অশ্রুকণার বাড়ীতে গিয়ে সংবাদটা দিলাম আর ওকে বললাম, তুমি সেলিনাকে সংবাদটা দিতে পারবে তো? কেন, তুমি পারবে না? তারপর নিজেই বলল, আমার যেতে কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু প্রান্তিক, ওর মা যাইই করুক, ও বড় আঘাত পাবে। যত অসুবিধাই হোক তোমার যাওয়া উচিৎ। আমি বললাম। ঠিক আছে তাই হবে।
অশ্রুকণা ও সেলিনা এসেছে একটু আগে। মিনতি সেন এলেন গাড়ী করে এক হাড়ি মিষ্টি আর দুই সেট ফুলের ডালা নিয়ে। এই দ্বিতীয় বার এলেন মিনতি সেন এ বাড়ীতে। ফুলের ডালা আমার আর অশ্ৰকশার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আমার আশীর্বাদ তোমাদের কৃতকার্যতায়। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। উনি শুধু হাসছেন, কিছুই বলছেন না। আমরাও বুঝতে পারছি না। ফুলের ডালা ধরে দাঁড়িয়েই আছি। কি করব বুঝতে পারছি না। নীলাঞ্জনা পিসি ফুলের ডালা দুটো আমাদের হাত থেকে তুলে নিয়ে বললেন, উনি ফোনে জানিয়েছিলেন যে, উনি আসা পর্যন্ত যেন সংবাদটা তোমাদের না দেওয়া হয়। আমবা আরো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি পিসির দিকে। পিসি বললেন অশ্রু, তুমি স্নাতকে প্রথম শ্রেণী পেয়েছে। আর প্রান্তিক তুমি শুধু প্রথম শ্রেণী পাওনি, তোমার উপরে মাত্র ১ মার্ক বেশী পেয়ে একজন প্রথম হয়েছেন, তুমি হয়েছে দ্বিতীয়। আনন্দ না বেদনা জানিনা, কান্না এসে গেল চোখে। মাথা নীচু করে প্রণাম করলাম মিনতি সেন ও পিসিকে। অশ্রুকণাও তাই করল। আমাদের দুজনকেই তার বুকের মধ্যে টেনে নিলেন মিনতি সেন। একটা ঘরে কেটে গেল সারাটা বিকেল। শুধু বুকের মাঝখানটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল রেহানার জন্য। জানিনা কোথায় আছে ও। বেঁচে আছে কি না তাও জানিনা। শুধু মনে মনে বললাম, তুমি যেখানেই থাক রেহানা, আমার এ কৃতিত্ব তোমাকেই দিলাম।
জীবনে কোন পরীক্ষায় ব্যর্থ হইনি, কিন্তু এমন সাকসেস। মাত্র ১ মার্কের জন্য প্রথম হতে পারা, এ যে অকল্পনীয়। মিনতি সেন বললেন, ভবিষ্যতে কি করবে তোমরা ঠিক করেছ। অশ্রুকণা প্রথম শ্রেণী পেয়েছে এ যেন সে ভাবতেও পারছেনা। কিন্তু আমার জন্য ওর যে কি আনন্দ হচ্ছে, সে, ওর চোখের ভাষা দেখে বুঝতে পারছি। আর সেলিনা। আমি জানি, আমার এই সাকসেসের সর্বশ্রেষ্ঠ দাবীদারতো ও। তবু কোন কথা সে বলছে না কেন? তবে কি একেবারে প্রথম না হওয়ার জন্য একটু খানি দুঃখ রয়ে গেছে তার। ওকি চেয়েছিল আমাকে প্রথম হতে হবে? যদি সে তাইই চেয়ে থাকে, তাহলে বলবো এটা তার একটু বেশীই চাওয়া।
মিনতি সেন বললেন, এবার উঠতে হবে। চল তোমাদের যার যার বাড়ীতে নামিয়ে দিয়ে যাব। সেলিনা বলল, তুমি যাও পিসি, এটুকু পথ আমি হেঁটেই চলে যাবো। নীলাঞ্জনা বলল, ও থাকুক মিস সেন, আপনি বরং অশ্রুকে নামিয়ে দিয়ে আসুন, পরে না হয় প্রান্তিক এটুকু পথ ওকে হেঁটেই এগিয়ে দিয়ে আসবে। মিনতি সেন বললেন, তাই তোক। এরপর মিনতি সেন যখন বেরিয়ে যাবেন, সেলিনা বলল, একটু দাঁড়াও পিসি। কেন রে? বলে দাঁড়ালেন। সেলিনা ওকে প্রনাম করতে মিনতি সেন বললেন হঠাৎ প্রণাম করলি যে মেয়ে। ইচ্ছে হল তাই, বলেই পালিয়ে গেল।
