কালিদাসের কাছে জয়া দেবীর মতো। নাকে নথ পরে থাকলে জয়াকে সরস্বতী ঠাকুরণ ভাবা যেত অনায়াসে। বসার ভঙ্গিটা ঠিক তেমনি। জয়ার বুক ভারী উঁচু এবং প্রবল। শাড়ির অভ্যন্তরে থাকতে চায় না যেন। সে চুরি করে এখন মাঝে মাঝে তাই দেখছে।
এবার কবিতা পাঠ আরম্ভ হোক, নীরদ হাজরা বলে উঠলেন।
তখনই গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল দরজায়। জয়ার মুখটা কালো হয়ে গেল।
নবীনা এখানে আসবে, কালিদাস বলেনি। জয়ার মুখটা কালো হয়ে গেল। না আসবারই তো কথা। তবু চুপি চুপি ঠিক বলে রেখেছে। কালিদাস এবং বিনয় এখন আর ওর দিকে তাকাবেই না। শুধু ওরা কেন, সবাই। সে এলেই সবাই যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে। নীরদদা দরজা ঠেলে বাইরে বের হয়ে গেলেন। এবং নবীনা যখন এল, প্রায় সম্রাজ্ঞীর মতো। নবীনাকে এলিভেটেড সু পরতে হয় না। ঈশ্বর আসল জায়গাতেই জয়াকে মেরে রেখেছে। সে কেবল তীব্র ঈর্ষাবোধে কাতর হতে থাকল।
নবীনা সবাইকে এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠ নীরদদাকে তুই তুকারি করে। এমন একটা ভঙ্গি কথাবার্তায় অথবা চালচলনে, যে সে এই সব যুবকদের থোরাই কেয়ার করে। যেন এদের সবার জন্যে সে কিছুটা দিতে পারে। কার জন্যে ঠ্যাং, কার জন্যে জঙ্ঘা, কার জন্য বুক, চিবুক অথবা ঠোঁট সবাই কিছুটা কিছুটা পাবে, সবটা পাবে না। সবটা সে কোনো একজনকে দিতে পারে না। জয়া কিন্তু সবটা একজনকেই দিতে পারে। জোর জবরদস্তি না করে দু’মাস আগের এক সকালে ওর চোখে মানু চুমো খেয়েছিল। মানুটা এত বোকা! বুঝতে এত সময় নেয় কেন তার মাথায় আসে না। সে কেমন নীরস গলায় বলল, নবীনাদি, তোর আসতে এত দেরি কেন রে!
আর বলিস না ভাই। উমাশংকর এসেছিল। উঠতেই চায় না। ওর কোথায় জলছবির কারখানা আছে, ওটা দেখাতে নিয়ে যাবে। প্রেস খুলেছে নতুন। কবিতার বইয়ের জন্য ঝোলাঝুলি করছে।
ফানটুস! ভেতরে এই একটা শব্দ বেলুনে পিন ফুটিয়ে দেবার মতো বের হয়ে গেছিল প্রায়। সে বলল, তোর মাইরি ভাগ্য বলতে হবে।
কালো মতো, রোগা মতো মেয়েটা বলল, নবীনাদি তোমার মতো ভাগ্য ক’জনের আছে। আমাদের একটা কবিতার বই ছাপিয়ে দাও না।
হবে হবে। বলে পা আলগা করে বসে পড়ল নবীনা। তারপর বলল, এখনও আরম্ভ হয়নি।
হবে এবার। তুমিই আরম্ভ কর। নবীনা থাকলে আর কারও যেন আরম্ভ করার অধিকারই নেই। নবীনা আসায় নীরদদা গর্বে ডগমগ করছেন। ফুল সেসান! নীরদদা গৃহকর্তার দিকে তাকালেন। এ সময়ে একরাউন্ড চা হলে মন্দ হয় না। গৃহকর্তা কোঁচা দুলিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
জয়ার মনে হল, আজই সব সে একজনকে দেবে। দিয়ে দেখবে কবিতার চেয়ে কত বেশি তীব্র সুখ। এবং এ সময় মানুর জন্যে প্রবল টান বোধ করল। মানুকে বাড়ি ফিরেই ডেকে পাঠাবে। তার চোখ মুখ উত্তাপে জ্বলছিল। যেন প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর আসছে। রোমকূপে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিচ্ছিল। সে আর সত্যি বসে থাকতে পারছে না। কবিতা—ফবিতা মাথায় উঠেছে।
নবীনা তখন বলল, কী রে জয়া, শরীর ভালো নেই! এমন করছিস কেন?
