পরীক্ষা করে দেখা গেল আঘাত যতটা কম ভাবা হয়েছিল আসলে তা নয়। পড়ে গিয়ে মাথায় ভাল চোট লেগেছে। আর তাতেই জ্ঞান হারিয়েছে। এখন জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত কোন কিছুই বলা যাবে না।
আমি চিন্তান্বিত হয়ে একটা চেয়ারে বসে আছি। তপতী বলল এত ভাবছ কেন? দেখ কিছুই হয় নি। আমার কিছু বলার নেই শুধু ভাবছি মিনতি সেনকে একটা ফোন করতে হবে। সেলিনা নয়, আফরোজ নয়, প্রথমেই যার কথা মনে পড়লে, তার নাম মিনতি সেন। ফোন পেয়ে ছুটে এলেন উনি। এসেই যে কাজটি করলেন, তা হল হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে দক্ষিণ কলকাতার এক বিখ্যাত নাসিংহোমে ভৰ্ত্তি করে দেওয়া হল। আর অর্থপেডিকের সব থেকে বড় ডাক্তাব ডাঃ পালকে কল দিলেন। তিনি এলেন দেখলেন, তারপর বললেন, মিস সেন এখনিতো কিছু বলতে পারব না। অন্তত ৭২ ঘন্টাতো অপেক্ষা করতে হবে। যাই হোক মিনতি সেন বললেন তুমি এক কাজ কর প্রান্তিক। ওর মা বা বোনকে সংবাদ দাও। ওদের আসা দরকার।
আফরোজ বেগম এলেন না, কিন্তু সেলিনা এল। বলল, কি হয়েছিল প্রান্তিক ভাই। আমি আনুপূর্বক সব ঘটনা খুলে বলতে, বলল বুঝলাম ডালিমরা ওকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। আমি অবাক হয়ে বললাম ডালিমরা তো জেলে। কি বোকা আপনি প্রান্তিক ভাই। জেলে তাতে কি হয়েছে? ওদের লোকেরাতো বাইরে আছে? তুমি চেনো নাকি তাদের? না চিনি না, তবে ডালিমদের জেল হওয়ার কয়দিন পরে ওর নামে একটা চিঠি আসে। রেহানাকে জিজ্ঞেস করাতে ও চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল। আমি ধমক দিয়ে বললাম তোর এই প্যান প্যানানি ভাল লাগেনা রেহানা। এ তোর ভারি খারাপ স্বভাব। সব কিছুতেই হতাশা আর কান্না। কিন্তু প্রান্তিক ভাই চিঠিটা পড়তেই আমার ভিতরে জেগে উঠলো এক তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা। আমি ওকে বললাম তোকে যেতে হবে আমিই যাব। বললাম সেতো বুঝলাম। কিন্তু কে লিখেছে চিঠি, কি লিখেছে তাতে।
সেলিনা বলল, চিঠিটা ডালিমের লেখা ও প্রেসিডেন্সি জেল থেকে মেদিনীপুরের একটা জেলে বদলি হয়ে যাচ্ছে, সেই সময়কার লেখা। সেলিনা বলল নিজের জিনিষ রক্ষা করতে পারেন না অথচ অধিকারের এ অহংকার কেন? আজ যদি ওর কিছু হয়ে যায় কি করবেন? কেউতো আসবে না আপনার জীবনে। মনের অবস্থা খুবই খারাপ, তবু বললাম বাংলাদেশে কি মেয়ের অভাব আছে? না নেই কিন্তু যারা আছে, তারাতো কেউ রেহানা নয়। বললাম, নাইবা হল রেহানা, সেলিনা হতে তো তাদের আপত্তি নেই।
এত বড় শ্লেষ। অথচ কোন প্রতিবাদ না করে চুপ করে রইল, সেলিনা। বললাম চল, রোগিদের জন্য সাক্ষাৎ প্রার্থীদের বসার ঘরে গিয়ে বসা যাক। সংবাদ পেয়ে এক সময় নীলাঞ্জনা পিসি এলেন। ভাবিনি, সংবাদও দিইনি। মনে হয় সেলিনার কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে এসেছেন। উনি আমাকে কিছুই জিজ্ঞাস করেননি। শুধু বললেন মিথ্যে চিন্তা করো প্রান্তিক। আমরা তো আছি। পিসির এই একটি মাত্র কথা কত যোজন দূরত্ব যেন কমিয়ে দিল আমার আর পিসির মধ্যে। আমি ঐ জনসমক্ষে পিসিকে জড়িয়ে ধরে বললাম পিসি। আমাকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কোন রকম চেষ্টা না করে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন ও তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে, কোন চিন্তা করো না।
