আমি ছল ছল চোখে বললাম, হয়তো তোমার কথাই ঠিক বাবা, কিন্তু আমার কাছে ঐ মেয়েটি যে অনেক বড়। তাই যদি হয় তাহলে, তার সাথে কি এমন হয়েছে যার জন্য তোমাকে ছেড়ে তার চলে যেতে হল। কিছুই হয়নি। তুমি ঠিক বলছ না প্রান্তিক। তারপর বললেন হ্যাঁ একটি মেয়ে এসেছিল। প্রথম দিন ওনাদের সঙ্গেই এসেছিল। পরের দিন একাই এসেছিল। আমাকে বলল, আমি একা এসেছি বলে অবাক হচ্ছেন নাতো? অবাক হব কেন? কাল এসেছিলে তুমি, আজতো চেনা বাড়ীতে এসেছে। এটা গ্রাম, এখানে মানুষ অনেক সহজ সরল, অবাক হওয়ার প্রশ্ন নেই। হয়তো সময় কাটছেনা, তাই চলে এসেছে। কিন্তু মা, তোমার যেন কিছু বলার আছে মনে হচ্ছে? না না কিছু বলার নেই। আমি বললাম তোমার মাসিমাকে ডাকি। ও বলল, না থাক, সময় মত আমিই যাব ওনার কাছে, আমি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম, আমার মতো বৃদ্ধের সাথে আর কতক্ষণ কথা বলবে মা বরং আমার ভাইঝি ইতিকে ডাকি। ওঠিক তোমার বয়সী নয়, তবে ওই এবাড়ীর এক মাত্র মেয়ে, তোমার থেকে কয়েক বছরের ছোট হবে। ও বলল, দরকার নেই বাবা, ওর হঠাৎ বাবা ডাক শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম, কি বললে মা। বাবা। তারপর বলল, আপত্তি থাকলে ডাকব না, কি জানি কেন আপনাকে দেখে আমার বাবা ডাকতে ইচ্ছে হল। তারপরে বলল, বাবাতো নেই তাই হঠাৎ মুখ দিয়ে ওই ডাকটা মনে এল। এ সময় তোমার মা এসে বললেন, মেয়েটির সাথে তখন থেকে এত কি কথা বলছ, ওকে তো কিছু খেতে দেওয়ার কথা বলবে? মেয়েটি লজ্জা পেয়ে বলল না মা, আমার খিদে নেই। এই তো দুপুরে খেয়েছি। তোমার মা বললেন, সেতো দুপুর আর এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে বেশী বাকি নেই। তুমি বস মা, আমি তোমার জন্য নারকেল, গুড় আর মুড়ি নিয়ে আসছি। আমাদের এখানে এর থেকেতো বেশী কিছু পাওয়া যাবে না। মিষ্টি পেতে গেলে হাটে যেতে হবে, সে তো অনেক দূর। মেয়েটি আমার দিকে তাকাল তোমার মাকে বললাম, তুমি এঘরেই পাঠিয়ে দাও। তারপর আমি ও যেখানে কথা শেষ করেছিল, সেখান থেকে আরম্ভ করে বললাম খুব দুঃখের মা। আমাকে তুমি বাবা বলেই ডেকো। ও ছলছল চোখে অকারণে আমাকে একটা প্রণাম করে বলল, মনে রাখবেন কিন্তু, আমাকে আপনি মেয়ে বলে মেনে নিয়েছেন। হ্যাঁ তাতে নিয়েছি। কিন্তু মেয়ে কি বাবাকে আপনি করে বলে? বলে না বুঝি? ওর কথা শুনে কি যে হল প্রান্তিক, আর ওর কণ্ঠস্বরে কি যে ছিল আমি জানিনা। মনে মনে ভেবেছিলাম, মেয়েটির পরিচয়, মাষ্টারমশাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, তারপর ভেবে দেখব আমার ইচ্ছে পূরণ করা যায় কি না। আমি বললাম, তারপর? আরো দুই একটি কথা বলে, মেয়েটি উঠে যাওয়ার সময়ে আবারও প্রণাম করে বলল, আপনি কিন্তু আমাকে মেয়ে হিসাবে মেনে নিয়েছেন, অস্বীকার করবেন না কিন্তু। আমি হাসতে হাসতে বললাম মেয়েকে কি কোন বাবা অস্বীকার করে। ও একটু হাসল তারপর চলে গেলো। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার মনটাকে যে প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে গেল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
