আমি চমকে উঠে বললাম, কি বলছ কি তুমি? কি এমন ঘটনা যা রেহানা আমাকে জানাতে চাইলনা। সেলিনা বলল আপনিতো তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতেন, আপনিতো জানেন, তাকে জিজ্ঞাসা করলে, যত অসুবিধাই হোক সে আপনাকে সত্যি কথাই বলবে। কিন্তু কেন আপনি তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না? আমি ভেবেছিলাম ওই আমাকে বলবে। অনাবশ্যক কৌতূহল আমার নেই। বাঃ পূর্ব। শ্লেষ ঝরে পড়ে ওর কণ্ঠে। যেদিন ও সত্যি সত্যি আপনার জীবনে আসবে, সেদিনও কি কোন কৌতূহল থাকবে না? না সেদিনও বলবেন ও যদি না বলে, আমার জানার কি দরকার? আর এই মানসিকতা নিয়ে আপনি পথ চলবেন এক সাথে? পৃথিবীতে কেউ কি কোনদিন তা পেরেছে? না প্রান্তিক ভাই। আমি কিন্তু আপনাকে এ ভাবে ভাবিনি। যে ব্যাথা একা বয়ে চলেছে রেহানা কেন আপনি তার ভাগ নিতে চাইলেন না? তা ছাড়া একটা রূঢ় কথা প্রান্তিক ভাই, শুনতে খারাপ লাগবে, তবু বলবো, রেহনাকে কি আপনি বোঝেন? আমার তো মনে হয় শুধু রেহানা কেন, আপনি কাউকে বোঝেন না। তারপর বলল, সব মেয়েরাই চায় তার ভালবাসার পুরুষটি তাকে বুঝতে শিখুক, তাকে আগলে থাকুক, তার ভুলগুলো শুধরে দিক যেমন একদিকে, তেমনি আর একদিক তার ভালবাসার মানুষটি তাকে তার প্রিয় উপহারে সাজিয়ে দিক। হোকনা তা অতি তুচ্ছ, তবু তার ছবিটাতে নন্দিত হোক তার প্রেমিকা, এতো সব মেয়েরই স্বপ্ন প্রান্তিক ভাই। রেহানা সুন্দর, ভীষণ সুন্দর তার অন্তর ও বাহির। কিন্তু কোন দিনই কেন, আপনার প্রশংসায় তা ধন্য হতে পারল না। কেন আপনি ভালবেসে সামান্য কাঁচের চুড়িটাও পড়িয়ে দিলেন না তার হাতে? শুধু লজ্জা? না জীবনের খাতে বয়ে চলেছে অন্য কিছু, যে দ্বিধা কাঠিয়ে উঠতে পারেন নি আজো আপনি। মনে রাখবেন ভাঙতে চাইলেই কিন্তু ভাঙা যায় না। তার জন্য জোরের দরকার। রেহানার জন্য সে জোরতো আজও আমার চোখে ধরা পড়ল না প্রান্তিক ভাই। একটা কথাতো মানবেন, আমার মতো সে তার দাবী প্রকাশ করতে পারে না কোনদিন। অন্য দিকে নিজের সৌন্দর্যে আমি প্রভাবিত করবার চেষ্টা করি অন্যকে। চাই আমাকে কেউ তারমত করে সাজিয়ে দিক। যদি না পাই দাবী করার জোরটুকু দেখাতে পারি। কিন্তু ও তা পারে না। এই না পারাটা আপনি কেন পুষিয়ে দিলেন না।
আমি আর সহ্য করতে না পেরে বললাম, তুমি থামবে? সেলিনা বলল, থামব কেন? আপনার মন যে কখনো কারো প্রতি দুর্বল হয় নি একি আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? তারপর বলল শুনুন, ধর্মীয় নেতারা প্রিন্সিপালকে জানিয়ে ছিলেন, আমাদের সঙ্গে শুধু আপনি নন আপনার প্রিয়জনদের মেলামেশা তারা ভালভাবে নিচ্ছেন না। আপনাকে যেন এই পথ থেকে বিরত করা হয়। আর রেহানার ক্ষেত্রে তাদের আর্জি ছিল, যদি সে আপনার সঙ্গে মেলা মেশা বন্ধ না করে সামাজিক ভাবে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা জারী করবেন আমাদের পরিবারের উপর। না হলে প্রিন্সিপালকে বাধ্য হতে হবে রেহানাকে কলেজ থেকে নাম কেটে দিতে অথবা ট্রান্সফার সার্টিফিকেট ইস্যু করতে। তারপর বলল, যদি আমাদের পরিবার কোন উচ্চবিত্ত পরিবার