আফরোজ বেগমের অবস্থা ধীরে ধীরে আরো খারাপের দিকে এগিয়ে চলেছে। মিনতি সেন বললেন, ওর তো চিকিৎসার দরকার, তুমি ওকে সব থেকে বড় ডাক্তার দেখাও। বললাম তা সম্ভব নয়। কেন? উনি একদম আমাকেই শুধু নয় আমার সম্পর্কিত কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। অবাক মিনতি সেন প্রশ্ন করে জানতে চান কেন? তুমি কি কিছুই জানো? জানলে তোর কাছে জানতে চাইব কেন? আমি বললাম, রেহানার হারিয়ে যাওয়া সহ ওদের পরিবারের যাবতীয় দুর্যোগের জন্য উনি আমাকে দায়ী করেন। বেচারা। তারপর মিনতি সেন বল্লেন, হতেই পারে, মায়ের মতো। তাই বলে তুই এড়িয়ে গেলে রেহানা তোকে ক্ষমা করবে কেন? আমি অআিনী কঠে বললাম, আর রেহানা। সেতো এমনিতেই আমায় ক্ষমা করেনি, আর নতুন করে কি ক্ষমা করবে। মিনতি সেন বললেন, পাগলামি করিসনে প্রান্তিক। মনে বিশ্বাস রাখ একদিন ওকে ফিরে আসতেই হবে। আসবে। সেদিন যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তোর কাছে কৈফিয়ৎ চাইবে, কি উত্তর দিবি? আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে বললাম, কি করব তা হলে। আমি কলকাতার মেডিসিনের সব থেকে বড় ডাক্তার ডাঃ মুস্তাফিকে পাঠাচ্ছি। তুই ওকে নিয়ে যা। আর সেলিনাকে বলবি, আমার আদেশ, ডাঃ মুস্তাফি যা বলবেন, তা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়।
যখন মুস্তাফিকে নিয়ে ওদের বাড়ী গেলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাড়ীতে অনেক লোক। একটা জটলার মতন। আমি যেতেই, একটা স্বস্তির ভাব যেন দেখা দিল ওদের মধ্যে। সেলিনা দরজা খুলে দিতেই বললাম, মিনতি সেন পাঠিয়েছেন, ডাঃ মুস্তাফিকে। ওকে নিয়ে যাও মায়ের কাছে। সেলিনা ওকে পথ দেখিয়ে আফরোজ বেগমের কাছে পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরে এল। তুমি ফিরে এলে যে, ডাক্তার বাবু যদি কিছু জানতে চান। অসুবিধা হবে না। কিন্তু আপনি কোথায় গিয়েছিলেন। সারাদিন আপনাকে খুঁজছি। কেন? জানিনা, মা দুপুর থেকে শুধু আপনাকেই খুঁজছেন। আমাকে? হঠাৎ? তাতো জানিনা প্রান্তিক ভাই। ওখানে আমার যারা রক্তের সম্পর্কিত আপন তার সবাই আছেন, যান না একবার প্রান্তিক ভাই। যাব? যদি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। হোলেনই বা, কিন্তু যখন খুঁজেছেন তখন একবার যান না। আমি বললাম, বেশ চল। ডাঃ মুস্তাফির তখন রোগী দেখা শেষ। গম্ভীর মুখে উঠে পড়লেন। তারপর আমাকে সামনে পেয়ে বললেন। আপনি আসুন আমার সঙ্গে। আমি ওনার সঙ্গে বাইরে এলাম। অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবু কালকের মধ্যে যদি আমার নার্সিং হোমে নিয়ে আসেন, আমি শেষ চেষ্টা করতে পারি।
