নীলাঞ্জনা পিসি, কাল বলেছেন, তোমাকে এত দুর্বল কোনদিন ভাবিনি প্রান্তিক। কলেজেতো যাওয়া ছেড়েই দিয়েছে। অবশ্য এখন ক্লাশ নেই, কিন্তু বইয়ের সঙ্গেও তো সম্পর্ক নেই তোমার দীর্ঘদিন। এসব ভালো নয় প্রান্তিক। মনে হচ্ছে তোমার ভালবাসার একনিষ্ঠতায় কোথায় যেন ছিদ্র আছে, তা না হলে, এ ভাবে নিজেকে তুমি নিঃশেষে শেষ করে দিতে চাইছো কেন? আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, কি করব পিসি? কি করবে, সে কথা তোমাকে বলে দিতে হবে? তোমার মনের সেই জোর কোথায় গেল? যে জোরের মধ্যে দিয়ে একদিন দুর্বলকে দেখিয়েছো বাঁচার স্বপ্ন। অতীতের ব্যর্থ স্মৃতিকে ভুলে গিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখাতে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই জোরটাকি তোমার মরে গেছে প্রান্তিক? আরো বললেন তোমার সেই মনের জোরটাইতো একদিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তোমার সেই উদ্যম সেই প্রাণবন্ত জীবন কোথায় আজ? অবশেষে বললেন, জীবনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কবো। তুমি কৃতি পুরুষ। দুর্বল নারী নও। ভালবাসা থাকুক তোমার অন্তরের সম্পদ হয়ে। আর পৌরুষকার হোক তোমার বিশ্বের দ্বার। কার অপেক্ষায় বসে আছো ঘরের মধ্যে? এখানেতো কেউ নেই অপেক্ষা করে যে তোমাকে অনুপ্রাণিত করবে। বেরিয়ে এস প্রান্তিক ঘরের দমবন্ধ করা আবহাওয়া থেকে। দাঁড়াও এসেরাজ পথে। খোলা আকাশের নীচ দিয়ে চলে গেছে যে রাজপথ সেটাই কিন্তু এক মাত্র পথ নয়। আরো হাজারো পথ তোমায় বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায়। হয়তো সে সব পথের কোন একটাতেই পেয়ে যাবে তোমার স্বপ্নের বাস্তবতা। তাই আলসেমি নয় প্রান্তিক। নিজেকে প্রস্তুত করো ভবিষ্যতকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।
না, এভাবে নীলাঞ্জনা পিসি আমায় কোন দিন উদ্বোধিত করেনি। আর তার সেই উন্মাদনার রশ্মিচ্ছটা বুঝি আজ ছড়িয়ে দিতে চাইলাম সেলিনার অবসন্নতায়। চুপ করে রইল ও, বলল, চেষ্টা করব প্রান্তিক ভাই। কিন্তু আপনাকেও একটা কথা দিতে হবে। কি? বলুন দেবেন? না শুনে বলি কি করে? ও অভিমানে বলল, রেহানাকেও কি এই একই উত্তর দিতেন? আবার সেই রেহানা। বললাম, দেব। ও চুপ করে রইল। আমি বললাম, কই বল। ও বলল, আপনাকেও নতুন করে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে প্রান্তিক ভাই। আপনাকে সার্থক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে আগামী পরীক্ষার জন্য। রেহানার স্বপ্নকে সঠিক ভাবে পূর্ণ করতে হবে আপনাকেই। পারবেন না? আমি আবারও ওর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, পিরবো সেলিনা, আমাকে পারতেই হবে। আনন্দে চিকচিক করে ওঠেওর দুটি চোখ। তারপর বলল, আপনার নির্দেশিত পথে চলতে আমিও পারবো প্রান্তিক ভাই। প্রমিজ করছি, নিজে যেমন হারব না, আপনাকেও হারতে দেব না।
