আমি বললাম, ওরা আমাকে দুর্বল ভাবে। আপনারাও হয়তো তাইই ভাবেন। সেলিনাতো মাঝে মাঝে প্রায়ই ঠাট্টা করে বলে যে, ওর বক্সিং রিং-এ গিয়ে ওকে নক আউট করতে। এরা প্রত্যেকেই আমার বাইরের দুর্বলতাটুকু দেখে এসব কথা বলতে সাহস পায়। তাদের আমি এই কথাটা বলতে চাই যে পিসি, ওরা কেউই আমার ভিতরটাকে চেনে না। আমি সন্ধ্যা প্রদীপ যেমন জ্বালতে জানি, তেমনি জানি সে আগুনে কী ভাবে মশাল জ্বালিয়ে সব কিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া যায়। তারপর একটু থেমে বললাম কেউ কেউ বোধ হয় ভাবছে, এবার আমার হারার সময়। কিন্তু পিসি জীবনে কোন ব্যাপারে হারিনি, হারতে আমি জানি না। রেহানা আজ না হয় কাল সুস্থ হয়ে যাবে। ওর স্মৃতিশক্তিও ফিরে আসবে। ওর স্মৃতিশক্তি ফিরে আসুক ও ফিরে পাক ওর স্বাভাবিক জীবন। আপনাকে তো সব বলেছি ওর কথা। জীবনের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে গেছে যে মেয়েটি, যে কিছুই দাবী না করেও আমার সমস্ত দেওয়াটাকে উজাড় করে নিয়ে গেছে, যে মিশে আছে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, তাকে কি করে অস্বীকার করব? না তা আমি পারবো না। তাছাড়া তাকে বোঝাবার অবকাশ থাকলেও, আজ আর তা সম্ভব নয়। তারপর প্রসঙ্গ বদলে মিনতি সেনকে বললাম, পিসি ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্য সাহেবকে বলবেন আমি তার অবসরটা গ্রহণ করছি?
অবাক হয়ে তাকান মিনতি সেন ও সেলিনা। এ আমি কি বলছি। মিনতি সেন বললেন তুমি কি বলছ তুমি কি তা জান? জানি পিসি, একদিন বুকে তুলে নিয়ে ছিলেন আমাকে এবং রেহানাকে। আজ যদি নামিয়ে দিতে চান, নীরবে সরে যাব কোন প্রতিবাদ করব না, শুধু অনুরোধ পিসি আমার ভালবাসাকে অপমান করবেন না। তারপর সেলিনার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমাকে উঠতে হবে, সেলিনা। চলুন প্রান্তিক ভাই, আমিও আসছি, তুমি যাবে আমার সাথে? সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাই ওর দিকে। বা একথা বলছেন কেন? আমিতো আপনার সাথেই এসেছি। হ্যাঁ এসেছে তাই বলে আমার সাথে যে যেতে হবে এমনতো কোন কথা নেই। মিনতি সেন বললেন আমি বুঝতে পারছি না প্রান্তিক তুমি কি বলতে চাইছো। তোমাকে আমি অপমান করব কেন? তুমি কি বোঝনা, আমার হৃদয়ের কোন জায়গায় তোমার স্থান। তাছাড়া বাবার নির্দেশে তার যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী আমি। কিন্তু আমি যদি তা না নিই তা হলে এ সম্পত্তির যাবতীয় অধিকার তোমার ও রেহানার এ তো বাবার আদেশ। তাহলে কিসের জন্য তোমার এই হতাশা। কিসের অভাব তোমার? হা বুঝতে পারছি, তুমি কোন কোন জায়গা থেকে হয়তো এমন ব্যবহার পেয়েছে যা তোমার সমস্ত চিন্তাকে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছে, একদিনতো তোমরা ছোট হয়েও আমাকে তোমাদের মায়ের স্থানে বসিয়ে সন্তানের মত উপদেশ দিয়েছে, আজ কি তবে মনে করব, সে শুধু তোমাদের অভিনয়। আমি তোমাদের কেউ নই?কায়া বুঝি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল ভিতর থেকে তা দমন করে কোন ভাবে বললেন, ঠিক আছে চলে যাও তুমি আমার কাছ থেকে। আর কোন দিন এসোনা আমার কাছে। বাবার আদেশ অনুসারে খুব তাড়াতাড়ি তার যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানার ছাড়পত্র তোমার কাছে পৌঁছে দেব। আবেগ আর অবুঝ যন্ত্রণায় তার গলা বুজে আসতে চাইছে, কোন ভাবে টলতে টলতে পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি তাকে বাধা দিতেও পারলাম না। সেলিনাও কি জানি কোন কিছু না বুঝেই হয়তো চুপ করে ছিল।
