হঠাৎ রাগ হয়ে গেল ভীষণ। বললাম, তোমার সব অভিযোগতো মাথা পেতে নিয়েছি। আবার কোন খেলা খেলবে আমাকে নিয়ে। তারপর বললাম বেশ অভিনয় করতে কোথায় যেতে হবে? কোথাও না। এই ওয়েটিং রুমে আমরা শুধু পাশাপাশি বসে থাকবো। ব্যাস। অভিনয় শেষ? কোন ভালবাসার কথা নেই, নেই কোন মান অভিমান, এমন নিরামিষ অভিনয় আমি করতে পারবো না সেলিনা। চোখে তীর্যক দৃষ্টি এনে বলল নিরামিষকে আমিষ করার দায়ীত্ব আমার তখন বাধা দেবেন না তো? বেশ তাই হবে।
কি হয়েছিল জানিনা। ওযে কি খেলা খেলতে চেয়েছিল তাও জানিনা। ওয়েটিং রুমে বসে আছি আমরা। বুঝতে পারছি কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছি আমি, নিজের মনে আগে যে জোর ছিল তাও যেন কেমন কমে আসছে। কোন কিছুই স্বাভাবিক ভাবে ভাবতে পারছি না। হঠাৎ ও আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলল, তুমি কেন বুঝতে চাওনা, কি চাই আমি তোমার কাছে। আমি অবাক হয়ে বললাম ছিঃ সেলিনা! এসব কি হচ্ছে? ও বলল কি নেই আমার প্রান্তিক, যার জন্য এমনি ভাবে এড়িয়ে চল। ও আমার কাঁধের পরে একটা হাত রেখে আরো কাছে এগিয়ে এল। বললাম, আমি রক্ত মাংসের মানুষ, কেন চাইছো রেহানার কাছ থেকে আমাকে এভাবে সরিয়ে নিয়ে আসতে। আমি তোমাকে ভালবাসি, ওর থেকেও আমি তোমাকে বেশী সুখী করতে পারব তাই। আরো কয়েকজন লোক এলেন ওয়েটিং রুমে বসবার জন্য। আমার ভীষণ খারাপ লাগছে, বললাম চল এখান থেকে ওঠা যাক। কেন লজ্জা করছে তোমার? এটা শুধু লজ্জার নয়, এটা অশ্লীলতার প্রশ্ন। জীবনটাতো শুধু শ্লীলতা দিয়ে বিচার হয় না প্রান্তিক, কখনো কখনো তা অশ্লীল, আর তাই বলে অশ্লীলতাকে একেবারে অস্বীকার করো না। সময় ও পরিস্থিতি অনুসারে অশ্লীলতাকেও সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যায়। আমার দৃষ্টি দিয়ে দেখ প্রান্তিক, আমি যা চাইহি, তুমিও তাই চাইছে, শুধু পরিস্থিতির মাপকাঠিতে তোমার তা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
ও আমার কানের কাছে মুখ এনে আরো নীচুস্বরে ফিস ফিস করে কি যেন বলল, কোন কথাই বুঝতে পারলাম না। আমি কোন কথা না বলে চুপ করে আছি দেখে বলল, তা হলে আমার অপমান তুমি দেখতে চাও? দেখতে পাচ্ছি দুটি ছেলে, বয়স আমারই মত হবে, কয়েকবার এই ঘরে উঁকি মেরে যাচ্ছে। এবার তারা একটু নিরাপদ দূরত্বে এসে বসল। যেহেতু ভিজিটিং টাইম, তাই এ ঘরে লোকজনের আনা গোনা বেশী নেই। যারা এসে বসেছিলেন তারাও মিনিট পাঁচেক আগে চলে গেছেন। সেলিনার ওই গায়ে পড়া ভাব, আর ছেলে দুটির ওই ভাবে মাঝে মাঝে তাকিয়ে জরিপ করা, সব কিছু নিয়ে আমার প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল সেলিনার উপর। মনে হতে লাগল, হাতের পাঁচটা আঙুল বসিয়ে দিই ওর হাসি হাসি মুখে। ও কিন্তু নির্বিকার। চোখের ভঙ্গিমায় অনুরাগের দ্যোতনায় অধিকারের জবরদস্তিতে অকারণ বুক থেকে মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃত আঁচল খসে পড়া, সব কিছু নিয়ে আমাকে যখন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রেরিত করছে তখনি বলল, জানি আমার ডাকে তোমাকে সাড়া দিতেই হবে। কতদিন আর এড়িয়ে চলবে। তাই বলছি চল না প্রান্তিক, আমার সব ব্যবস্থা করা আছে। পার্ক হোটেল, ১৪ নং ঘর, সারা রাতের জন্য বুক করা হয়েছে। এবার খুশীতো আনন্দে উজ্জ্বল দুটি চোখ থেকে যেন সীমাহীন তৃষ্ণার লেলিহান শিখা বেরিয়ে আসছে।
ছেলে দুটি তীব্ৰদৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, কি হ্যাংলামো দেখেছিস? আরেক জন বলল আরে ছেড়ে দে, এসব কেসের পরিণতি তো জানা। চল আমরা একটু ঘুরে আসি।
ওরা বেরিয়ে গেল। সেলিনা তখন আমার হাত ছাড়েনি। তবে কাঁধের হাতটা নামিয়ে সামান্য দূরে সরে বসেছে। আমি একটু জোর করেই হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। বললাম, তুমি কি লাজু লজ্জার মাথা খেয়েছো? খিল খিল করে হেসে উঠলো সেলিনা। চোখ দুটির তীর্যক দৃষ্টিকে বাইরের রাস্তার দিকে ফিরিয়ে, বললাম তোমার হাসতে লজ্জা করছেনা? ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেছে। যারা রোগী দেখতে এসেছিলেন তারা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছেন সব। রেহানাকে আজ কেউ দেখতে আসেনি। আমি যে সত্যি সত্যি আসব না তাও তো ওকে বলে আসা হয়নি। বুঝতে পারছি, কি তীব্র অভিমান নিয়ে কাল পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।
সেলিনা বলল, না লজ্জা করছেনা প্রান্তিক ভাই। প্রান্তিক ভাই! আবারও চমকে উঠলাম আমি। এ কোন কুহকিনী। ও বলল, বিশ্বাস করুন, এ অভিনয়টুকু না করে আমার কোন উপায় ছিল না। যে সমস্ত কথা বলেছি, তার জন্য আপনি আমায় ক্ষমা করে দেবেন। জীবনের পাতা থেকে আজকের এই মুহূর্তটুকু কালো কালি দিয়ে কেটে দেবেন। চলুন এবার। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে বললাম, একবার যাবে না রেহানার সঙ্গে দেখা করতে? বলল, জানি খুব কষ্ট হচ্ছে আপনার, ওর ও যে কি হচ্ছে সেতো আমি ভুত ভোগী হিসাবে জানি তবু শুধু একটা দিন এটাকে মেনে নিন প্রান্তিক ভাই। আমি বললাম, তুমি বক্সিংএর মেয়ে, রিংএ কাকে কিভাবে নক আউট করবে, সেটা তুমিই জান। তবু একটা কথা বলবে, এমন চরম অভিনয় তুমি করলে কেন? তুমি কেন বুঝতে চাইলেনা, আমিও রক্তমাংসের মানুষ, হঠাৎ পতন হলে কি উত্তর দেব তোমাদের কাছে? আবারও সেই উপছে পড়া হাসি। হাসতে হাসতেই বলে আমাদের কাছে? তার থেকে বলুননা, আমার কাছে। ধর তাই। কোন উত্তর দিতে হবে না প্রান্তিক ভাই। যদি না বুঝতাম আপনাকে, এই নৃশংস অভিনয় করতে যেতাম না। আজ কোন উত্তর চাইবেন না। যে জন্য এ অভিনয় দরকার হয়েছিল, তা যদি কৃতকাৰ্য্য হয় জানাব আপনাকে, অন্তরের কৃতজ্ঞতাও উজাড় করে দেব সেদিন। আজ থাক প্রান্তিক ভাই। আজ শুধু মিথ্যে এ অভিনয়টুকুর জন্য ক্ষমা ভিক্ষে চাইছি।