জয়া বলল, বোধহয় ভালো নেই।
কালিদাস, বিনয় এবং অন্য সবাই বুঝতে পারছে সেই রোগটা বুঝি দেখা দিয়েছে জয়ার। নবীনা এলেই জয়ার অস্বস্তি ফুটে ওঠে।
নীরদদা বললেন, পাখাটা জোরে চালিয়ে দাও অমিয়। জয়া বড্ড ঘামছে।
নীরদদা চায়ের কাপগুলো এগিয়ে দিচ্ছিলেন! নবীনা ঝুঁকে আছে তার কবিতার ওপর। কাশীনাথ পাতা উলটে যাচ্ছে। বিনয় কালিদাস ফিস ফিস করে কী সব বলছিল। বিনয় উঠে চা এগিয়ে দিল জয়াকে, ফুল্লরাকে। আবার বসে পড়ে সেই ফিস ফিস কথাবার্তা আরম্ভ করলে জয়া ধমকে উঠল, ভালো হচ্ছে না বিনয়। কী যা তা সব বলছ, শুনতে পাচ্ছি।
তোমাকে বলছি না।
যাকেই বলছ, সে আমার গোত্রের।
কালিদাস বলল, নো আর সত্যি কথা নয়। কবিতা পাঠ এবার কার?
কাশীনাথ তাকাল নীরদদার দিকে। শেষের দিকে হলে কিছুটা অসম্মান সে ভেবে থাকে। এবং নীরদ সেটা জানে।
নীরদ বলল, কাশী এবার তুমি পড়ো। গম্ভীর গলায় পড়ো।
জয়ার হাই উঠছিল। এখনি কবিতার গোটা শরীরটা চিরে ফেলবে হারামি লোকটা। আরে মানুষের ভেতরে কী থাকে এটা তোমার কাছে কে জানতে চায়, বাইরে সে কী ভালোবাসে তার কথা বল। জয়া হয়তো বলেই ফেলত ধমাস করে, নীরদদা উঠি। ভাল্লাগছে না। এবং তখনই মানু মাথার ভেতরে হেঁটে যায় তার। সে বুঝতে পারল তার কবিতার গভীরতা একমাত্র এই বয়সে মানুই প্রথম পরিমাপ করে দেখতে পারে।
কাশীনাথ দুবার গলা খেকারী দিল। তারপর বলল, একটু জল।
একগ্লাস জল হোস্ট ব্যক্তিটি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে আনল।
কাশীনাথ জল খেল চুক চুক করে।
এই জল, বলে সে কবিতার লাইনটা দুবার দুরকমভাবে ঘুরিয়ে বলল, জল এই, এই জল। ভেতরে যতদূর যায়। দেখবে গভীর হলুদ অন্ধকার। আরও নীচে তার কোনো পরিমাপ নেই।
কাশীনাথের কবিতায় পরিমাপ শব্দটির খুব বেশি বোধহয় ব্যবহার আছে। জয়া কী তবে গভীরতা পরিমাপ করার ব্যাপারে কাশীনাথের কবিতা থেকে ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছে। ভাবতেই গা—টা কেমন গুলিয়ে উঠল জয়ার। সে উঠে বলল, দাদা যাই।
সে কি!
হা হা করে উঠল সবাই।
আমার শরীরটা ভালো নেই।
কেন কী হল!
ঠিক বুঝতে পারছি না।
নবীনা বলল, জয়া তোমার কবিতা শুনব বলে এত কাজের ভেতরেও চলে এলাম।
আর একদিন শুনবে।
নীরদ ঠিক বুঝতে পারল না কেন জয়ার শরীর খারাপ, কেন সহসা কবিতা পাঠের আসর ছেড়ে চলে যেতে চাইছে। জয়াকে আজ ইচ্ছে করেই শেষের দিকে রেখেছে। মেয়েটা সত্যি কবিতা ভালো লেখে। এবং সবার শোনার আগ্রহ থাকে। অন্য সময় ভালো কবিতা দিয়ে সে আরম্ভ করে দেখেছে সবাই কোনো অজুহাত দেখিয়ে কবিতা পাঠ শেষ না হতেই চলে যায়। এবং যারা নতুন, অথবা কবিতার মুদ্রাদোষে আক্রান্ত, খবর পেলেই গন্ধে চলে আসে যারা, ফাঁকা মাঠে পড়ে যায়। সুতরাং নীরদ এবার ভেবেছে, ভালো সবকিছু শেষের দিকে।
