কালিদাস বলল, এই বোস, আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসব।
কোথায়?
যেখানে যাচ্ছিস রাগ করে।
সেটা কতদূর যখন জানিস না, কথা বলিস না বোকার মতো।
নীরদদা বলল, তোমার যাওয়া উচিত হচ্ছে না জয়া। বরং তুমি তোমার কবিতা পড়েই যাও। কাশীনাথের হলে তুমি পড়বে।
জয়া হেসে ফেলল। আচ্ছা নীরদদা আপনি কী!
কেন বলত!
আপনি আমাকে কী ভাবেন! কেমন গম্ভীর গলা জয়ার।
নীরদ বললে, কী ভাবি!
খুব ছেলেমানুষ ভাবেন!
ধুস, মেয়েরা বারো পার হলেই আর ছেলেমানুষ থাকে না। তোমার তো সে হিসেবে অনেক বয়েস।
গাছ—পাথর নেই।
গাছ—পাথরের কথা বলতে চাই না। এ—বয়সে মেয়েরা নিজের সম্পর্কে খুব সচেতন হয়ে ওঠে এটা বুঝি।
কাশীনাথ কবিতার খাতা বন্ধ করে দিয়ে বলল, আপনারা আর কতক্ষণ কথা বলবেন?
নীরদ খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল কথাটায়। সত্যি যখন কবিতা পাঠ হচ্ছে, এভাবে জয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় পরেও পাওয়া যাবে। সে বলল, আচ্ছা তা হলে জয়া তুমি যাও।
জয়া বাইরে এসে ভাবল কাজটা অনুচিত হয়েছে, আসলে সে যে কেন বলেছিল দাদা আমার কিছু ভালো লাগছে না বুঝতে পারছিল না। এখন মনে পড়ছে মানুর জন্য সত্যি মনটা খারাপ হয়েছিল। একা সিনেমায় ছেড়ে চলে এল, মানু কত কিছু ভাবতে পারে। মানুকে তার খুব ভালো লাগে। লম্বা হাত পা, চোখ বেশ সুন্দর, এবং চুলে কী যে তার মহিমা আছে, এখন যে হাড়ে হাড়ে সে এটা টের পাচ্ছে। সে তখনই দেখল পেছনে কালিদাস ছুটে আসছে। কালিদাস হাঁকছে, এই জয়া দাঁড়া।
জয়া দাঁড়াল না। হন হন করে হাঁটতে থাকল। কেমন বেহায়াপনা আছে কালিদাসের ভেতর।
কী রে শুনতে পাচ্ছিস না।
জয়া গলির মোড়ে এসে দাঁড়াল। কালিদাস কাছে এলে বলল, কীরে এত চিল্লাচ্ছিস কেন!
চল তোকে আমি এসকট করি।
আর কিছু করবি না?
করতে দিলি কই।
জয়া বলল, সব এত সোজা ভাবিস কেন? জয়াকে ভীষণ গম্ভীর দেখাল। জয়ার উঁচু হিলের জুতোর ফাঁকে গোড়ালিটা দেখা যাচ্ছে। কী লাবণ্য এই পায়ে। কালিদাসের উপুড় হয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু মেজাজ মনে হচ্ছে সত্যি জয়ার ভালো না। সে পাশাপাশি হাঁটতে থাকল শুধু। কী কথা বলবে ঠিক বুঝতে পারল না।
অগত্যা যা হয়, কবিতার কথা। এবং দুটি একটি টিপ্পনি কাটল নবীনা সম্পর্কে। কাশীনাথ বুড়ো হাবড়া জাহান্নামে যাওয়া সব চিন্তা ভাবনা, যুবতীদের শরীর নিয়ে এত হ্যাংলার মতো লেখার কী আছে—এসবই কথা প্রসঙ্গে জয়াকে বলতে থাকল। জয়া কখনও না কখনও হাঁ করে যাচ্ছে। এবং ট্রাম স্টপ আসতেই প্রায় চলন্ত ট্রামে লাফিয়ে উঠে গেল। এবং হাত নেড়ে কালিদাসকে টা টা করল। কালিদাস কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে দেখল, ট্রামটা বেশ দ্রুত চলে যাচ্ছে। জয়ার শাড়ির আঁচল অতি অল্প হাওয়ায় উড়ছিল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। জয়ার তো এ—ট্রামে ফেরার কথা নয়।
