এরপর সজলবাবুদের মেয়ে দেখার পালা সাঙ্গ হল। ওদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। সজলবাবুর তরফে প্রতীমবাবু বললেন, একদিন আসুন আপনারা আমার ওখানে। ওর মা বাবা নেই। বলতে গেলে আমিই ওর অভিভাবক। প্রমথবাবু বললেন, আমি যখন মেয়ের বাবা, তখন যেখানে যেতে বলবেন সেখানে আমাকে যেতেই হবে। আমার কোন অমত নেই। আর যেহেতু ওর বাবা মা নেই, তখন তো পাকা কথা আমরা এখনি বলে নিতে পারি। প্রতীমবাবু বললেন, তা হয় না প্রমথ বাবু। আমার ওখানে যেতে আপত্তি থাকলে ওর ওখানেই যাবেন। বিয়ে বলে কথা, একবারতো দেখা দরকার, ও কি চাকরী করে, কোথায় থাকে? আপনার মেয়ের যোগ্য সমাদর সে করতে পারবে কি না। অবশেষে ঠিক হয় আগামী রবিবার ওখানে যাওয়া হবে। প্রমথবাবু বল্লেন, তুমি কিন্তু আমাদের সঙ্গে যাবে প্রান্তিক।
কিন্তু যাওয়া আর হল না। কারণ অশ্রুকণা বেঁকে বসেছে, তার এক কথা সে এখন বিয়ে করবে না। তাকে অনেক বোঝানো হয়েছে, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত থেকে তাকে নড়ানো গেল না। স্নেহময়ী দেবী একদিন আমাকে ডেকে পাঠিয়ে তাকে বোঝতে বলেন। আমি বললাম মাসিমা, আপনারা যেখানে বুঝিয়েছেন সেখানে আমি আর নতুন কথা তাকে কি বলব। তবুও তিনি বল্লেন যে, তোমার উপর তার আস্থা আছে, তুমি একটু বোঝাও না। আমি তাকে বললাম, সজলবাবুতো অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, কেন তুমি অমত করছ কশা। তুমি আমাকে কণা নামে ডাকবে না, আমার সারা শরীর জ্বালা করে। জ্বালা করলেও আমার কিছু করার নেই। কারণ আমি অন্য নামে তোমায় ডাকতে পারবো না। কেন পারবে না। আমার নামতো কণা নয় অশ্রুকণা। জানি। তবে প্রত্যেকের কাছে এক একটা নাম এমন হয়ে যায় যে, তার অন্যথা করার কোন উপায় নেই। তুমি আমাকে কণা বলে ডাক কেন? ঐ নামে তুমি আমায় ডাকতে বলেছিলে। তারতো মৃত্যু হয়ে গেছে। গেছে বুঝি। জানিনা তো! তাহলে?
আমি বললাম দেখ কণা আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসিনি। তবে কেন এসেছো? সেতো তুমি জান কেন এসেছি? কেন এমন ছেলেমানুষি করছ কণা। আমি ছেলেমানুষি করছি না ছেলেমানুষি করছ তোমরা? কি অধিকার আছে আমার জীবন নিয়ে তোমাদের ছিনিমিনি খেলার? আমি তো বলেছি, আমি এখন বিয়ে করতে পারব না। কিন্তু কেন পারবেনা তার কারণ বলনি। দেখ কণা সব বাবা মায়ের স্বপ্ন থাকে। তাদের সেই স্বপ্নকে এই ভাবে ভেঙে দেওয়ার কোন অধিকার তোমার নেই। সজলবাবুকে যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে সে কথাতো বলতে পারো। দেখ প্রান্তিক বেশী জ্ঞান দিওনা। বাবা মায়ের স্বপ্ন থাকে আর আমার কোন স্বপ্ন থাকতে পারে না? ওরা হয়তো বোঝে না কিন্তু তুমিও কি বোঝ না? যদি না বোঝ আমার কাছ থেকে চলে যাও, আর কোনদিন এসো না। নিজেকে এত শ্ৰেষ্ট ভাব কেন তুমি? কিসের অহংকার তোমার?
