বাথরুম খোলা ছিল বলে একবার সেখানে ঢুকতে পেরেছিল। আর বাকি সময়টা ভীষণভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছিল বালিকাটি একহাতে সব কাজ কেমন করে একে একে করে যাচ্ছে। ওর ভারি চা খেতে ইচ্ছে হয়েছিল। এবং সেজন্য সে মুখ বাড়িয়ে বলেছিল, কীরে এক কাপ চা হবে? বালিকাটি ভারি কাঁচুমাচু চোখে ওর দিকে তাকিয়েছিল—তখনই বুঝেছিল, কত অসহায় এই মেয়েটি।
জেঠু এল বারোটা বাজে বাজে সময়ে। নানুকে দেখেই খুব ছেলেমানুষের মতো জড়িয়ে ধরেছিল, তুই এলি তবে! কেমন আছিস। তোর জেঠিমা বাড়ি নেই। থাকলে কী খুশি হত।
নানু বলেছিল, দেখা হয়েছে।
ওয়েল। দেন, বাড়ি চিনে আসতে কোনো ট্রাবল ফেস করতে হয়নি তো!
নানু বলেছিল, আমি তো আরও এসেছি। জেঠি ছিল। তোমার অফিসে ফোনে জানিয়েছিলাম মনে নেই? ট্রাবল ফেস করতে হবে কেন।
ও ইয়েস, ইয়েস। ইউ কেম। ভেরি গুড, নাউ ইউ কমপ্লিট ইউর বাথ। আমিও চানটা সেরে নেই। তারপর দুজনে জানালা খুলে শুয়ে পড়ব।
নানু জানে জেঠু সারাক্ষণ বক বক করতে ভালোবাসে। এবং জেঠু একটিই রেকর্ড চালিয়ে দেয়। রেকর্ডে সব মহৎ ব্যক্তিদের উক্তি এবং জীবন সম্পর্কে অতিশয় কঠিন সত্যের প্রকাশ থাকে। আরম্ভ হল বলে। প্রথম দিন শুনলে মনে হবে, বড়ই পণ্ডিতপ্রবর। দ্বিতীয় দিন শুনলে মনে হবে বড়ই রাজনৈতিক সচেতন। তৃতীয় দিন শুনলে মনে হবে, দেশের একজন চিন্তানায়ক তিনি! চতুর্থ দিনে আদর্শ শিক্ষক, পঞ্চম দিনে পরম রসিক, ষষ্ঠ দিনে ধর্মপরায়ণ, সপ্তম দিনে কবিয়াল, অষ্টম দিনে হাপুর বাজারের দালাল, নবম দিনে কোতোয়ালের পুত্র, দশম দিনে রমণীরঞ্জন, একাদশ দিনে একটি আস্ত আরশোলা। অর্থাৎ দশ দিনের ওপর জেঠুর সঙ্গে যে ব্যক্তি আলাপ করেছে তার বিন্দুমাত্র ভাবতে কষ্ট হয় না, মানুষটা জীবনে কোথাও এতই জেরবার যে পা রাখার আর জায়গা নেই। আস্ত একটি ভাঁড়। এ—হেন ব্যক্তিটি খেতে বসে বলেছিল, পোস্ত আলু আর ডাল বড়ই ডেলিসিয়াস ফুড। আমার ফেবারিট লাঞ্চ।
ভোজ্যদ্রব্য গলাধঃকরণ করতে নানুর খুবই কষ্ট হয়েছিল। বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, আসলে সেই মহীয়সী তোমার জন্য আর কিছু বরাদ্দ করেনি। তুমি যা রোজগার করো এবং মহীয়সী যা রোজগার করেন, সঞ্চয়ের জন্য। বেঁচে থাকার চেয়ে সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি বড়ই আরামদায়ক। অথবা তোমাকে একটি আস্ত অশ্ব বানিয়ে চেপে বসেছেন, এখন তোমার সওয়ারি নিয়ে শুধু ছোটা বাদে অন্য কোনো গত্যন্তর নেই। তবু নানু সাধারণত এই কাপুরুষ মানুষটিকে দুঃখ দিতে চায় না। সেও জেঠুর সঙ্গে খেতে খেতে বলেছিল, বড়ই সুস্বাদু খাবার!
