কাছে এসে দাঁড়াই আমি সেলিনা ও মিনতি সেন। নীলাঞ্জনা বললেন, এই যে প্রান্তিক তুমি এসেছো কি না জিজ্ঞাসা করছিল। তুমি বোস ওর কাছে, আমি এক পাশে বসতেই নীলাঞ্জনা সেলিনাকে বলল, সেলিনা জিনিষটা বোধ হয় পাসনি, চলতো দেখি কোথায় পাওয়া যায় নিয়ে আসি। তারপর মিনতি সেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনিও চলুন মিস সেন। বলে নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াতেই, রেহানা বলল না তুমি যাবে না পিসি। নীলাঞ্জনা বললেন, পাগলামি করে না রেহানা, আমি আসছি, ওরাতো পায়নি, আমি না গেলে হয়? তুমি প্রান্তিকের সঙ্গে কথা বল। আমরা আসছি। প্রায় জোর করে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন নীলাঞ্জনা। আর এই প্রথম, কি যে এক গভীর আনন্দে ওকে বুকের পর টেনে নিতে ইচ্ছে করছিল, তা বোঝাতে পারবো না। বহু কষ্টে তা দমন করে বললাম, এখন কেমন আছ রেহানা। আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে বলল, আমার উপর তুমি রাগ করেছো? কেন? তা হলে এত দেরি করে এলে কেন? কি যে হয়েছে প্রান্তিক, প্রতি মুহূর্তেই শুধু তোমাকে চেয়েছি। আর তোমাকে না পেয়ে আমি যেন কেমন যোবা হয়ে যাচ্ছিলাম। বললাম একটা ভীষণ কাজ ছিল। আর কোন দিন এ ভুল হবে না। দেখ এবার থেকে আমি সব সময় তোমার পাশে থাকব। সত্যি? সত্যি। তা হলে আমাকে ধরে তুলে বসিয়ে দাও। বললাম, বসতে পারবে তো? হা গো পারবো।
আমি ওকে আস্তে তুলে বসিয়ে দিলাম। বুঝতে পারছি কষ্ট হচ্ছে, তবু মনের জোরে বসল। বলল, তুমি কখন খেয়েছো? এইতো দুপুরের পরে। কোথায়? মিনতি পিসির ওখানে। উনি এসেছেন? আমি হা বলতেও বলল, তা হলে একবার ডেকে দাওনা। বললাম ওরা একটু বেরিয়েছে এখনই আসবেন।
ও বলল জান প্রান্তিক, আমার কেবলি মনে হয় আমি বোধ হয় তোমাকে আর আগের মত ভালবাসিনা। কি করে বুঝলে? বা আমি তোমাকে ভালবাসি কি না আমি তা বুঝবনা? তুমি কি করে বুঝবে? তবে কে বুঝবে? আমি বুঝব। আমি জানি, আমাকে তুমি খুব-খুব ভালবাস।
ও একটু ম্লান হাসল। তারপর বলল, আচ্ছা আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই তুমি আমাকে খুঁজে পাবে? তোমাকে হারাতেই দেবো না। বা তাই হয় নাকি? আমি কি টাকা কড়ি, যে লুকিয়ে রাখবে যাতে কিছুতে না হারিয়ে যাই। তুমি আমার অহঙ্কার রেহানা, তোমাকে সব সময় নিজের কাছে রাখা যে আমার আরো বড় অহঙ্কার। ও আবার হাসল, তারপর বলল, তোমার সবটাতেই বেশী বেশী। সেতো তোমার জন্যই রেহানা। তা হলে আমার এরকম মনে হয় কেন? সে তোমার মনের ভুল, বাস্তব সত্যি নয়।
