মাসিমা।
তোমার মা আছে তা হলে?
লীলা আবার তেমনি চুপ।
তুমি বললেই পারো, কাজ করো তুমি, টাকা তোমাকে দিতে হবে।
লীলা চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে বলল, দাদাবাবু দোহাই ও—সব কথা বলবেন না। মাসিমা শুনতে পেলে আমার আর রক্ষে থাকবে না। মার সঙ্গে ওই কড়ারে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
নানু বলল, ঠিক আছে। তুমি যাও।
লীলা চলে যাচ্ছিল। নানু ফের ডাকল, টাকা কটা নিয়ে যাও।
না দাদাবাবু, মাসিমা জানতে পারলে আমাকে আস্ত রাখবে না।
ধুস তোমার মাসিমা। যা বলছি করো।
দোহাই দাদাবাবু।
লীলা কেমন পাথর হয়ে যাচ্ছে। ওর ছেঁড়া ফ্রক গায়ে, চুল কোমর পর্যন্ত।
নানু বলল, কাল আসব। তোমার সায়া শাড়ি কিনে আনব। তোমাকে পরতে হবে। লজ্জা করে না পুরুষের সামনে তোমার বের হতে।
লীলা এবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে দিল। —দাদাবাবু, তুমি ভগবান।
নানু বলল, গুলি মার ভগবানকে।
তারপর নানু ভগবানকে সত্যি গুলি মেরে উঠে পড়ল। লীলা চলে যাচ্ছে—আবার সেই রান্নাঘরে কিংবা দাওয়ায় বসে থাকা—নিরপরাধ এই কিশোরীর জন্য নানু আজ এই প্রথম ভারি মায়া বোধ করল।
তেরো
ঠিক দুপুরে খাওয়ার পর প্রিয়নাথের সামান্য দিবানিদ্রার অভ্যাস। শুলেই ঘুম আসে না। দোতলার ঘরটা ওর খুবই নিরিবিলি। কাকলি এ সময় নিজের ঘরে বসে ছবি—টবি আঁকে। অথবা খুব মৃদু শব্দ বাজে রেডিয়োর। হরলিক্সের আসর বোধহয় শুনছে। ঘড়ির কাঁটার মতো একটা শব্দ এবং কিছু প্রশ্ন, প্রশ্নগুলি কাকলি শুনে নিজেই একটা জবাব খাড়া করে রাখে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের জন্য কত রকমের প্রোগ্রাম করে থাকে রেডিয়ো। এবং এ—বাড়িতে প্রয়োজন কাকলিরই সবচেয়ে বেশি। তিনি অবশ্য সাড়ে সাতটার খবর নিবিষ্ট মনে শোনেন। যেন আজকালকার মধ্যেই কোনো বিপজ্জনক খবর আবার রেডিয়োতে ভেসে আসবে। কোথাও কিছু একটা হচ্ছে। যেন সব ভেঙে চুরমার করে দেবার জন্য কারা গোপনে প্রস্তুত হচ্ছে। তার বুক কাঁপে। পাশে ধর্মজীবন বাবাজীর আশ্রম আছে। সন্ধ্যায় সেখানে গীতাপাঠ, রামায়ণ পাঠ এবং ধর্মাধর্মের ওপর নানারকম আলোচনার সুবন্দোবস্ত আছে। বুড়ো মানুষদের জন্যে খুবই জরুরি এটা, তিনি অন্যমনস্ক থাকার জন্য কিছুটা সময় সেখানে অতিবাহিত করেন। কত রকমের বয়সের ছাপ মারা মুখ। যৌবনে ওরা কতটা তেজি ঘোড়া ছিল মাঝে মাঝে ভাববার চেষ্টা করেন। কত রকমের যে সংকট শরীর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয়। একটা বয়সের পরে আবার তা নিভে আসে। এবং তখন সেই যে বলে না প্রকৃতির কূটবুদ্ধি অথবা নির্জনে তার খেলা—মানুষ টেরও পায় না, অহরহ রক্তে মাংসে মজ্জায় এবং স্নায়ুতে কী তুমুল তুফান তুলে পালের দড়িদড়া ছিন্ন—ভিন্ন করে দিচ্ছে। এবং ওই সময়টাতে জীবনের সঠিক অর্থ কী, জীবন কী, জীবন মানে তো মাটির হাঁড়ি কলশি নয়, ভেঙে গেলেই অকেজো হয়ে যাবে—এবং দেখেছেন যত ভেঙে যায়, তত তার তেজ বাড়ে এবং তখন এক অন্যমনস্ক বৃদ্ধের ছবি এবং মৃত্যু ভয়। অদৃশ্য অস্পষ্ট অন্ধকারের ভয়। দিন যত যাচ্ছে ভয়টা তাকে ক্রমশ শিথিল করে দিচ্ছে। পুত্রের নিহত হওয়ার ঘটনা খুব একটা আর ভাবায় না! স্ত্রী গত হয়েছে দেড় দু—যুগ আগে। মাঝে মাঝে স্বপ্নে এক বালিকার ছবি দেখতে পান। সে বেণী দুলিয়ে হেঁটে যায় তাঁর পাশে।