বারো
এই বাড়িটায় নানু আরও ক’বার এসেছে। একবার সে এসে দেখেছিল, কেউ নেই, কাজ করে যে বালিকাটি শুধু সেই আছে। আর একবার এসে দেখেছিল, জেঠু বের হয়ে গেছে কোথায়। জেঠুর মহিয়সী ভূড়ি দুলিয়ে ব্যাগ দুলিয়ে মেয়ের হাত ধরে কোথায় রওনা হবার জন্য বের হচ্ছে। ওকে দেখেই, আরে নানু এলি। ও—মা কত দিন পর এলি। তোর বুঝি আমাদের কথা মনে থাকে না। তোর জেঠুর তো ঘুম নেই দুচোখে, তোর কথা ভেবে। যাক তবু যে এলি। বোস। তারপরই সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ডাল বসিয়ে দে। পোস্ত বাটা আছে। মাছ টাছ তো আর পাওয়া যায় না।
নানুর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুমি খেয়ে যাবে। জেঠি তার বেশি সোহাগে তুই তুকারি করে। আর বিরক্ত হলে তুমি তুমি করে।
নানু বলেছিল, জেঠু কোথায়।
মহীয়সী বলেছিল, আসবে। তুমি কিন্তু চলে যেও না আবার। তোমার জেঠু তবে খুব খারাপ ভাববে।
নানু বলেছিল, না না। জেঠুর সঙ্গে দেখা করে যাব।
খেয়েও যাবে।
তা যাব।
আমি যাচ্ছি বুঝলে। এই কণা, শুনতে পাচছিস না, মহীয়সী চিৎকার করে সেই বালিকা চাকরাণীকে ডেকে, বলেছিল, নানুবাবুকে চানের জল তুলে দিস। রান্না হলে গুল দিস। পুকুর থেকে জল এনে সাদা শাড়িটা কাচবি। কলের জলে ধুলে তোমার একটা দাঁতও আস্ত রাখব না।
জেঠুর মেয়েটা তখনই কুঁই করে উঠল। চল মা। যাবে না।
নানু বলেছিল, এই হাবলা।
আমাকে হাবলা বলবে না আমার নাম কুটু।
নানু চুল নেড়ে বলেছিল, কেমন আছিস। যাবি আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে। ছোট্ট বোনটিকে মাঝে মাঝে নানুর ভারি আদর করতে ইচ্ছে হয়। সে বলেছিল, কোথায় যাচ্ছিস, আমার সঙ্গে থাক।
কুটু বলেছিল, না। মার সঙ্গে আমি যাব।
নানু বলেছিল, আমি তোর দাদা। দাদার কথা শুনতে হয়।
বের হবার আগে আর কী কী আদেশ জারি করা বাকি আছে ভেবে বোধ হয় সেই মহীয়সী বারান্দায় দু—বার পায়চারি করল, একবার শোবার ঘরে ঢুকে তালা ফালা সব জায়গা মতো দেওয়া আছে কিনা দেখে নিয়েছিল। শোবার ঘরের জানালা বন্ধ করে দরজার শেকল তুলে সেখানেও একটি বৃহৎ ঘণ্টার মতো তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কেবল খোলা রেখে গেল বাইরের ঘরটি—সেখানেই জেঠু না আসা পর্যন্ত নানুকে অপেক্ষা করতে হবে। বড়ই সাবধানী মহিলা। জীবনের কোনো ক্ষেত্রে ঠকতে রাজি না। নানুর স্বভাব কেমন কে জানে! নানুর মনে হয়েছিল, তখনই সে চলে যায়—কিন্তু গেলে জেঠু কষ্ট পেতে পারে—জেঠু, আহা সেই জেঠু যে তাকে হাত ধরে পার্কে নিয়ে যেত, লাল বল নিয়ে তার সঙ্গে খেলা করত। একজন মহীয়সীর পাল্লায় পড়ে জেঠুর লাইফ জেরবার—এবং তখনই মনে হয়েছিল, সারাদিন থেকে জেঠুর জীবনের বাকি সময়টা কেমন করে কাটে দেখে যাবে।