হতাশায় ভেঙে পড়ে উঠে পড়েও আবার বসে পড়লাম চেয়ারে। বেচারা সেলিনা। কি যে করবে বুঝতে পারছেনা। বার বার মন চাইছে আমাকে সান্ত্বনা দিতে। কাছে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু কোনটাই করতে পারছে না এ কোন সেলিনা। আমি আস্তে আস্তে উঠে–দরজায় আঘাত করে ডাকি মিনতি সেনকে। পিসি দরজা খুলুন। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না কত গভীর অভিমানে আপনাকে একথা বলেছি আমি? কেন বুঝতে পাবছেন না, আমার অভিমান করার আর কোন জায়গা নেই। একে একে এক ছিন্নমূল উদ্বাস্তুর মত আমার সব শিকড়গুলো যে ছিন্ন হয়ে গেছে পিসি। যদি বলেন, না অভিমানেও আপনাকে কিছু বলবার অধিকার আমার নেই, আমি চলে যাচ্ছি পিসি আর কোনদিনই আসব না। তাই বলে স্বার্থপরের মতো আপনার উপেক্ষার দান আমি গ্রহণ করব, এ আপনি ভাবলেন কেমন করে? সত্যি করে বলুনতো আমাদের জন্য কি কোন মমতা নেই আপনার হৃদয়ে?
কেন যে অবুঝ কান্না এমন করে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল কে জানে। আমি টলতে টলতে বেরিয়ে যেতে চাইলে, সমস্ত দ্বিধা এক পাশে সরিয়ে রেখে সেলিনা আমাকে ধরে ফেলে বলল, এভাবে কোথায় যাচ্ছেন প্রান্তিক ভাই। আমি জানিনা কে আপনাকে অপমান করেছেন। যদি কেউ করেও থাকেন, তাই বলে তার অভিযোগ গুলোকে সত্য বলে মেনে নিতে হবে। আমার মা হয়তো আপনাকে অনেক ব্যাপারে আঘাত দিয়েছেন, তার দেওয়া আঘাতটাই কেবল মাত্র সত্যি, আর তার দীর্ঘদিনের ভালবাসার কোন মূল্য নেই? কেন আপনাকে তিনি আঘাত দিয়েছেন আপনি বোঝেন? তারপর নিজেই বলে চলল, না ববাঝেন না প্রান্তিক ভাই। একটু খানি থেমে আবারও বলে চলে, যদি কোন মা, আবার তিনি যদি কিছু পুরোনো মূল্যবোধে বিশ্বাস করে থাকেন আর দেখেন যে, আপনার সঙ্গে সম্পর্কের জন্য তার মেয়েরা নানা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে যাচ্ছে, মায়ের কাছে তার সন্তানের থেকে তো বড় কেউ নেই। তাই তাদের মঙ্গলার্থে আপনার সরে যাওয়াটা যদি চেয়েও থাকেন, সেটাই বড়? আর সন্তান স্নেহে, নিজের না থাকা ছেলের অধিকারে যখন তার হৃদয়ে আপনাকে স্থান দিয়েছেন, তার কোন মূল্য নেই, একবার তার মনের অবস্থা বুঝতে চাইলেন না কেন? কেন আপনি বুঝতে চাইছেন না তাকে এড়িয়ে যাওয়াটা তার কাছ থেকে আরো দূরে সরে যাওয়া। রেহানা যেমন আপনার কোথায় ব্যথা বোঝে। তেমনি অন্যরাও অনেকেই বোঝে। কিন্তু ফারাকটা কোথায় জানেন? যে সমাজে আমরা বাস করছি। সেই সমাজটাতো এখনো আপনাদের মানসিকতার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শুধু ডালিমদের চিঠিটাকে বড় করে দেখছেন কেন? আপনি কি জানেন, কেন প্রিন্সিপাল সাহেব রেহানাকে ডেকে আপনার সঙ্গে তার সব সম্পর্ক ত্যাগ করতে বলেছেন। আমি জানি তা আপনি জানেন না। জানবেন কি করে, রেহানাতো তা আপনাকে বলবেনা কোন দিন। যদি আপনি আঘাত পান। যদি আপনি ভুল বোঝেন?
