এ এক নতুন সেলিনা। জীবনের বাঁক গুলো আঘাতে আঘাতে কি ভাবে পরিবর্তন হয়, তাই শুধু ভাবছিলাম। না, নীলাঞ্জনা পিসি, না মিনতি সেন কেউ সেলিনার আবেগকে বাঁধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেননি। মিনতি সেন বুঝি কিছু বলতে চাইছিলেন, নীলাঞ্জনা বললেন, থাক মিস সেন, ভিতরের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দিন ওকে, তাতে ও হাল্কা হবে, ওটা ওর ভীষণ প্রয়োজন।
এক সময় জবার মা এসে বলল, সকাল থেকে তো কিছু খাওয়া হয়নি দিদিমনি, কিছু মুখে দিয়ে নিন, ওদেরও কিছু মুখে দিতে বলুন। তারপর আপন মনে বলল, কেন যে রেহানাদি একাজ করলেন, কে জানে।
নীলাঞ্জনা পিসি বললেন, ঠিকই বলেছেন আপনি, ওদের কিছু মুখে দেওয়া দরকার। চলুন আমি যাচ্ছি রান্না ঘরে, দেখি এদের জন্য কিছু করা যায় কিনা।
সময়ের থেকে বড় ওষুধ আব কিছু নেই। যে ক্ষতকে মনে হয়েছিল, তা কখনো শুকাবেনা, যে আঘাতকে মনে হয়েছিল আব বুঝি ওঠা যাবে না, সময়ের হস্তক্ষেপে, একদিন তা স্বাভাবিক হয়ে এলো। মিনতি সেকে মেনে নিয়েছেন নীলাঞ্জনা পিসিও। অদেখা সম্পর্ক দীর্ঘ মেলামেশায় তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নেয় একদিন। আস্তে আস্তে স্বাভাবিকতা নেমে আসে প্রায় সকলের মধ্যে। ব্যতিক্রম কেবল আফরোজ বেগম। কোন ভাবেই ক্ষমা করতে পারেননি তিনি আমাকে। পরিবারের সমস্ত দুর্যোগের মুলে যে আমি এ বিশ্বাস থেকে তাকে টলানো যায়নি।
একদিন সেলিনা বলেছিল, জানি প্রান্তিক ভাই, মা ইদানীং যে ভাবে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন আর বিষোগার করছেন, তাতে আপনাকে কিছু বলার আমার মুখ নেই। কিন্তু কি করব বলুন, মা তো। আমার অবস্থা একটু বুঝুন। বড় একা হয়ে যাচ্ছি। কতকিছু ঝড় যে আসে চারপাশ থেকে, অতিষ্ট হয়ে যাই। আগে তবু আসতেন মাঝে মাঝে। হয়তো কোন কিছুর সমাধান হতো না। কিন্তু মনে জোর পেতাম। ইদানীং তাও যান না, কি যে নিঃসঙ্গ লাগে, কাকেও কিছু বলতে পারি না। তারপর বলল, জানি আপনি কেন যান না। কিন্তু আমি কি করব বলুনতো? আমি যে আর পারছি না প্রান্তিক ভাই। বুঝতে পারি কত অসহায় আজ সেলিনা, তাইতো তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলি যে তোমার মনের অবস্থা বুঝি, আমারও তোমাদের ওখানে যেতে ইচ্ছে করে না, তা নয়, রেহানাকে ঘিরে কত স্মৃতিইনা তোমাদের ওখানে আছে। আছো তুমি। নিজে এক নগণ্য মানুষ আমি, তবু তোমার সঙ্গে কথা বলে রেহানার স্পর্শ পাই যেন, আমিও যে বড় নিঃসঙ্গ আর একাকী। কি ভাষায় তোমায় সান্ত্বনা দেব। আর কেমন করেই বা দেব বল। সেলিনা বলল জানি, বুঝি না যে তাও নয় প্রান্তিক ভাই, তবু আছে আপনার বাইরের দুনিয়া, আছেন নীলাঞ্জনা পিসি, মিনতি পিসি, অশ্ৰুদি, তপতীদি আছে অগণিত বন্ধু বান্ধব। কিন্তু আমার কে আছে বলুন? কি জানি কেন, সেই নির্জন কৃষ্ণচূড়ার নীচে