মনে মনে ভাবি কি আকুল তৃষ্ণা। এমনি অভিযোগের আঙুল তুলে এইতো একটু আগে মিনতি পিসির বাড়ীতে আমার কাছে কৈফিয়ৎ চেয়েছিল সেলিনা। অবিকল সেই কথা গুলো এক অসতর্ক মুহূর্তে বেরিয়ে এল রেহানারও মুখ দিয়ে। আমি আবেগে ভাসতে ভাসতে বললাম, সত্যি তোমাকে বুঝিনি রেহানা। বোঝনি? না। তা হলে এই নাও চিরুনি সুন্দর করে দাও আমার খোঁপা। আর যে শাড়ীটা পরে তোমার সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, আছে নিশ্চয়ই এখানে কোথাও পরিয়ে দাওনা সুন্দর করে আমাকে। আমি অবাক হয়ে বললাম আমি পরিয়ে দেব-তোমাকে শাড়ি? কেন পারবে না? তারপর করুণ ভাবে বলল, আমিতো নিজে পিরবো না পরতে, তবে কে আমাকে পরিয়ে দেবে? সেলিনা আসুক আমি ওকেই বলব। তবু তুমি পারবে না এটাতো কেবিন, কেউ তো নেই এখানে, তবে অসুবিধা কোথায়? আমি বললাম, অসুবিধাটা যে কোথায় তা আমি তোমাকে কেমন করে বোঝাই? ও হতাশ ভাবে বলল জানি পারবে না তুমি, তবে কেন মিথ্যে স্বপ্ন দেখাও প্রান্তিক? আমিতো হেরে গেছি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, হৃদয় এবং মনে আমি শক্তিহীন। তুমি চলে যাও প্রান্তিক ওরা বাইরে অপেক্ষা করছে, তুমি না গেলে ওরা কেউ আসবে না। ওদের আসতে দাও। বললাম থাক না ওরা বাইরে। আজ শুধু আমি থাকি তোমাব কাছে? কেন মিথ্যে দুঃখের রেশ বাড়বে? কি দেখবে তুমি আমার মধ্যে রূপ? হারিয়ে ফেলেছি। মন? বাসী হয়ে গেছে। হৃদয়? প্রাণহীন পাথর মাত্র। আর যে দুটি উজ্জ্বল চোখের মায়ায় পড়েছিলে একদিন, ধূসর হয়ে গেছে তাহলে কি দেখবে তুমি আমার মধ্যে?
বললাম রেহানা, যত পার আঘাত দাও, কিন্তু ভুলে যেও না আমার শিরায় শিরায় কেবল তোমার উপস্থিতি। দাঁড়াও দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসি। কেন? তোমাকে সাজাবো বলে? কি ভাবে সাজাবে। বললাম আমার ভালবাসার রঙে।
চিকনি চালিয়ে ওর অবিন্যস্ত চুলকে বিন্যস্ত কবলাম। তারপর দু হাতে ওকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলাম। আমার অদক্ষ হাতে পরিয়ে দিলাম ওর আকাঙ্খিত শাড়ী। তারপর বললাম, তুমি পারবে দাঁড়াতে? কেন গো? আমার সাজানো যে পূর্ণ হয়নি রেহানা, আমি যাব আব আসব। পারবে না দাঁড়াতে? পারবো।
আমি দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। বাইরে তখনো অপেক্ষা করছে ওরা। আমি সেলিনাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বললাম, আজ আর ঠাট্টা করোনা সেলিনা। একবার শুধু একবার আমাকে জিততে দাও। সেলিনা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। বললাম আমি দাঁড়িয়ে আছি। গেটের বাইরে ফুলের পসরা সাজিয়ে বসে আছে ফুলওয়ালী। আসার সময় দেখে এসেছি বিভিন্ন রং এর মিশ্র চন্দ্রমল্লিকা, নিয়ে আসবে একটা? ও বলল, এখনি আনছি। আর একটা কথা? বলুন। সবুজ টিপ আছে তোমার কাছে আর চওড়া লাল গার্ডার। হ্যাঁ আছে? দেবে আমাকে? দেব। ও দ্রুত গেটের বাইরে গিয়ে চন্দ্রমল্লিকা কিনে এনে আমার হাতে দিয়ে বলল, আমি কৃতজ্ঞ প্রান্তিক ভাই আপনার কাছে। জয় হোক আপনার।
