হ্যাঁ ৭২ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরেছে রেহানার কিন্তু স্মৃতিশক্তি ফেরেনি। রেহানা কাউকে চিনতেই পারছেনা। শুধু আমি কাছে গেলে আমার হাতটা ধরে চুপ করে থাকে আর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মিনতি সেন যখনই সময় পান আসেন। কিছুক্ষণ থাকেন। আমাকে ও সেলিনাকে সাহস দিয়ে চলে যান। একদিন এসেছিল অশ্রুকণা। তখন আমি আর সেলিনা পাশাপাশি বসে আছি। সেলিনা বলল সব সময় আপনি এমন চুপ করে থাকেন কেন প্রান্তিক ভাই। এত চিন্তা করেন কেন? বললাম, খুব খারাপ লাগছে। সব সময় শুধু নিজেকেই এই সমস্ত ব্যাপারের জন্য দোষী মনে হচ্ছে। তাই নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না। ও বলল এ ভাবে সব সময় ভাবলে যে, আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। গম্ভীর হতাশায় বলে উঠি আত্মহত্যা পাপ, তা না হলে যে কোন মুহূর্তে আমি আমার নিজের জীবন শেষ করে দিতাম। ছিঃ প্রান্তিক ভাই এ ভাবে কথা বলতে নেই। আমি বললাম আচ্ছা সেলিনা, কেন এমন হয় বলত। কি? এই যে অভাব বোধ, এই যে শূন্যতা, জীবনের সবকিছু যেন মরুভূমি। মনে হয় এ জীবন নিয়ে কী করব আমি?
সেলিনা বুঝতে পারে সব, বলল ভিজিটিং আওয়ার তো দেরি আছে, চলুননা কোথাও থেকে ঘুরে আসি। কোথায়? যে কোন জায়গায়। আচ্ছা চল। তারপর আমরা যখন বেরিয়ে পড়ব বলে উঠে পড়েছি তখন এল অশ্রুকণা, বলল, তোমরা কোথাও যাচ্ছ? সেলিনা বলল না অশ্রুদি। ভিজিটিং আওয়ারতে দেরি আছে তাই প্রান্তিক ভাইকে বললাম, একটু ঘুরে আসা যাক। বেশ তোমরা ঘুরে আসো। আমি আছি এখানে যদি প্রয়োজন হয়। আমি বললাম, কণা তুমি বরং সেলিনাকে নিয়ে একটু ঘুরে এসো, আমি থাকছি? সেলিনা বলল, ভিজিটিং আওয়ারের আগেতো কোন প্রয়োজন নেই, বরং আমরা তিনজনেই যাই চল অশ্রুদি, ও বলল তোমরা যাও সেলিনা। আমি কিছু ভাবব না। তারপর বলল, একদিন আমার অসুস্থ শিয়রে ঘন্টার পর ঘন্টা কাঠিয়েছে রেহানা, তার কিছু ঋণ অন্তত শোধ করতে দাও। আমি বললাম, বেশ, তুমি তাহলে থাক এখানে। তবে আমরা না ফেরা পর্যন্ত চলে যেও না। ও বলল আচ্ছা থাকব। অশ্রুকণা কে একা রেখে আমরা বেরিয়ে আসি।
এ রাস্তা সে রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় আমরা ভিক্টোরিয়ার কাছে চলে এলাম। সেলিনা বলল, যাবেন ভিতরে? না থাক। তাহলে কোথাও বসা যাক। বেশ চল ওই গাছার নীচে বসবে। চুপ চাপ বসে আছি। কোন কিছুই ভাল লাগছেনা। শুনেছি আফরোজ বেগম রেহানার এই অবস্থার জন্য পুরো পুরি আমাকেই দায়ী করছেন। আমি নিজেও তাই মনে করি। সুতরাং আফরোজ বেগমের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। সেলিনা বলল প্রান্তিক ভাই, আমি হয়তো রেহানা নই, তবু কি আপনার দুঃখ আমি ভাগ করে নিতে পারি না? নিশ্চয়ই পার। উজ্জ্বল চোখে তাকালো সেলিনা আমার দিকে। বলল, তবে কেন আপনার দুঃখের বোঝা আমার উপর নামিয়ে দিতে আপনার এত আপত্তি। কোন আপত্তি নেই সেলিনা। কিন্তু যদি বুঝতাম এ দুঃখ বয়ে বেড়াবার শক্তি আমার নেই। তারপর