অদ্ভুত, কি অদ্ভুত মেয়ে এই সেলিনা। বিপদের আঁচ আমি পাইনি। হয়তো ও পেয়েছে, বা স্থির জেনেছে। বিশ্বাস, নিজের জন্য এ অভিনয় সে করেনি। যে কোন চরম দুর্ঘটনা থেকে সে বাঁচাতে চেয়েছে আমাকে ও রেহানাকে। কিন্তু কিসের সন্দেহে সে একাজ করল জানিনা। হাজার অনুরোধে ও বলেনি।
এতদিনের মেলা মেশায় বুঝি অশ্রুকণাকে, তপতীকেও বুঝি, বুঝি নীলাঞ্জনা পিসি, মিনতি সেনকেও। কিন্তু বুঝতে পারিনা এই অদ্ভুত মেয়ে সেলিনাকে। যে কোন কিছু চাইবার ক্ষেত্র যেমন স্পষ্ট, পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তেমনি স্পষ্ট। কোন মায়াবী অবগুণ্ঠন নেই, নেই কোন ভনিতা। জানিনা এমন মেয়েকে ভালবাসা যায় কি না।
আজ সেই রিলিজের দিন। আমি একাই এসেছি। অফিস ঘরে ঢুকেই দেখলাম কেউ নেই। কি ব্যাপার? ওরা তো সবাই এক সঙ্গে বেরিয়ে যায় না। কাগজগুলো যে আমার দরকার। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি এলাম রেহানার কেবিনে, সেখানে ডাক্তার পাল, সিস্টার আরো অনেকে আছেন। একি? ছোট খাট ভিড় দেখে মনে খটকা লাগল কিছু কি হয়েছে রেহানার? কিন্তু না জেনেও মন এত কু-গাইছে কেন? ভিতরে ঢুকলাম। ওরা আমাকে পথ করে দিলেন। আমি বললাম রেহানা কোথায়? ওরা চুপ করে আছেন দেখে অবারও বলালম, ওর কি কিছু হয়েছে, কথা বলছেন না কেন? ডাক্তার পাল একটা চিঠি আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন এতে সব লেখা আছে। মিসেস সেনকে আসতে ফোন করে দিয়েছি এখনি আসবেন।
জানিনা কি আছে চিঠিতে। ভয়ে আমার বুক দুরদুর করে কাঁপছে। বারবার ভেবেও চিঠিটা পড়তেও পারছি না। জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা তো পড়েছেন, কি আছে ওতে। ওরা বললেন, ওতে দুটো চিঠি আছে। একটা খাম বন্ধ করা, ওপরে আপনার নাম লেখা। আরেকটা এখানকার ম্যানেজমেন্টকে লেখা। ম্যানেজমেন্টকে লিখেছেন, এই নাসিং হোম তাকে যে যত্নের সঙ্গে এবং দক্ষতার সঙ্গে সুস্থ হতে সাহায্য করেছেন, তার জন্য যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন কৃতজ্ঞ থাকবেন। তাকে আলাদা কেবিন এবং স্বাভাবিক স্বাধীনতা দিয়ে তার শূন্য হৃদয়টাকে যে ভাবে ভরে দিয়েছেন, শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদের কাউকে উনি ছোট করতে চান না। জীবনে যা কিছু চেয়েছেন, তার পূর্ণতা দিয়েছে এই ছোট্ট কেবিনের নির্জনতাটুকু। কোন অবস্থাতেই জীবন থেকে তিনি তা মুছে ফেলতে পারবেন না। কিন্তু সঙ্গে তিনি ভয়ও পেয়েছেন, হয়তো এই সুখ তার জীবনে স্থায়ী হতে দেওয়া হবে না। তাই তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই পরিচিত গন্ডী থেকে তিনি দূরে চলে যাবেন, যাতে তার জীবনের একাকী নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোতে এই স্মৃতিটুকু বেঁচে থাকে। আর একটা অনুরোধ জানিয়ে গেছেন, মিস সেনকে তিনি যেন কোন অবস্থাতেই তাকে খোঁজার চেষ্টা না করেন, আর এই ম্যানেজমেন্টকে তারা যেন কোন ভাবে কাউকে দায়ী করে কাঠগড়ায় দাঁড় না করান। এই সঙ্গে লিখে গেছেন, আলাদা করে একটা চিঠি খাম বন্ধ করে দিয়ে গেলাম। ম্যানেজমেন্টের এই বিশ্বাস রেখে যে, এটা শুধু প্রান্তিককেই দেওয়া হবে আর কাউকে নয়।