হতো, হয়তো সবকিছুকে অবজ্ঞা করা যেতো, আমাদের দেশে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বাস করেও এমন যে ২/১টি ঘটনা কোথাও ঘটেনি তাতো নয়, কিন্তু প্রান্তিক ভাই তারাতত কেউ সমাজের উপর নির্ভরশীল নন। তাই সমাজ কিংবা ধর্মীয় ফতেয়া তাদের কাছে মূল্যহীন। কিন্তু আমরা, আমাদের মত পরিবার, পাশে এসে দাঁড়াবার মতো যাদের কেউ নেই, তাদের তো ধর্মীয় নিয়ামকদের ফতোয়া অস্বীকার করার খুব একটা উপায় থাকেনা। তাছাড়া আমাদের সমাজ তো দেড় হাজার বছরের ধ্যান ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। সেখানে আপনার বা রেহানার দাবীতে অনেক বেশী তাই।
পাশাপাশি ডালিমের চিঠি। কি ভয়ংকর হুংকার। আর কি কুরচিকর ইঙ্গিত। হ্যাঁ প্রান্তিক ভাই আমিও আপনাকে ভালবাসি। সেই যেদিন প্রাচীর পাশের একটি রেষ্টুরেন্টে পর্দা ঘেরা কেবিনে টিফিন খাচ্ছিলাম, সেদিন থেকে ভাল লেগেছিল আপনাকে। মনে মনে চেয়েছিলাম, আপনার সম্মোহনী দৃষ্টি খুঁজে ফিরুক আমার অন্তরের অন্তঃস্থল। বাইরের রূপ দিয়ে বিচার করলে ডালিম অনেক সুন্দর। তবু ও আমাকে কোন দিন আকর্ষণ করতে পারেনি। কিন্তু প্রথম দিন থেকে আপনি আমাকে চুম্বকের মত টেনেছেন আপনার কাছে। জানি এ সম্ভব নয়, কিন্তু মনতো মানে নি। তাই যে কোন ভাবে আপনার দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছি আমার দিকে। কখনো নিজের দেওয়া ফুলে বলেছি আমার বেনী সাজিয়ে দিতে, কখনো আপনার দেওয়া ফুলে সাজিয়েছি নিজের করবী। একি শুধুই খেয়াল? কখনো কি চাইনি এসবের মধ্যে আপনার নাগালের মধ্যে আসতে? বুকে হাত দিয়ে বলুনতো কখনো কি আপনার মনে হয়নি এরূপকে ভালবাসা যায়? মনের নাগালতো পাওয়া যায় না প্রান্তিক ভাই? কাছ থেকে তপতীদির সুগভীর ভালোবাসা দেখেছি আমি। পরে অবশ্য জেনেছি আপনাকে না পেয়ে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন, আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছেন, অন্যত্র নিজের সাধনায় নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে। কেন অস্বীকার করবো, নীলাঞ্জনা পিসির জন্য যে শাড়ীর রং আপনি পছন্দ করেছিলেন, পিসি সেই শাড়ীতে আমায় শুধু সাজালেন, আমার পছন্দ করা গয়না দিয়ে সাজালেন আমাকে বলতে চান সেখানে, আমার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পিসির কোন গোপন ইচ্ছে ছিল না? যদি না থাকতো তা হলে কিছুতেই বলতেন না যে ভাবে মডার্ন হয় সেভাবে তো সাজিয়ে দিতে পার। আপনি হয়তো ভেবেছিলেন সন্ধ্যার ফুল দুটো ফেলে দিয়ে আপনি আমায় ভুলে থাকতে পারবেন? তা হয়না প্রান্তিক ভাই। কেন ফেলে দিয়েছিলেন জানেন আসলে ভীষণ ভীষণ দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন আপনি, তা না হলে অন্তত বলতেন, সত্যি সেলিনা খুব ভালো লাগছে তোমাকে। যেদিন মিনতি পিসির দেওয়া উপহারে নিজেকে সাজিয়ে এসে ছিলাম আপনার কাছে, বলে ছিলাম কেমন লাগছে বলুনতো। এড়িয়ে গেলেন এই বলে যে, যার দেওয়া উপহারে তুমি সেজেছে, বলার কথা তো তার? হায় অবোধ পুরুষ মন, এমন দুর্বল আপনি ভাবিনি কখনো।
