প্রথমে কিছু বাধা এলেও সেলিনা চলে এসেছে নীলাঞ্জনা পিসির কাছে। নীলাঞ্জনা পিসিরও দীর্ঘ দিনের শুন্য মাতৃত্ব যেন, কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেলিনার জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন, আগের মত সে আমাকে আর ঠাট্টা করে না। রেহানার কথা আজকাল বেশী ওঠে না। ধীরে ধীরে রেহানা যেন কেবল আমার হয়ে গেছে। আমার একার। না নীলাঞ্জনা পিসি না মিনতি সেন, কারও মুখ দিয়েই ঐ হতভাগ্য মেয়ের নামটা যেন আর উচ্চারিত হয় না। জানিনা কেন?
দিন যায়, মাস যায়, বছর গড়িয়ে আসে নতুন বছর। আজ রেহানার জন্মদিন। সেই কবে গোপনে রেহানার একটা ছবি তুলেছিলাম। কেউ জানেনা। আজ তাকেই ড় করে বাঁধিয়ে নিয়ে এসে টাঙিয়ে দিলাম, আমার পড়ার ঘরের দেওয়ালে। ধুপ কাঠি জ্বেলে, ফুলদানিতে ফুল সাজিয়ে রাখলাম রেহানার ছবির নীচে।
মনটা ভারাক্রান্ত। কি দ্রুত গতিতে ভুলে যাই আমরা অতীতকে। নীলাঞ্জনা বা মিনতি সেন হয়তো তার জন্মদিন নাও জানতে পারেন। কিন্তু সেলিনাতো জানে। কই সকাল থেকে একবারও তো তার মুখ দিয়ে রেহানার জন্মদিনের কথা, বা রেহানার কথা কিছুই উচ্চারিত হলো না। আমার ঘরে পারত পক্ষেও সেলিনা আসে না আজকাল। নীলাঞ্জনা পিসি। একান্ত প্রয়োজন না হলে এ ঘরে তারও পদার্পণ ঘটেনা।
মনে মনে ভাবি এ একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। রেহানাকে আরো বেশী করে ভাববার অরকাশ পেয়েছি। তবু আমি তো মানুষ। সেলিনা এবং নীলাঞ্জনার এই ভাবে আমাকে এড়িয়ে চলাকে কেমন যেন উপেক্ষা বলেই মনে হয়। নীলাঞ্জনার মাতৃত্বের অভাব যেমন মিটেছে তেমনি সেলিনারও মিটেছে নতুন করে মা কে খুঁজে পাওয়া। আমার আর দরকারটা কোথায়?
হঠাৎ দরজায় খটখট শব্দে তাকিয়ে দেখি ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকছে সেলিনা। সকালে স্নান করেছে। পরেছে একটা আনকোরা নতুন শাড়ি। বেনীতে জড়িয়েছে যুঁই ফুলের মালা। হাতে মিষ্টির থালা। আমি অবাক হয়ে বলি, কি ব্যাপার? এত সকালে সেজে গুঁজে কোথায় চললে? আমার কোন কথায় আজকাল আর রাগেনা সেলিনা। হঠাৎ ওর চোখটা আটকে যায় দেওয়ালে। এনলার্জ করা রেহানার ছবি। তার মানে তার জন্মদিনটা পর্যন্ত ভোলেনি প্রান্তিক ভাই। বলল, আপনাকে ওর জন্মদিনে একটা প্রণাম করতে এসেছিলাম। ভেবেছিলম অবাক করে দেব। কিন্তু আপনি নিজেই যে আমাকে অবাক করে দিয়েছেন। বললাম, আজকাল কোন ব্যাপারে কি আর অবাক হও সেলিনা? না হইনা। কারণ নিজের জীবনের পরিবর্তনগুলো যে মেনে নিয়েছি। তাতে যখন অবাক হইনা, তখন আর অন্য ব্যাপারে অবাক হওয়ার সময় কোথায়? যাক নিজেকে সঠিক ভাবে বুঝতে পেরেছে বলে খুব ভাল লাগছে সেলিনা। সেলিনা বলল, আমারও ভাল লাগছে আপনাকে দেখে। তারপর নিজের থালা থেকে একটি মিষ্টি তুলে