ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকালেন আফরোজ বেগম। আফরোজের ছোট বোন রসিদা বললেন, আপা কিছু বলবি? বলে ওর মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন। আফরোজ বেগম অস্পষ্ট হলেও শোনা যায় এমন ভাবে বললেন। সেলিনা ওকি এসেছে? সেলিনা তার মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, কার কথা বলছ মা। বিড় বিড় করে বললেন, তার মানে আসেনি। পারল না আমাকে ক্ষমা করতে। সেলিনা আবারও বলল, কার কথা বলছ মা। আফরোজ বেগম ওর কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললেন, আরো একবার যা সেলিনা, যেখান থেকে পারিস ওকে ধরে নিয়ে আয়। ওর সঙ্গে দেখা না করে যে আমি কোন শান্তি পাচ্ছি না। সেলিনা বলল, প্রান্তিক ভাই আপনি আসুন না। আফরোজ বেগমের যে পাশে সেলিনা আছে, আমি তার অন্য পাশে বসে, আফরোজ বেগমের মুখের কাছে মুখ এনে বললাম, আপনি আমায় ডেকেছিলেন মাসিমা? যেন দূর থেকে ভেসে আসছে কণ্ঠস্বর–বললেন কে? আমি প্রান্তিক? ও তুমি এসেছো? হা এসেছি মাসিমা। জানতাম তুমি আসবে। তারপর বললেন, তুমিতো আমার মতন ছোট নও ছেলে, তুমি অনেক বড়। আমি বাধা দিয়ে বললাম, ওসব কথা থাক মাসিমা। ডাক্তার মুস্তাফি এসেছিলেন, তিনি বলেছেন এমন কিছু নয়। ওর নার্সিং হোমে কয়েকদিন থাকলেই সুস্থ হয়ে যাবেন। ম্লান হাসলেন আফরোজ বেগম। বড় করুশ সে হাসি। বললেন তোমাদের সঙ্গে আরো কয়েকটি দিন কাটিয়ে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। কিন্তু রোজ কেয়ামতে আমার জন্য যে জায়গা নিদিষ্ট হয়ে গেছে বাপ। তাই স্বার্থপরের মতে তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। সেলিনার চোখে জল ভরে উঠল। তবু চুপ করে রইল। আমার একটা হাত তার শীর্ণ হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, আমার পাপের কোন ক্ষমা নেই ছেলে। রোজ কেয়ামতে আমার কি বিচার হবে তাও জানিনা, কিন্তু বাবা আমাকে যে একটা কথা দিতে হবে? বলুন। উনি শীর্ণ হাতে সেলিনার একটা হাত তুলে নিয়ে আমার হাতের পরে রেখে বললেন, আমি যখন থাকবনা, একে তুমি দেখবে কথা দাও। সেলিনা চিৎকার করে উঠল মা। আমি বললাম মাসিমা। উনি স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, ভয় নেই বাবা। যে পাপ করেছি তারই শেষ নেই, তাইতো আবার নতুন পাপে তোমাকে জড়াতে চাইনা। তোমার জীবনে রেহানার যে জায়গা, ওকে আমি সেই জায়গায় তোমাকে গ্রহণ করতে বলিনি বাবা। