তাও যাক, রেহানার আপনার কাছে আসাতে কেন আপনি চমকে উঠলেন, সেলিনা আসতে পারে বলে? আপনি কি চাননি মনে মনে আমাকে? হয়তো অস্বীকার করবেন, কিন্তু তার দ্বারা কি মনকে ফাঁকি দেওয়া যাবে প্রান্তিক ভাই? যাবে না আর এই দোদুল্যমান মন নিয়েই আমাদের চলতে হবে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বকে মেনে নিতে হবে স্বাভাবিকতায়। ব্যাথায় ভরে থাকবে হৃদয়ের একটা দিক, তবু হাসতে হবে, আনন্দের ফুলকি ঝরাতে হবে যার সঙ্গে পথ চলছি তাকে নিয়ে। এইতো জীবন। আর এদের হাসি কান্নার ইতিহাসই আজকের পৃথিবী।
প্রথম প্রথম মনে হতো আমার এই গোপন অভিসার কেউ বুঝি জানে না, কিন্তু নীলাঞ্জনা, পিসি আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কাউকে কাউকে ফাঁকি দিতে পারলেও সবাইকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। আর সেটা আরো স্পষ্ট হল, অশ্ৰুদি যখন বললেন, সেলিনা তোমার হাসি ঠাট্টার মধ্যে চোখ দুটি অমন করুন কেন? কেন এমন করে প্রান্তিককে টানছে তোমার দিকে। বেচারা নিজেই হয়তো হারিয়ে যাবে একদিন।
পুরুষের দাম্ভিকতা আর অহংকারকে যদিও বা এড়ানো যায় মেয়ে মানুষের দৃষ্টিকে কি এড়ানো যায়? যায় না-প্রান্তিক ভাই। কিন্তু থাক ওসব কথা। এতক্ষণ ক্ষোভ আর আবেগ মিশিয়ে যা বললাম তা আমার নিজের কথা। এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার দরকার নেই প্রান্তিক ভাই। আবারও বলছি, আমি রেহানা নই, আমি সেলিনা আমার অধিকার আমি বুঝে নিতে জানি। এবার বলুন, কোথায় যাবেন। আর কেনইবা যাবেন। আমি আপনাদের কথায় যেটুকু বুঝেছি, পারবেন কি মিনতি পিসিকে ছেড়ে চলে যেতে? কেন মিথ্যে অহংকারে ভ্রান্ত পথে পা বাড়াচ্ছেন। কেন বুঝতে চাইবেন না মিনতি পিসির জীবনে আপনাদের মূল্য কতটুকু। যদি না বুঝবেন, তবে কোথায় আপনি আলাদা? আপনার যে আলাদ অস্তিত্বকে আমি এতদিন শ্রদ্ধার অর্থ দিয়ে এসেছি তার কি কোন মূল্য নেই প্রান্তিক ভাই। ফিরে আসুন। যান পিসির কাছে, বুঝুন তাকে। ভয় নেই, আমার যত কষ্টই হোক, রেহানার কাছ থেকে আপনাকে কোনদিনই কেড়ে নেব না। আমিতো জানি, নিজেকে দিয়েই বুঝি, তাহলে কষ্টটা কত তীব্র হতে পাবে।
ও দাঁড়িয়ে আছে আমার ঠিক পিছনে। তার উষ্ণ নিশ্বাসে মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছি আমি। একবার মনে হল, ওর দিকে ফিরে ওকে বুকের ওপর টেনে নিয়ে বলি তোমাকে বুঝি সেলিনা, তোমার দুর্বলতা তোমার ভাললাগা তোমার হাসি কান্না তোমার রাগ-অনুরাগ মান-অভিমান, কিছুই আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। তোমাকে ভালবাসি তোমার থেকেও বেশি করে। তবু রেহানা আছে আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়ে তাকে আমি হারাতে পারবো না।
মন চাইলেও পারলাম না বলতে। পিছনে ফিরে দেখি কখন যেন নিরাপদ দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছেন মিনতি সেন। কোন ভাবেই চোখ মেলে তাকাতে পারলাম না তার দিকে।
