কাল তুমি আসবে। অনেক ভেবেছি, এ ভাবে তোমাকে আঘাত দেওয়ার কি অধিকার আছে আমার? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, আঘাত যদি সইতে না পারবে, তা হলে কিসের অহংকার তোমার ভালবাসার। কিসের জোরে ফিরিয়ে দিতে পার তুমি তপতীদির আত্ম নিবেদন, অশ্রুকণার বেদনা ভরা একনিষ্ঠতা, আর সব থেকে নিষ্ঠুর ভাবে ফিরিয়ে দিতে পারো না বলা আত্ম নিবেদিত সেলিনাকে। অথচ সেই তুমি কি মরমীস্পর্শে আমার সব অবহেলাকে সরিয়ে রেখে বুকে তুলে নিলে আমার বিষণ্ণতাকে। কেমন করে পারর, ওদের অত ভালবাসাকে নিজের ক্ষুদ্র সাজিতে ভরে নিতে।
একদিন না একদিন কোন মনোমালিন্য হতেই পারে। আমিও মানুষ। কোন দেবী নই, নই কোন পরী। সেদিন ওদের ওই আত্মত্যাগ অনেক বড় হয়ে তোমাকে যখন আমার বিরুদ্ধে বলতে কিছু বাধ্য করবে, যে ঈশ্বর রূপে তোমাকে কল্পনা করেছি তার যে মৃত্যু হবে। পিরবো কেন তা সইতে।
আর পারবো না বলেই, পূর্বাকাশ লাল হয়ে ওঠার আগে বেরিয়ে পড়ব। একটু আগে প্রস্তুতি শেষ করেছি। যাওয়ার আগে ভীষণ ভীষণ ভাবে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। প্রান্তিক। শুধু একবার তোমার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে করছে, তুমি যেওনা রেহানা। আমার জীবনে রেহানা ছাড়া যে আর কেউ নেই এই বিশ্বাসটুকু রাখ।
হায়রে নারীমন। মৃত্যুতেও তোর শান্তি নেই। রাত যত শেষ হয়ে আসছে, ততই দুর্বলতা আমাকে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে। শুনেছি যেকোন বিপদে, ভক্ত তার ঈশ্বরকে ডাকে। আমিও তো বারবার আকুল ভাবে প্রার্থনা জানাচ্ছি আমার ঈশ্বরের কাছে, তুমি আমায় দুর্বল করে দিওনা, তুমি আমায় শক্তি দাও।
তোমার মাধ্যমে একটা আবেদন রেখে যাচ্ছি মিনতি পিসির কাছে, একবার যেন মা বলে ডাকার অধিকার দেন। কতটুকুইবা পরিচয় তার সঙ্গে, তবু কেন যে বারবার তাকে মা বলে ডাকতে মন চায়। কিন্তু কেন? জানিনা প্রান্তিক কিছুই জানিনা। সময় শেষ হয়ে আসছে। কালের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। ভেবো না আমার জন্য। প্রার্থনা করি, আমার অংক নাই বা মিলুক তোমার উত্তর যেন মিলে যায়, রেহানা।
মিনতি সেনের হাত থেকে চিঠিটা খসে পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, ওরে পাগলি মেয়ে, তোর মুখের মা ডাক শোনার জন্য কি অপরিসীম তৃষ্ণা ছিল আমার। একবারও বুঝলি না। চোখ দিয়ে জল অবিরল গড়িয়ে পড়তে লাগলো ওই প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী, প্রভাবশালী নারীর। এক সম্পর্কহীন বিধর্মী মেয়ের মুখে মা ডাক শোনার জন্য কি অধীর প্রতীক্ষা।
বুক যেন ব্যথায় আটকে যেতে চাইল। ডাঃ পাল বললেন, এ ভাবে ভেঙে পড়বেন মিস সেন। আপনি চিন্তা করবেন না আমরা যেখান থেকে পারি ওকে খুঁজে এনে আপনার কাছে তুলে দেব। পুলিশকে আমরা প্রাইমারী ইনফরমেশান দিয়েছি। ডিটেইল দিতে গেলে যে মিস রহমান কি লিখেছেন ওটাও দরকার। মিনতি সেন বললেন, কোন দরকার নেই ডাঃ পাল। এত সব করে ওর শান্তিকে বিঘ্নিত করে লাভ নেই। একদিন ও ফিরে আসবে, আসতেই হবে। সে দিন মিটিয়ে নেব আমাদের মান অভিমান আর দেনা পাওনার হিসাব। আপনাদের তরফ থেকে আর কোন চেষ্টাই করতে হবে না।