দ্রুত ওর কাছে এসে দেখি সত্যি তেমনি ভাবে দাঁড়িয়ে আছে রেহানা। বললাম কষ্ট হচ্ছে না? না। আমি পরম মমতায় চওড়া লাল গার্ডার পরিয়ে দিলাম ওর হাতের রিষ্টে। কপালে সবুজ টিপ পরালাম। তারপর বললাম, আস্তে আস্তে হেঁটে যেতে পারবে আয়নার কাছে।
ও এগিয়ে এল। দেখত আয়নায় চিনতে পার কিনা। চকিতে আমার দিকে ফিরে বলল, তুমি ভীষণ দুষ্টু। আমি ওকে মুহূর্তে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললাম সত্যিই তাই। ও আমাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলল তুমি শুধু আমার প্রান্তিক, শুধু আমার। আমি এই অবসরে চন্দ্রমল্লিকাটা ওর খোঁপায় গুঁজে দিয়ে চোখের পর চোখ রেখে তাকালাম ওর দিকে। বলল কি দেখছ অমন করে? বললাম, হেলায় হারিয়েছি যে অতীত, হিসেব মিলিয়ে দেখছিলাম তাকে ফিরে পেলাম কি না। পেলে? বললাম জীবন নিয়েতো অনেক বড়াই করো, বলতে পারো উত্তর মিলল কি না। কাল বলব। কেন আজ নয় কেন? এখনো যে নিজের অংক মেলাতে পারিনি। এটুকু সময় আমাকে দেবে না। আবার ওকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললাম, আমি অনন্ত কাল তোমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করব রেহানা। এবারে ছাড়। ভিজিটিং আওয়ার উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, ওরা সই অপেক্ষা করছেন। ওরা আসবেন না?
রেহানা অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ভিক্ষে চাইবো না। যদি মনে হয় সুন্দর, প্রতিদান দেবে না? আবেগে থর থর করে কাঁপছে হৃদয় মন শরীর সব কিছু। বললাম দেব। এস তোমাকে শুইয়ে দিই।
মনে হয় সত্যিই ক্লান্তি লাগছিল। বাধা দিল না। যেভাবে নিজের হাতে সাজিয়েছি ওকে সেই ভাবে আস্তে ওকে শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলে ও আমার হাতটা মুহূর্তে ধরে ফেলে বলল তুমি মিথ্যেবাদী। আমি হাসলাম ওর চোখে চোখ রেখে বললাম প্রতিদান তো? চোখের ভাষায় ও বলল হ্যাঁ। কি যে হল কে জানে সমস্ত সংযমকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে নিজের মুখটাকে নামিয়ে নিয়ে এলাম ওর মুখের ওপর এবং আলতো চুম্বন দিয়েই পালিয়ে এলাম। দ্রুত দরজা খুলে একবার ওর দিকে তাকাতেই ও হাসি হাসি মুখে বলল, কাল আসছো তো?
আজ ওকে ছেড়ে দেবে। সেলিনাকে বললাম চল, ওকে নিয়ে আসি। বলল, আপনি যান প্রান্তিক ভাই, কেন তুমি যাবে না? ও শুধু হাসল। মিনতি পিসি বলেছেন, আমি গাড়ী পাঠিয়ে দেব গেটে গাড়ী থাকবে। গাড়ীর নাম্বারটা আমায় দিয়েছিলেন। আফরোজ বেগমকে বললাম, আপনিতো একদিনও গেলেন না মাসিমা, আজ চলুন। আপনাকে দেখলে ওর ভাল লাগবে। উনি অকারণে চোখের জল ফেলে বললেন, না বাবা তুমি যাও। কতদিন পরে মেয়েটা আসবে বাড়ীতে। ওর জন্য বহু দিন পরে ও যা ভালবাসে দেখি তার কোন বন্দোবস্ত করতে পারি কি না।