আমি অবাক হয়ে বললাম, সত্যি কণা আমি তোমাদের বুঝি না। আর যখন চাওনা তখন কথা দিচ্ছি আমি আর কোন দিন আসবনা তোমার কাছে। নিজের জীবন নিয়ে নিজের মত করেই স্বপ্ন দেখ। আমি আর কিছুটি বলতে আসবো না। হ্যাঁ তাই দেখবো। এসোনা আর কোনদিন। তুমিতো একটা দুর্বল মানুষ। তোমার কথা শুনতে হবে এমন দিব্যিতো আমি দিইনি।
জানিনা অশ্রুকণার কি হয়েছে, সে কেন এমন করে কথা বলছে কিছুই জানিনা। শুধু মনে হচ্ছে বিচিত্র এই নারী হৃদয়। কেন যে এত মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলাম। স্নেহময়ী দেবীকে বললাম, না মাসিমা, আমি ওকে রাজী করাতে পারলাম না। মিথ্যেই আমার উপর আপনাদের বিশ্বাস স্থাপন। প্রমথবাবু বললেন, বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা বাবা। কিন্তু এখন কি করি বলত। ও যদি স্পষ্ট করে বলতে কেন সে বিয়ে করবেনা তা হলে এই অপমানের মধ্যে পড়তে হতো না। এখন আমি যে কি করি। আর ওদেরই বা কি বলব। বললাম আমাকে যদি কিছু করতে হয় নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। ওদের তো একটা সংবাদ দিতে হয়। কি ভাবে যে দেবো তাইতো ভাবছি। বললাম, চিন্তা করবেন না। সংবাদ দেওয়ার দায়িত্বটা না হয় আমার পরে ছেড়ে দিন। তাই দিলাম, যা ভালো হয় তুমি করো। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না।
নির্দিষ্ট দিনের ২ দিন আগে প্রতীমবাবুর অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। উনি বললেন প্রান্তিক ২ দিন আগে যে হ্যাঁ আসতে হল। কি ব্যাপার? তোমার গবেষণার জন্য আবার কিছু জানতে চাও নাকি? না। তবে? আমি বললাম, একদিন আপনি আপনার জীবনের অনেক কথা বলেছিলেন আজ ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে সেই জীবনের স্বপ্নগুলোকে, আবার কি ফিরে পেতে ইচ্ছে করে না? হঠাৎ থমকে গিয়ে তাকালেন আমার দিকে তারপর বললেন করলেই কি আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন গুলোকে ফিরে পাওয়া যায়? জানিনা যায় কি না। তবে চেষ্টা করতে আপত্তি কোথায়? তুমি কি বলতে চাইছে। না কিছু বলছিনা। গবেষণা করতে গিয়ে মনে হল জীবনে এত যার সাকসেস তিনি কেন তার একান্ত জীবনে এত ব্যর্থ। উনি হাসি মুখে বললেন, হয়তো ব্যর্থ বলেই কর্মজীবনে তা সার্থক হয়ে উঠেছে। আমি বললাম তাহলে কি বলতে চান যা হারিয়ে গেছে তা যদি ফিরে পান, তাহলে কর্ম জীবনের এই যে শিখর চুড়ায় আরোহণ তা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে সে জন্যই অতীতকে আর ফিরে পেতে চান না? তাকিয়ে দেখি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন উনি।
আমার কথা শোনার পরে খুবই চিন্তিত মনে হল প্রতীমবাবুকে। ধীর, শান্ত ভাবে বললেন, হয়তো তোমার কথা ঠিক অথবা ঠিক নয়। আসলে ঐ ভাবে কিছু ভাবিনি প্রান্তিক আর তাছাড়া আমার কথা তোমাকে বোঝাতে পারব না। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জানতে চাইলাম অবসর সময়ে পরিচিতদের বাড়ীতে বেড়াতে যান না? কেন বলত। না এমনি জিজ্ঞাসা করছি? হ্যাঁ তা যাব না কেন তবে আসুন না একদিন আমাদের বাড়ীতে। এই অফিসের চৌহদ্দিতে আপনাকে তো ঠিক মত পাওয়া যায় না। উনি বললেন ঠিক আছে যাব একদিন। সত্যি? কেন? তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? না না বিশ্বাস হবে না কেন। তাহলে কবে যাবেন বলুন। তুমিই বল কবে যাব। আচ্ছা আগামী রবিবার। আগামী রবিবার? কিন্তু ওদিনতো তোমাদের আসার কথা। আমার যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এই ভাবে বললাম দেখুন তো নিজের গবেষণা নিয়ে এত ব্যস্ত যে আসল কথাটাই ভুলে গেছি। উনি বললেন কি কথা? ওই দিন আমদের আসা হচ্ছে না। উনি অবাক হয়ে বললেন কেন? আমি ধীরে ধীরে বললাম, দেখুন, অনেক সময় মনে হয় এটা না হওয়ার কোন কারণ নেই। আপনার জীবন নিয়েই ধরুন না, আপনি কি ভেবেছিলেন এমন একটা ঘটনা ঘটে যেতে পারে? কিন্তু ঘটনাকে তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রেও তেমনি কিছু ধরুণ না, যার উপর আপনার আমার কারো হাত নেই। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, বুঝলাম। ঠিক আছে তাই হবে। আমি বললাম, তা হলে ঐ কথাই রইল। আগামী রবিবার আপনি আসছেন আমাদের বাসায়। তোমাদের ওখানে আর কে কে আছেন? আমি আমার পিসি এবং তার মেয়ে সেলিনা। সেলিনা? হ্যাঁ সেলিনা, কিন্তু অবাক হচ্ছেন যে। না অবাক নয়। এবার নিয়ে পর পর দুবার এই নামের একটি মেয়ে ক্লাব বক্সিংএ প্রথম হয়েছে না? হ্যাঁ, সেলিনা রহমান। আমার পিসি নীলাঞ্জনার মেয়ে। কি যেন ভাবলেন প্রতীমবাবু, তারপর বললেন, সেলিনা রহমান অথচ তোমার পিসি নীলাঞ্জনার মেয়ে ঠিক বুঝতে পারছি না। এখানে বসেই সব যদি বুঝবেন তা হলে ওখানে গিয়ে কি বুঝবেন। হেসে ফেললেন প্রতীমবাবু। বললেন, তোমার এই কথার পিঠে কথা আমাকে ভীষণ অবাক করে দেয়। ঠিক আছে আমি যাব। সে দিন কি আর কেউ আসবেন? না এমনি কাউকে তো বলিনি, তবে হঠাৎ করে যদি কেউ এসে পড়েন আলাদা কথা। তা হলে উঠি। উঠবে? কেন কিছু বলবেন? না বলব না। তবে তোমাকে না জানিয়ে আমি লাঞ্চের অর্ডার দিয়েছি। বললাম খুব ভাল করেছেন। সত্যি খুব খিদে পেয়েছে।