ও হঠাৎ করে বলল, তুমি সেলিনাকেও খুব ভালবাস তাই না? সেলিনার মত মেয়েকে ভাল না বেসে পারা যায়? তুমিই বলো না? সে তো আমার বোন বলে। তোমার বোন কি আমার বোন নয়? তবে ওরা যে বলল! ওরা কারা! তাতো জানিনা, কবে যেন দেখেছি ওদের, কিন্তু তবু কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কি বলল ওরা! ওরা বলল, সেলিনাকে তুমি ভীষণ ভালবাস। শুধু আমার জন্য, সে কথা তুমি বলতে পারছনা। ওর মত মেয়েকে ভালবাসবে, তাতে আমার কি বলার আছে? ও তারপর হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বলল, সেলিনা খুব ভাল মেয়ে, জান ও আমার থেকেও তোমায় বেশী ভালবাসে, ওকে তুমি গ্রহণ করবে তো।
এবার আমি আর সহ্য করতে পারলাম না, ধমক দিয়ে বললাম তুমি চুপ করবে? ও বলল, খুব মায়া হয় ওর জন্য না? আচ্ছা কেন ওর খোঁপায় ভালবেসে যে ফুল গুঁজে দিয়েছিলে তা ফেলে দিলে? বললাম আমার ইচ্ছেয় তাকে সাজিয়ে ছিলাম, ভাল লাগেনি তাই ফেলে দিয়েছি। তা হলে তো আমাকে সাজিয়েও যদি কখনো ভাল না লাগে তা হলে নিশ্চয়ই ফেলে দেবে? আমি অভিমানে বললাম জানিনা। তুমি এমন কথা বললে আমি আর থাকব না তোমার কাছে? কোথায় যাবে? সেলিনার কাছে? আমি রাগ করে বললাম হ্যাঁ ৩ই যাবো। তোমার চোখের ওপর ওকে আমি ভালবাসব, ওকে আদর করব, ওকে নিয়ে বেড়াতে যাবো, ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব, দেখবে তখন মজাটা? ও হেসে বলল, ঈশ পারবে না তুমি। কেন পারবো না, কেন? কি করে পারবে? ওকে আদর করতে গিয়ে যদি আমার মুখ দেখে শিউরে ওঠো পারবে ওকে আদর করতে? আমি বললাম আচ্ছা রেহানা কে তোমার মাথায় এই সমস্ত দুবুৰ্দ্ধিগুলো ঢুকিয়েছে বলতো। ও নির্বিকার ভাবে বলল তুমি। আমি? হাঁ তুমি। কখন? এইতো বললে, ওকে তুমি ভালবাসবে। ওকে তুমি আদব করবে, বল নি?
আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না ওকি সুস্থ? এর সঙ্গে আর বেশী কথা বলা ঠিক হবে না। ও বলল, কি হল আর কথা বলবে না? তুমি বল আমি শুনি। আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে? কোথায়? তোমাদের গ্রামে। সেই অনেকদিন আগে একবার বলেছিলে, যাবে তো? নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো? সেখানে কি কি আছে? বললাম, মাথার উপর খোলা আকাশ পায়ের নীচে দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত। আকাশে অনেক তারা। নদী পারে হলুদ সর্ষে ক্ষেত। আর পুকুর ভরা মাছ। কোন ফুলের বাগান নেই তোমাদের গ্রামে? তাও আছে। তবে গ্রামের প্রত্যেকের বাড়ীতেই তো আছে ফুলের বাগান। তাই আলাদা করে শুধু ফুলের জন্য ফুলের বাগান কোথাও নেই। ও বলল তোমাদের বাড়ীতে ফুলের বাগান আছে? হ্যাঁ আছে। কি কি ফুল ফোটে। অনেক জানা না জানা অসংখ্য নামের ফুল ফোটে সেই বাগানে। চন্দ্রমল্লিকা ফোটে না? জান আমার চন্দ্রমল্লিকা ভীষণ ভাল লাগে। লাল নীল হলুদ সাদা অসংখ্য বকমের চন্দ্রমল্লিকার মধ্যে যেন আমি নিজেকে খুঁজে পাই। একটু হেসে বললাম তাই বুঝি। তারপর বললাম, তুমি যখন আমাদের গ্রামে আমাদের বাড়ীতে যাবে, অসংখ্য পাখ-পাখালীর ডাকে তোমার যখন ঘুম ভাঙবে, তোমাকে নিয়ে যাবে, সেই চন্দ্রমল্লিকার বাগানে।