বললাম আচ্ছা বলত সেলিনা, সে দিন মিনতি পিসি কি একটা চিঠির কথা বলছিলেন। কি ব্যাপার? আপনি জানেন না? গভীর বেদনায় বললাম আজ কালতো আমি অনেক কিছুই জানিনা সেলিনা। আমাকে জানানো হয় না। কেন জানানো হয় না জানেন না। তাহ, আপনার দুঃখের বোঝা বাড়তে পারে। হঠাৎ করে জানতে চাইলাম আচ্ছা রেহানা এই অবস্থার জন্য তোমার দুঃখ হয় না? কি করে বোঝাব প্রান্তিক ভাই, হয়তো আপনিও কোনদিন বুঝবেন না। হয়তো রেহানার এই অবস্থা না হলে আমার পক্ষে যা সম্ভব ছিল, আজ আর তা সম্ভব নয়? বললাম কিছুই বুঝতে পারছি না ব্যাপারটি কি? ও বলল থাক আপনার বুঝতে হবে প্রান্তিক ভাই। তারপর বলল মিনতি সেনের বাড়ীতে কাল একবার যেতে বলেছেন। কিন্তু আমিতো চিনিনা। যাবেন আপনি আমার সঙ্গে? আমি অবাক হয়ে তাকাই ওর দিকে।
এসব কোন কথাই আমি জানিনা। কেন যে মিনতি পিসিও আমার ওপর বিশ্বাস বাখতে পারছেন না কে জানে, তবু বললাম নিশ্চই যাব সেলিনা কখন যাবে তুমি? দুপুরে যেতে বলেছেন, উত্তরে জানায় সেলিনা।
আমরা যখন মিনতি সেনের বাড়ীতে এসে পৌঁছিয়েছি তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। মিনতি সেন সবে মাত্র ঘরে বিশ্রাম নিতে গেছেন, জবার মা আমাদের রসার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন, বললাম পিসী কখন উঠবেন? ডেকে দেবো? না থাক কখন উঠবেন তাই বল না। উনি শুয়েছেন কিন্তু ঘুমাননি, আপনারা বরং উপরে আসুন।
আমরা উপরে গেলাম। মিনতি সেন শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন। তারপর সেলিনাকে বললেন, তোমার চিঠিটা ভাল করে পড়েছি। পড়ে তোমার যেমন সন্দেহ হয়েছে আমারও খানিকটা সেই রকম সন্দেহ হয়েছে।
আমি অবাক হয়ে ওদের কথা শুনছিলাম, তারপর বললাম, পিসি চিঠিটা কি আমি পড়তে পারি? মিনতি সেন চিঠি আমার হাতে এনে দিলেন, বললেন পড়া হয়ে গেলে আমাকে ফেরত দিও। চিঠিতে কোন সম্বোধন নেই। তবে তা যে রেহানাকে লেখা হয়েছে বুঝতে অসুবিধা হয় না। লিখেছে সেদিন তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যে ভাবে তুমি একটি বিধর্মী ছেলের পিছনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে বসে আছে, তাতে ক্ষমা তোমাকে করা হবে না। আমার জেল হয়েছে বলে মনে করোনা আমি শেষ হয়ে গেছি। এখনতো দেখছি তোমরা দুজনেই ছুটেছে এক জনের পিছনে। ছিঃ তোমাদের রুচিবোধের। ঘৃণা করি তোমাদের এই বেলেল্লাপনার। কি আছে ওর মধ্যে। ও ছাড়াকি আর কোন ছেলে নেই। ভাল ভাবে বলছি এখনো সময় আছে। পিছিয়ে এসো না হলে সুযোগর অপেক্ষায় রইলাম। না ইতি বা সম্বোধন কোনটাই নেই। চিঠিটা পড়া হলে মিনতি পিসির হাতে দিয়ে বললাম, এ চিঠি দিয়ে আপনি কি করবেন? আবো বললাম, এক কাগুঁজে বাঘের প্রতিশোধ স্পৃহা ওর কি কোন মূল্য আছে? তার থেকে একটা কাজ কর না পিসি? কি? ডালিমদের ১০ বছরের জেলটা দেখুন না আরো কমিয়ে এনে দু-একবছরে করে দেওয়া যায় কীনা। অবাক হয়ে মিনতি সেন বললেন কি বলছ তুমি? বেশ ভীত হয়ে বললেন এতটা পৌরুষের অহংকার ভাল না প্রান্তিক।