দিয়ে বলল, ভাববেন না, আমি এনেছি। পিসি, সকালে বাজার থেকে মিষ্টি, এই মালা এসব এনে বললেন, আজ তো রেহানার জন্মদিন তাইনা? যাতে একবার প্রান্তিকের ঘরে। দেখ ও কি করছে? আমি অবাক হয়ে বললাম, পিসি বলেছে আজ রেহানার জন্মদিন? সত্যি ভীষণ ভীষণ অবাক হচ্ছি আমি। সেলিনা বলল, সব ব্যপারে অবাক হতে নেই প্রান্তিক ভাই। তারপর হঠাৎ একটা প্রণাম করে বলল, কেন প্রণাম করলাম জানতে চেয়ে ঠাট্টা করবেন না।
তারপর একটু থেমে আবারও বলল, পিসি বলছিলেন বহুদিন আপনি গ্রামের বাড়ীতে যান না। আমাকে বলেছেন আপনার যদি অসুবিধা না থাকে, তাহলে আগামী শনিবার পিসি যেতে চান। বললাম, বেশতো চল। আমারও মনটা চাইছে। বহুদিন যাই না। একবার পরিচিত সকলের সঙ্গে দেখা হলে ভালই লাগবে।
শুনে মিনতি সেন বললেন, আমিও ঘুরে আসি তোমাদের সাথে কি বল প্রান্তিক? তুমি যাবে? কি যে আনন্দ হচ্ছে তা বোঝাবার নয়। বললাম, শনিবার ৪টেয় ট্রেন শিয়ালদা স্টেশন থেকে। নীলাঞ্জনা পিসিকে মিনতি সেনের কথা বলতে, তারও খুব আনন্দ হয়। বললেন সত্যি যাবেন উনি? তাইতো বললেন।
আমরা যখন গ্রামের বাড়ীতে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হতে অল্প বাকি। প্রথমেই পড়ে নীলাঞ্জনা পিসিদের বাড়ী। ওখানে থেকে আমাদের বাড়ী বেশী দূরে নয়, তবু যেতে সঙ্কোচ হতে থাকে, পিসি কিছু ভাবেন কি না। নীলাঞ্জনা বললেন, তুমি মিস সেনকে নিয়ে আগে বাড়ীর সকলের সাথে দেখা করে এস, আমি পরে সেলিনাকে নিয়ে আসছি। আমি বললাম আজ যদি যান, তা হলে তো এক সঙ্গে যাওয়া যেতে পারে। উনি মৃদু হেসে বললেন, বেশতো তোমার যখন তাইই ইচ্ছে তাহলে চল আজই যাওয়া যাক। অবশেষে আমরা সকলে এক সঙ্গে এলাম আমাদের বাড়ীতে।
শুধু বাড়ীটা নয়, গোটা গ্রামটা যেন উৎসবের সাজে সেজে উঠেছে। উপলক্ষ আমার ভাল রেজাল্ট। কয়েকদিন হৈ হৈ করে কেটে গেল। ফিরে আসার আগে হেডমাষ্টার মশাইকে প্রণাম করতে গেলাম। তিনি আশীর্বাদ করে বললেন, তোমাকে কয়েকটা কথা বলব প্রান্তিক? নিশ্চয়ই বলবেন। বলুন কি বলবেন? উনি ধীরে ধীরে বললেন, আমি জানিনা তোমাকে বলা ঠিক হবে কি না, তবু বলছি! কেন স্যার এ কথা কেন বলছেন আমাকে বলা ঠিক হবে কিনা। আমাকে কি আপনি সন্দেহ করছেন? কারণ আছে বাবা। থাক তা হলে মাষ্টারমশাই। কি দরকার অস্বস্তি বাড়িয়ে? হেড মাষ্টারমশায় বললেন, হয়তো কথার খেলাপ হয়ে যাবে, তবু তোমাকে বলা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি। আমি উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছি উনি কী বলেন তা শোনার জন্য। উনি বললেন কিন্তু একটা কথা দিতে হবে প্রান্তিক আমি না বলা পর্যন্ত আমার একথা তুমি কাউকে বলবেনা। আমি বললাম তাই হবে মাষ্টার মশাই। কিন্তু অবাক হলাম ভীষণ, কী এমন গোপন কথা বলতে চান তিনি আমাকে।