সেলিনা এবারেও বক্সিংএ ক্লাব প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি অক্ষুণ্ণ রেখেছে। একাডেমিক পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছে। আর তারই জন্য শ্রদ্ধা জানাতে আফরোজ বেগমের সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে অস্বীকার করে ও এসেছে অনেক দিন পরে নীলাঞ্জনা পিসির বাড়ীতে। পিসি ওকে দুহাতে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে চুমুতে চুমুতে ভরে দিলেন তার কপাল। তারপর বললেন বোস মেয়ে আমি আসছি। তুমি কোথায় যাবে? বোসনা। নীলাঞ্জনা পিসি ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন। আমি আর সেলিনা একাকী। হাসতে হাসতে বললাম বহুদিন পরে মা মেয়েতে দেখা। আমার দিকে তাকাবার সময়ই নেই। তা নাইবা থাকলো, আমি কিন্তু ভীষণ ভীষণ খুশি হয়েছি, আর এই খুশির দিনে তোমাকে কি দিয়ে আমার খুশিকে প্রকাশ করি বলত। আমি যা চাইবো তাই দেবেন? হ্যাঁ তাই দেব, যত কঠিনই হোক তুমি চাইতে পারলে আমি তোমাকে তাই দেব। ও হাসল মৃদু ভাবে তারপর বলল, না প্রান্তিক ভাই, আজ কিছু নিতে আসিনি, এসেছি দিতে। দিতে? হ্যাঁ দিতে বলতে বলতে আস্তে আস্তে ও এগিয়ে আসে আমার কাছে, একেবারে কাছে তারপর মাথা নীচু করে ও আমার পায়ে হাত রেখে বলল, আপনার আর্শীবাদ চাইছি প্রান্তিক ভাই। আমি ওকে দু হাতে তুলে দিতেই দেখি বাইরের দরজায় কখন যেন নীলাঞ্জনা এসে দাঁড়িয়েছেন, তাকে যেন দেখতে পাইনি, এমনি ভাবেই বললাম, পাগলি মেয়ের কাণ্ড দেখ। আরে বোকা মেয়ে আমার আশীবাদে কি কিছু হয়? আশীর্বাদ নিতে হলে মায়ের কাছ থেকেই নিতে হয়। মা! হারে পাগলি মা। হঠাৎ যেন নীলাঞ্জনাকে দেখতে পেলাম, তাই আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠলাম এই দেখ পিসি তোমার পাগলি মেয়ের কাণ্ড ও চাইছে আমার কাছে আশীর্বাদ। মা যেখানে দুহাতে ওকে বুকের মধ্যে তুলে নিয়েছেন, সেখানে আমার আশীর্বাদ তো তুচ্ছ, তাতে কাজের কাজ কিছু হবে কেন? নীলাঞ্জনা মৃদু হেসে বললেন, হবেরে হবে। মাতো ওকে মন প্রাণ দিয়ে আর্শীবাদ করেছেন, তার সঙ্গে তোমারও আশীর্বাদ ওর খুব প্রয়োজন প্রান্তিক। কি জানি কেন আকারণ আমার চোখে জল এসে গেল। বললাম, এই দেখ মা-মেয়ের এক কথা। নিজের অশ্রুকে গোপন করতে বুঝি পালিয়ে গেলাম নিজের ঘরে। কেন যে এমন হয় কিছুতেই বুঝতে পারি না।
মিনতি সেন ফোন করে জানিয়েছেন, তিনি ভিতর থেকে সংবাদ নিয়েছেন, স্নাতক পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় হয়েছি। যিনি প্রথম হয়েছেন, তিনি আমার থেকে মাত্র এক নাম্বার বেশী পেয়েছেন। নীলাঞ্জনা পিসিকে বলেছেন, আমিই আসছি তোমাদের ওখানে। ওকে সংবাদ দিতে হবে না। ওকে বরং বলে দাও, ও যেন অশ্রুকণা ও সেলিনাকে যেভাবে পারে তোমাদের ওখানে আসতে বলে। ফোনটা ছেড়ে দেন মিনতি সেন।