আমি অবাক হয়ে ওদের কথা শুনছিলাম। মনে মনে বললাম রেহানা এ তুমি কি করলে। কেন করলে এমন কাজ? কেন তোমার মনে এই ভয় জন্মাল যে, তোমার জীবনে এই সুখটা স্থায়ী হতে দেওয়া হবে না। তুমি একটু বিশ্বাস রাখতে পারলেনা আমার উপর? এত অবিশ্বাস আমাকে? আমার সমস্ত শরীরটা শিহরিত হয়ে উঠলো, আমি থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লাম।
মিনতি সেন এসে দাঁড়ালেন পাশে। তিনি শুনে নিয়েছেন সব কথা। চরম বিস্ময়ে তারও কথা যেন বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। একি করল মেয়েটা কাকে ও ভয় পাচ্ছে? তবে কি সেলিনার প্রতি চরম অভিমানে সে এই পথ বেছে নিল।
আমার কাছে আসতেই আমি হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। যেন আমার একমাত্র আশ্রয় স্থল মিনতি সেন ছাড়া আর কেউ নেই। উনি আমাকে কাঁদতে দিলেন। তারপর আমার হাত থেকে মুখ বন্ধ করা খামটা নিজের হাতে খুলে নীরবে পড়তে লাগলেন, প্রান্তিক, কতবার হিসাবের অংক মেলাতে বলেছে আমাকে। বলতে দ্বিধা নেই। মেলেনি আমার অংক। হয়তো অংকে বরাবর কাঁচা ছিলাম বলে মেলাবার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ তোমার কাছে জানতে চেয়েছিলাম একদিন, কি পাবে এই অংক মেলানোয়। জীবনের অংক মেলেনা কোনদিন। তোমাকে আঘাত দিতে চাইনি বলে বার বার বলেছি ঠিক মিলিয়ে দেব একদিন। কিন্তু জানতাম না, আমার অংকের উত্তর তোমার উত্তরের সঙ্গেও মিলবে না।
এই কেবিন আমাকে কি দিয়েছে, এখানকার ম্যানেজমেন্টকে তা বলে গেছি আলাদা ভাবে, তোমাকে তা আর নতুন করে কি বলব। আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানি না। আমার এই যাওয়াটাকে জানি তোমরা হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে ভাববে। তা ভাবতে পার। কিন্তু যে পূর্ণতায় আমি পরিপূর্ণ, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো তাকে ক্ষয় হতে দিতে পারি না।
আমার কাছে তুমি কতটুকু তা নিজের মুখে বলে নিজেকে যেমন ছোট করতে পারব না, তেমনি পারবো না তোমাকেও ছোট করতে। তুমি অনেক বার বলেছে, রেহানা তোমার ভালবাসার কাছে আমি তুচ্ছ। আমি যা নই তেমনি এক বিরাটত্বের মাঝে আমাকে উত্তীর্ণ করে, তুমি নিজে সান্ত্বনা খুঁজতে চেয়েছে। পারলাম না মেনে নিতে বলে আমায় তুমি ক্ষমা করো। জানিনা, মিনতি পিসি, তোমার পিসি, সেলিনা এমনকি আমার মা পর্যন্ত আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন কিনা কিন্তু এও জানি প্রান্তিক তুমি পারবে। তোমার ভাষায় তুমি অতি ক্ষুদ্র। হ্যাঁ, সত্যিই তাই। তাই আমার এই তুচ্ছ সিদ্ধান্ত তোমার মতো ক্ষুদ্রের পক্ষেই ক্ষমা করা সম্ভব।
১০. কেন চলে যাচ্ছি
কেন চলে যাচ্ছি, জানতে চেওনা। খুঁজবারও চেষ্টা করোনা আমাকে কোথাও। পাবে না। তবে তোমাকে যতই ভয় দেখিয়ে থাকি না কেন, তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবো না কোনদিনও। তোমার ওপর এই বিশ্বাস নিয়েই পথে নামলাম। একদিন এই পথ হয়তো তোমার কাছে আবার আমাকে পৌঁছিয়ে দেবে।