বসে ওর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, এরা তো তোমারও আপনার। তুমি আসতে পার না এদের কাছে? কি করে আসব বলুন। মা যে একদম ঘর থেকে বের হতে দেননা। মাঝে মাঝে ভেবেছি, মাঝের এই স্মৃতিটুকু ভুলে গিয়ে ফিরে যাব বক্সিং এর দুনিয়ায়। ওখানে গেলে অন্তত এই ব্যক্তিগত দুঃখ মান অভিমান ভুলে গিয়ে একটা জেদ তৈরি হয় চ্যালেঞ্জ নেওয়ার। কিন্তু তাওতো পারিনা। মায়ের সেই এক কথা অনেক হারিয়েছি। আর হারাতে চাইনে। আমি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, চল ওঠা যাক। হ্যাঁ চলুন। ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম। ও বলল, আবার সেই নিঃসঙ্গ একাকীত্ব আর বন্ধ ঘর, সঙ্গে মায়ের সেই অভিযোগের পর অভিযোগ, দেখবেন প্রান্তিক ভাই, আমিও একদিন হারিয়ে যার ঠিক রেহানার মতন। আমি বললাম ছিঃ সেলিনা এভাবে বলতে নেই। তোমাকে ভালবাসারতো লোকের অভাব নেই। সেই জন্যইতো আর পারছি না। ভীষণ ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে নীলাঞ্জনা পিসিকে, মিনতি পিসিকে আরো আরো অনেককে, কিন্তু যে কঠিন শাসনে নিজেকে বেঁধে ফেলেছি, মানে বাঁধতে হয়েছে, সেই যন্ত্রণাটুকু আপনি বোঝেন কি প্রান্তিক ভাই? আমি ধীরে ধীরে বললাম বুঝি সেলিনা বুঝি। বোঝেন? হ্যাঁ বুঝি। বোঝেন যদি, তবে এ থেকে এই কঠিন শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবার একটা পথ বলে দিতে পারেন না? ওর আকুল তৃষ্ণাকে উপলব্ধি করে বললাম, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, কারণ কেবল মাত্র সময়ই পারে এর থেকে মুক্তি দিতে। জানি বিভিন্ন দিক থেকে বাঁধা আসবে, তবু ফিরে যাও সেলিনা তোমার অতীত জীবনে। বক্সিংএর রিং এ নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হও, ফিরে যাও তোমার চঞ্চলতায়, তোমার স্বাভাবিকতায়। ওইটেই তোমার স্বাভাবিক জীবন। স্বাভাবিকতার মধ্যেই নিজেকে ঠিক মত চেনা যায় সেলিনা। তারপর জানতে চাইলাম, কেন পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়েছে, কেন পরীক্ষা দেবে না বলে ঠিক করেছো? এটা ঠিক নয় সেলিনা, একটা কথা মনে রেখো সব সময় হতাশার মাঝেমুক্তি নেই। হতাশা আরো হতাশাকে ডেকে নিয়ে আসে। নিজে যা সত্য বলে মনে করবে তাতে প্রত্যয়ী হও। নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখ। ভেঙে পড়োনা। আঘাতে জর্জরিত না হয়ে দুহাতে আঘাতকে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে চল সামনের দিকে। একদিন জয় আসবেই সেলিনা। আসতেই হবে। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি মুগ্ধ শ্রোতার মতো ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
কি জানি কি নেশায় পেয়েছিল ওকে এত কথা বলার। তবে কি এর মাঝ দিয়ে আমি আমার নিজের হতাশা কাটাতে চেয়েছি? হবে হয়তো।
