উনি বললেন, গেজেটে তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। তোমার কৃতকাৰ্য্যতায় সারা গ্রাম উৎসব মুখর। ঠিক সেই সময়ে একটি মেয়ে, হ্যাঁ তোমার বয়সী হবে, একেবারে আটপৌরে পোষাকে পায়ে পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার একটা প্রণাম করে বলল, আপনিতো হেডস্যার তাইনা? কথায় কোন জড়তা নেই। নেই কোন অস্পষ্টতা। আমি বাধা দিয়ে বললাম তার কথা শুনে আমার কি লাভ মাষ্টারমশাই? লাভ লোকসানের হিসাব জানিনা প্রান্তিক, তোমাকে বলা প্রয়োজন বলে বলছি, শোনা না শোনা তোমার ব্যাপার। মেয়েটির প্রশ্নের, উত্তরে বললাম হ্যাঁ আমি প্রধানশিক্ষক কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম, মেয়েটি যখন আমার কাছে জানতে চাইল, আপনি কি স্যার বলতে পারবেন, প্রান্তিকদের বাড়ী এখানে কোনটা। আমি চমকে উঠে বললাম। প্রান্তিক? তাদের বাড়ীতে তোমার কি দরকার? মেয়েটি একটু হাসল, তারপর বলল, ঠিক এই ভয়েই এখানকার কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি পাছে, অনেক অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। আপনি প্রধানশিক্ষক, একটি অসহায় মেয়ের মর্যাদা আপনিই রক্ষা করবেন এই বিশ্বাসে, আপনাকে নিঃসঙ্কোচে সব কথা বলা যায়। মনে হল মেয়েটিকে বিশ্বাস করা যায়। বললাম তুমি প্রন্তিকদের বাড়ী যেতে চাও? ওকে তুমি চেন? হ্যাঁ চিনি? তা হলে ওকে নিয়ে এলেনা কেন? বলল, সে সব অনেক কথা। আপনি একবার নিয়ে যাবেন ওদের বাড়ীতে? কি পরিচয় দেব। যা তোক একটা পরিচয় দেবেন? আপনার যেমন সুবিধা, আমি কিছু মনে করবনা। কি যে হল প্রান্তিক কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু মনে হতে লাগল এ মেয়ে নিশ্চয়ই তোমার পরিচিত। হয়তো কোন চরম অভিমানে তোমার কাছ থেকে সরে এসেছে। আমি ওকে বললাম বাড়ী চল। তোমার কথা সব শুনবো। তারপর নিয়ে যাবো ওদের বাড়ীতে। ওকে বাড়ীতে নিয়ে এলাম।
এই অবসরে মেয়েটি বলে গেল তার কাহিনী। তোমার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা। কেন চলে এলো, কেন চরম আঘাত দিতে তোমাকে বাধ্য হল, এই সব কথা। আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করাতে ও বলল, যে কোন নামে আপনি আমায় ডাকতে পারেন মাষ্টারমশাই। সেদিন আর যাওয়া হল না কিন্তু পরের দিন তোমাদের বাড়ীতে নিয়ে গেলাম ওকে। তোমার মাসিমাও ছিলেন। তোমার বাবা মাকে ও প্রণাম করলে, আমার কাছে জানতে চাইলেন, কে এই মেয়েটি। আমাকে একটা মিথ্যে পরিচয় দিতে হল ওর অনুরোধে। আমি জানিনা প্রান্তিক, কেন সে তার সত্য পরিচয় গোপন করতে চেয়েছিল। ২ দিন ছিল আমার এখানে। তৃতীয় দিন যাওয়ার সময় প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিল, আমি যেন তার কোন কথা কাউকে কোনদিন না বলি। আর বিনিময়ে আমিও তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলাম, আরেক বার যেন সে আসে আমার কাছে। আরো বললাম, মা তুমিতো সবই বললে শুধু তোমার নামটা ছাড়া, নামটা কি একেবারেই বলা যাবেনা। হাসল মেয়েটি। বলল বলব, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাবেন। বেশ তাই হবে, এবার বল। ও বলল আমি রেহানা। নামটা উচ্চরণ করেই দ্রুত মিলিয়ে গেল ও। ট্রেনের কোন কামরায় যে উঠলো, আর খুঁজে পেলাম না। দেখা হলো না আর। গাড়ীটা তখন দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে। আমি তো অবাক!
রেহানা এখানে? এই আমাদের গ্রামের বাড়ীতে? অনেক দিনের স্বপ্ন তার গ্রামে আসার। সেই তো এলে, তবু আমাকে কাঁদালে কেন? আমি মাষ্টারমশাইকে বললাম আপনি, ঠিক বলছেন তো। থর থর করে কাঁপতে লাগলাম আমি। প্রান্তিক কি হয়েছে তোমার এমন করছ কেন? কে এই রেহানা? আমি ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে বললাম, ও আমার সব মাষ্টারমশাই ও আমার সব। ও আমার সুখ, আমার আনন্দ, আমার দুঃখ, আমার বেদনা, আমার মান, আমার অভিমান, আমার ব্যর্থতা, আমার সার্থকতা, আমার দ্বেষ, হিংসা আর উজ্জ্বলতা। আমার বিষণ্ণতা এবং পূর্ণতা, আমার প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তি, আমার হাহাকার, আমার জীবনের ঝংকার। একবার বলুন মাষ্টারমশাই ও কেমন আছে?
মাষ্টারমশাই বললেন তোমার প্রশ্নের উত্তর তো আমার জানা নেই। ও যখন দ্রুত মিলিয়ে গেল, এমনি একটা কিছু সন্দেহ করেছিলাম প্রান্তিক। কিন্তু আর তো তাকে খুঁজে পেলামনা। আমি বললাম, সেদিন সে কেমন ছিল। সেদিন তার শরীর ভাল ছিল তো। ঠিক মতো হাঁটতে পারছিল তো। তারপর মাষ্টারমশায়ের হাত ধরে বললাম। কোথায় ওকে খুঁজে পাব বলতে পারেন মাষ্টারমশাই। তুমি শান্ত হও প্রান্তিক ও কথা দিয়ে গেছে, ও আরেক দিন আসবে। সেদিন তোমাকে জানাতে ভুল করবো না।
আধো অচেতন মনের মধ্যে যে মেয়ে বেঁচেছিল, সে যে কেমন করে এক ঝটিকায় এমন ভাবে চেতনাকে নাড়া দিয়ে হৃদয়কে হাহাকারে ভরে দিয়ে গেল কি করে তার ব্যখ্যা করব। মাকে বললাম, একটা মেয়ে তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তোমরা তো আমাকে বলোনি? মা অবাক হয়ে বললেন, কে দেখা করতে এসেছিল? কই কিছু মনে পড়ছে না তো! বাবা ছিলেন কাছে, বললেন, তুমি আমার ঘরে এস। আস্তে আস্তে পায়ে পায়ে বাবা যে ঘরে থাকেন সে ঘরে গেলাম। বললাম বল। তুমি কার কথা বলছ? কে দেখা করতে এসেছিল? মাষ্টারমশাইয়ের সঙ্গে কেউ আসেনি বাড়ীতে? হ্যাঁ এসেছিল তার কথাতো কিছু বললেনা। কি জানতে চাও তার কথা। সে কে? কেন এসেছিল? কিছু বলে গেছে কি না তোমাদের এই সব। বাবা বললেন মাষ্টারমশাইয়ের আত্মীয়া। সেখানে এসেছিল, ওরা নিয়ে এসেছিল আমাদের বাড়ীতে। এসব কথা তোমাকে বলার কি আছে?