তারপর নিজের আঁচলে চোখের জল মুছে নিয়ে বললেন, এখন কি করবে প্রান্তিক। আমি বললাম, তুমি বলে দাও আমি কি করবো। আমি বলে দেব? তুমি ছাড়া কে বলবে মা? মা। এ তুই কি বলছিস, প্রান্তিক। কেন, কোনদিনই কি চাওনি রেহানার মত আমিও তোমাকে মা বলে ডাকি। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন ওরে পাগল ছেলে, কি করে বোঝাব তোদের? তোদের মা ডাক শোনার জন্য আমার আকাঙ্খর কথা। আমি বললাম, জানি। আজ সেটা ওর চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে গেল। তুমিতো এগিয়ে এসেছিলে আমাদের বুকে তুলে নিতে। ভুল আমাদেরই। আজ সেই ভুল বুঝতে পেরে কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। কাছে টেনে নেবে না? মিনতি সেন বললেন মায়ের কাছে সন্তানের ভুল কোন ভুলই নয়। প্রান্তিক চল এবার আমার সাথে। কোথায়? বাঃ এতবড় দুঃসংবাদটা একবার দিতে হবে না ওদের। থানা থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ম্যানেজমেন্ট আমাকে বলেছে। ওরা হয়তো এখনি এসে যাবে। কিন্তু এদের সামনে কি করে মুখ দেখাব, বলবই বা কি? তোকে কিছু বলতে হবে না। যা বলবার ম্যানেজমেন্ট বলবে। তারপর ওদের যা করণীয় করবে। এতে কি ওদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে না? ওরা যদি দুরে সরে না গিয়ে কাছে আসতে চায়, টেনে নেবো কাছে। মায়ের বুক ভরা ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেব ওদের ক্ষত। চল নিচে গিয়ে বসবি ততক্ষণ। একবার নীলাঞ্জনা পিসির সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমি ফোন করে দেব, উনি যেন আসেন একবার আমাদের বাড়ীতে।
আফরোজ বেগম আসেন নি, এসেছেন নীলাঞ্জনা পিসি ও সেলিনা। সেলিনা কেঁদে উঠে বলল, প্রান্তিক ভাই এ আমারই দোষ, সব দোষ আমার। রেহানা নেই, একদিন নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে আমার অপরাধের মুক্তি হবে কি করে? ক্ষমা আমার ওর কাছ থে•ে পাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব তাকে বলে দিননা প্রান্তিক ভাই। এই প্রথম আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ও কেঁদে ফেলল। পারলাম না ওকে আমার বুক থেকে সরিয়ে দিতে। আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ছিঃ সেলিনা আমিতো তোমাকে জানি, পৃথিবীর কারো কাছে কোন অন্যায় তুমি করতে পার না। এ মিথ্যে দিয়ে আমাকে ভুলাবেন না প্রান্তিক ভাই। ও যদি থাকতো, ওর কাছে মাথা নীচু করে আমি ক্ষমা চাইতাম। সেতো নেই, তাই আপনার পায়েব কাছে আমার প্রণতি জানিয়ে বলছি, প্রান্তিক ভাই তার হয়ে আপনি আমায় ক্ষমা করুন। সত্যি সে ওর মাথাটা নামিয়ে নিয়ে এলো আমার পায়ের পরে। বললাম, একি করছ সেলিনা, ওকে তুলে নিয়ে পাশের চেয়ারটায় বসিয়ে দিয়ে বললাম, তোমার মতো মেয়ের এ পাগলামি সাজেনা ভাই। কেউ তোমাকে বুঝবে কি না আমি জানিনা, কিন্তু আমি যে তোমাকে বুঝি, তা তুমি ভুলে যাও কেন? বোঝেন যদি তবে রেহানাকে আটকাতে পারলেন না কেন? ওর উত্তরতো আজ দিতে পারবো না ভাই। তবে এও তোমার ভুল, যে ভাবে তুমি নিজেকে দায়ী করছ রেহানার চলে যাওয়ার জন্য। আমি যে শান্তি পাচ্ছিনা প্রান্তিক ভাই, আমি কি করব। আমায় পথ বলেদিন বলে আবার ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল, সেলিনা।