এগিয়ে এলেন উনি, সেলিনাকে নিজেই তার বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন তোকে বুঝতে ভীষণ ভুল করেছিলাম, মা। আমায় ক্ষমা করে দিস। সেলিনা বলল, পিসি আমি যদি কোন অন্যায় করি ক্ষমা করো, তোমাকে চিনতাম না দেখিওনি কখনো, কিন্তু শুনেছি তোমার কথা বিভিন্ন ভাবে। যাবে না হাসপাতালে। যাব। কিন্তু মা, পারবি তো নিজেকে সব কিছুর উর্দ্ধে নিয়ে যেতে। পারবি তো প্রান্তিকের ভালবাসাকে সুগভীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে। ভয় নেই। আমার সর্বস্ব বিলিয়ে দেবো, রেহানা যাতে সুস্থ হয়। কিন্তু কোন ঈর্ষা তোকে বিপথে চালিত করবে না তো মা। সেলিনা কোন উত্তর না দিয়ে চোখের জলে ভিজিয়ে দিল মিনতি সেনের বুকের কাপড়
আমরা যখন হাসপাতালে এলাম, তার অনেক আগে থেকে ভিজিটিং আওয়ার আরম্ভ হয়ে গেছে। আজ আগে থেকেই এসেছেন নীলাঞ্জনা পিসি। আমাদের কাউকে না দেখে তিনি একা একা রেহানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। অন্য দিকে ফিরে শুয়ে আছে রেহানা। ডাকলেন, রেহানা। ডাক শুনে এ পাশে ফিরে দেখে নীলাঞ্জনা দাঁড়িয়ে আছেন। তাকিয়ে আছে রেহানা কি যেন বিষণ্ণ দৃষ্টি নিয়ে। নীলাঞ্জনা জানেন, স্মৃতি ফেরেনি ওর, কাউকে চিনতে পারে না। তাই কোন কথা না বলে পাশের টুলটা টেনে নিয়ে ওর বিছানার কাছ বসে ওর একটা হাত টেনে নিয়ে কোন কথা না বলে ছল ছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। রেহানা বলে, তুমি কাঁদছ পিসি। চমকে ওঠে নীলাঞ্জনা। বলে তুই চিনতে পারছিস আমায়? বলতো আমি কে? নীলাঞ্জনাকে দুহাতে তার বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে, তোমায় চিনতে পারবো না কেন? কি হয়েছে আমার। না রে পাগলি কিছু হয়নি। এখন কেমন আছিস বলতো। কিছু হয়নি তো এমন করছ কেন তুমি। তোমার সঙ্গে আর কেউ আসেনি? কার কথা বলছিস? ও চুপ করে থাকে। নীলাঞ্জনা বলে, প্রান্তিক এসেছে ডাকবো ওকে? ও কোথায়? ও একটা জিনিস আনতে বাইরে গেছে। এখনি এসে যাবে, পাঠিয়ে দেব? না থাক। আর কেউ আসেনি? এসেছে অনেকে। তুই কাকে চাইছিস বল তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেলিনা আসেনি? সে তো এই নাসিং হোমকেই তার বাড়ী বানিয়ে ফেলেছে। ও, বলে চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ভীষণ খিদে পেয়েছে পিসি। কিছু টিফিন আননি? বল কি খাবি? যা এনেছো তাই দাও।
আজ কি মনে হতে, ফল কিনে ছিলেন নীলাঞ্জনা। বেদানা, আঙুর, আপেল বের করে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে দিতে লাগলেন। রেহানা বলল, তোমাদের খুব ভোগাচ্ছি তাই না? মেয়ের কথা দেখ। মেয়ের কাছে আসতে কোন মায়ের কি কষ্ট হয়? হয় না বুঝি? তাই কি কখনো হতে পারে মা। তাই যদি হয়, তবে আমার মা কোথায়? আমার মা আফরোজ বেগম। কথাটা বোঝেন, নীলাঞ্জনা। বলেন, আমি কি তোর মা নই? তুই একটা একটা করে খা, আমি দেখি ওরা ফিরল কি না। না তুমি বোস। অগত্যা বসতে হয় নীলাঞ্জনাকে। নীলাঞ্জনা পালিয়ে যায় কি না সেই ভয়েই বুঝি, নীলাঞ্জনার আঁচলটা চেপে ধরে আছে রেহানা।