পরের দিন মাষ্টারমশাইয়ের বাড়ীতে গেলাম। কি যে মায়ায় বেঁধে গেল মেয়েটি। কিন্তু ওখানে গিয়ে শুনলাম, ও চলে গেছে। আমি বললাম তাতে কি। ও আবার কবে আসবে, আমি একবার ওদের বাড়ী যেতে চাই। মাষ্টারমশাই বললেন আমিতো ওদের বাড়ী চিনি না সীতাংশু বাবু। আশ্চর্য হয়ে বললাম সেকি মাষ্টারমশাই, আপনি যে বললেন, আপনার আত্মীয়া। হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু আর কিছু জানতে চাইবেন না। তারপর বললেন মেয়েটি স্বপ্নের মত এসেছিল, আমাদের এখানে, আবার হারিয়েও গেল স্বপ্নের মত। তবে ও কথা। দিয়ে গেছে সীতাংশু বাবু আবার ও আসবে। আসলে আপনার কাছে নিয়ে যাব।
আমি আর কি বলব। কেন সে এসেছিল, কেন সে এমনি ভাবে নিজেকে গোপন করে আবার চলেও গেল কোন উত্তরই জানিনা। ভেবেছিলাম সেলিনা, মিনতি সেন বা নীলাঞ্জনা পিসি কে বলব। কিন্তু ভাল লাগলনা। বলতে ইচ্ছেও করলনা। ফিরে এলাম কলকাতায়। সেলিনাকে একবার ভেবেছিলাম জিজ্ঞাসা করি, কেমন লাগল আমাদের গ্রাম। তাও করা হল না।
আবার দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় নিজেকে মানিয়ে নিলাম। মনে বিশ্বাস, কোথাও না কোথায় রেহানার সাথে আবার আমার দেখা হবে। শ্রুতিকণা বলল, আজ বাবা আসছেন। যাবে আমাদের বাড়ীতে? আমি রাজী হয়ে ওদের বাড়ী যখন গেলাম তখন রাত হয়েছে। ওর বাবা প্রমথ বাবু, শ্রুতিকণাব বিয়ের ব্যাপারে বেশ কিছুদিনেব ছুটি নিয়ে এসেছেন।
আজ ওকে দেখতে এসেছেন সজল রায়, প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার। যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তাকে দেখে অবাক হয়ে বললাম, কেমন আছেন? ভদ্রলোক যেন হাতড়িয়ে ফিরছেন কে আমি? তারপর চিনতে পেরে বললেন, হ্যালো ইয়ংম্যান, তোমার গবেষণার কি হলো? ভীষণ ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার নিয়ে তুমি গবেষণা করছিলে। তোমার ইনটারভিউ নেওয়া শেষ? এত তাড়াতাড়ি কি শেষ হয়? তবে প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছি। খুব ভাল। তোমার থিসিস্ জমা দেওয়ার আগে আমাকে একবার দেখিও তো। অবশ্য যদি তোমার আপত্তি না থাকে। নিশ্চয়ই দেখাব। তারপর জিজ্ঞাসা করলাম সজল বাবু কি আপনার ওখানে কাজ করেন? হ্যাঁ। খুব ব্লিলিয়ান্ট ছেলে।
স্নেহময়ী দেবী আমায় ডেকে পাঠালেন। আমি ওঘরে গেলে শ্রুতিকণা বলল, ভদ্রলোককে তুমি চেন নাকি? হ্যাঁ চিনি, তবে সজল বাবুকে চিনিনা। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, ইউ আর এ ভেরি লাকি উওম্যান। ও কথায় ঠেশ দিয়ে বলল, বেহানার থেকেও। আমি বললাম, রেহানা এক হতভাগ্য মেয়ে, কেন তাকে বারবার টেনে নিয়ে আস কণা। আমার একদম ভাল লাগে না। যথেষ্ট অনুতপ্ত কণ্ঠে অশ্রুকণা বলল, আমি ঠিক ওভাবে বলিনি, বিশ্বাস কর। স্নেহময়ী দেবী বললেন, সত্যিইতো অশ্রু কেন ওকে তোরা আঘাত দিস। ওকে তোদের একটু বোঝা উচিৎ।