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল তা হলে? যতদিন না ও নিজের পথ খুঁজে পায় ততদিন তুমি ওকে দেখ। এই আমার শেষ অনুরোধ। আমি বললাম ওর মা আছেন, তিনি ওকে বুকে তুলে নেবেন। আপনি চিন্তা করবেন না। তারপর বললাম আপনি এত ভেঙে পড়ছেন কেন? আপনাকে তো বাঁচতে হবে। জলও যেন শুকিয়ে গেছে আফরোজ বেগমের চোখ থেকে। বললেন, জানি তোমার পিসি ওকে মেয়ের মতন ভালবাসেন। আমি বললাম মেয়ের মতন নয় মেয়ে হিসেবেই ভালবাসেন। কথা জড়িয়ে আসতে লাগল, আফরোজ বেগম বহুকষ্টে তবু বললেন, তাই যেন হয়। তবু আমি তোমার হাতেই দিয়ে যাচ্ছি ওকে। তুমি শুধু কথা দাও ওকে তুমি দেখবে? কথা দিলাম। উঃ খোদা রহমানে রহিম, আমি নিশ্চিন্ত। আর কোন পিছুটান রইলনা। এবার হে খোদাতাল্লা, কখন আসবে তোমার ডাক। আমি যে তারই প্রতীক্ষায় আছি। চোখ বন্ধ করলেন আফরোজ বেগম। রসিদা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, আপা, আমরা কি তোমার কেউ নই? সেলিনা তাকে তুলে দিয়ে বলে খালা, চুপ করো। সেলিনাকে বুকের পবে টেনে নিয়ে বললেন আমাদের উপর তোমার এতটুকু বিশ্বাস নেই? কেন বিশ্বাস থাকবেনা খালা আমিতো তোমাদেরই মেয়ে। আফরোজ বেগম আর চোখ মেলে তাকাননি। ভোর রাতের দিকে তিনি আরেকবার চোখ মেললেন, দেখলেন, আমি সেলিনা আর ডাক্তার সরকার ছাড়া আর কেউ নেই। রশিদা বেগম, ঘন্টা খানেক আগে ঘুমাতে গেছেন। আফরোজ বেগম যেন স্বাভাবিক। ডাক্তার। সরকারকে বললেন, ডাক্তার ভাই। বলুন দিদি আমাদের সমাজকে তো জানেন, কষ্ট করে একটা কাগজ কলম নিয়ে আসবেন? সেলিনা কাগজ আর কলম নিয়ে এলে আফরোজ বেগম বললেন, আমি বলছি আপনি লিখে নিন। বলুন। আমার অবর্তমানে সেলিনা আর জীবনের অন্য কোন পথ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত ওকে আমি প্রান্তিকের কাছে রেখে গেলাম। ওর পিসি নীলাঞ্জনা, ওর মায়ের মত। সেলিনা যদি স্বেচ্ছায় ওদের অবাধ্য না হয় তাহলে ওর জীবন সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নীলাঞ্জনা দেবী ও প্রান্তিকের। লেখা হলে আফরোজ বেগম বললেন। দিন আমি সই করে দিচ্ছি। আপনি সাক্ষী থাকুন। ডাক্তার সরকার বললেন, আমি অরাজী নই কিন্তু আপনার কোন আত্মীয় স্বজন সাক্ষী থাকলে ভাল হয় ভাবী। আফরোজ বেগম সেলিনাকে বললেন, একবার খালাকে ডাকতো মা। রশিদা এলে, তাকে পড়ে শোনান হয়। প্রথমে গররাজি হলেও পরে উনি সই করে দেন। তারপর আফরোজ বেগম বল্লেন এটা আপনাকেই দিয়ে যাচ্ছি ডাক্তার ভাই, দেখবেন মেয়েটা যেন ভেসে না যায়।
যে স্বাভাবিকতায় তিনি কথা বলছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল হয়তো আবার সুস্থ জীবনে ফিরে আসবেন উনি। কিন্তু একি হলো সমস্ত কাজ শেষ হয়ে গেলে থর থর করে কাঁপতে থাকেন আফরোজ বেগম। এমন করে কাঁপছেন কেন উনি। ডাক্তার সরকার ত্বরিত পরীক্ষা করলেন। কয়েকটা হিক্কা উঠলো। শুধু শোনা গেল হায় আল্লাহ। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেল শরীরটা। ডাক্তার সরকার আবার পরীক্ষা করতেই সব শেষ। সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হল আফরোজ বেগমের দেহ। কায়ায় আছড়ে পড়ল সেলিনা আফরোজ বেগমের বুকের উপরে। আমি ওকে কিছু বলতে গেলে ডাঃ সরকার ইঙ্গিতে না করলেন।