যাইহোক আজ সে খবর দিয়ে এসেছে। এতদিনে জেঠির শরীর ভালো হয়ে যাবার কথা। এবং পেটের চর্বির নীচে বড়ই আন্ত্রিক গোলযোগ। মাঝে মাঝে যখন ঢেকুর তোলে তখন কাছে তিষ্ঠোয় এমন নরাধম জগতে কমই আছে। সেদিন সে বাড়ি ঢুকেই দেখেছিল মহীয়সী পা ছড়িয়ে বসে আছেন। কুলোয় পোয়াটেক খেসারীর ডাল। কাঁকর এবং আবর্জনা বাছার কাজটি তিনি সারছিলেন। এ—হেন সময়ে নানুর প্রবেশ। জেঠি আপাতত বিড়ম্বনা এবং বিরক্তি লুকিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে হেসে বলেছিলেন, হ্যাঁরে এসেছিস। তবু যে তোর জেঠির কথা মনে পড়ল।
রান্নাঘরে আজ সে অন্য এক বালিকাকে দেখতে পেল। ঠিক বালিকা বলা চলে না, কিশোরী, ছেঁড়া ফ্রক গায়ে—চোখ দুটো ভারি মিষ্টি। গরিব দুঃখী ঘরের মেয়ে—শীর্ণকায়, কতদিনের উপবাসের কত বড় দুর্ভাগ্য হলে এমন একটি পরিবারে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় পায়। জেঠু ভেতর থেকে কাঁধটা সামান্য স্রাগ করে লম্বা প্যাকাটির মতো মুখ বার করে দিয়ে বলল, হ্যালো নানু। এসে গেছ। মাই লিটল চ্যাপ। ভিতরে চলে এসো। বসে পড়। লুডু খেলছি। কুটুর সঙ্গে। উড য়ু লাইক টু প্লে লুডু।
শোবার ঘরটিতে নানুর ঢুকতে সাহস হচ্ছে না। কারণ এক্ষুণি জেঠি বাজারে যাবে। সেদিন যা দেখেছে তাতে মনে হয়েছে, যাবার আগে জেঠি আজও শোবার ঘরে জীবজন্তুসহ তালা বন্ধ করে চলে যাবে। ফাঁক পেলে কে কখন জান মাল দুই তছরূপ করে নেবে সেই একমাত্র ভয়। তখনই ছোট ছোট কাপে চা নিয়ে এল সেই কিশোরী। নানু এত সকালে এসে উপস্থিত হবে হিসেবের বাইরে ছিল। দুখানা করে স্যাঁকা পাউরুটি এবং চা। নানু আসায় স্যাঁকা রুটির ভগ্নাংশ বেড়ে গেল। মেয়েটি একটা স্টিলের বড় থালায় চা সাজিয়ে এনেছে। এবং নানু দেখল, বড়ই জবু থবু হয়ে হাঁটছে মেয়েটি। ওর ফ্রকের পেছনটা একটা হিংস্র বাঘের থাবায় পড়েছিল বোঝা যায়। বাঘ না বাঘিনী এখনও নানু সেটা আন্দাজ করে উঠতে পারেনি।
জেঠি বলল, নানু চা নে। তারপর রুটির প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল, খা। তুই এত সকালে আসবি বুঝতে পারিনি। ঘরে মাখন ডিম আজই ফুরিয়ে গেল। আর তোমার জেঠু এমন জায়গায় বাড়ি করেছে যে যদি কিছু পাওয়া যায়। নানু জানে সবই মিথ্যা বাক্য। জায়গাটি জেঠিই পছন্দ করেছে—বাজার বেশি দূরেও নয়। সবই পাওয়া যায়। সে শুকনো রুটি একদম খেতে পারে না। অগত্যা চায়ে ভিজিয়ে তিনবারের মাথায় খেতে গিয়ে দেখল অভাগা রুটি সবটুকু চা শুষে নিয়েছে। এ—সব কারণেই নানু জেঠুর বাড়ি আসতে চায় না।
কুটু বলল, এই দাদা, খেলবে তো ঠিক হয়ে বস।
নানু বলল লুডু খেলছিস, পড়াশোনা নেই।
জেঠু বলল, আছে, পড়াশোনা আছে। তবে সকাল থেকেই বায়না, তুমি আসছ, সুতরাং পড়বে না। বললাম পড়বি নাত কী করবি? কুটু বলল লুডু খেলব। তাই লুডু নিয়ে বসেছি।