মিনতি সেন ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেবিয়ে এলেন, এই প্রথম মুখোমুখি দেখা মিনতি সেন এবং নীলাঞ্জনা পিসির। নীলাঞ্জনাই বললেন আপনি মিস সেন? নমস্কার। আমি নীলাঞ্জনা, প্রান্তিকের পিসি। চিনি আপনাকে অবশ্য নামে। একদিন গিয়েছিলাম। বললেন থাক ওসব কথা। ডাক্তার কি বললেন? উনি কিছু বলেননি, তারপর সেলিনাব দিকে তাকিয়ে বললেন তুমিতো সেলিনা? হ্যাঁ একবার এস আমার সঙ্গে। সেলিনা নীরবে তাকে অনুসরণ করলো। ডাক্তারের চেম্বারে লোকাল থানার অফিসার ইনচার্জ আছেন তিনিই কথা বললেন। উনি আই মীন পেশেন্ট আপনার দিদি? হ্যাঁ, কিন্তু আমাকে আপনি তুমি করেই বলবেন। মিনতি সেন সায় দিয়ে বললেন, ঠিকই তো। মিঃ চোধুরী, ওতো আপনার মেয়ের বয়সী আপনার মেয়ের মতন, ওকে আপনি তুমিই বলুন। ঠিক আছে বললেন থানার বড়বাবু। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা তোমার কি কোন সন্দেহ হয় এই এক্সিডেন্ট উদ্দেশ্য প্রণোদিত কীনা। আমিতো ঘটনা স্থলে উপস্থিত ছিলাম না, তবে যারা ছিলেন, তারা বলেছেন ইচ্ছে করেই মটর সাইকেল ওকে ধাক্কা দিয়েছে। বড় বাবু বললেন যদি তাই হয়, তা হলে তুমি কাকেও সন্দেহ করো? হা করি? কর? কাকে?
সেলিনা তার ব্লাউজের নীচ থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করে বড়বাবুকে দিতে গেলে মিনতি সেন নিজে নিলেন। মিনতি সেন চিঠিটা পড়ে চমকে ওঠে থানার বড়বাবুকে বলেন মিঃ চৌধুরী এই চিঠিটা এখনি আপনাকে দেওয়া যাবে না। এভিডেন্স হিসাবে পরে কাজে লাগতে পারে। আপনাকে বরং একটা জেরক্স কপি দেব। তারপর সেলিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই চিঠি তুমি কবে পেয়েছে। বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। আমাকে জানাওনি কেন? যদিও রেহানা তাকে এই চিঠির কথা কাউকে বারবার না করেছেন বলতে, কিন্তু সে সব চেপে গিয়ে সেলিনা বলল, চিঠিটাকে আমি কোন গুরুত্ব দিতে চাইনি তাই আরকি। মিনতি সেন বললেন, ঠিক আছে। বড়বাবু আবার জানতে চাইলেন সেলিনার কাছে তাহলে কাকে তুমি সন্দেহ কর। মিনতি সেন বললেন ও ছেলেমানুষ। উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করে তালগোল পাকিয়ে দেবেন না। আরো বললেন, আমার মনে হয়, এর পিছনে একটা গভীর ষড়যন্ত্র আছে। আমি আপনাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করব মিঃ চৌধুরী। আপনার যদি ওকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকে তাহলে করতে পারেন। না না আর কিছুর দরকার নেই মিস সেন। আপনি বরং কমিশনার সাহেবকে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে রাখুন। ওনার কাছ থেকে মূল্যবান ইনস্ট্রাকসান এলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হয়। কিন্তু তার থেকেও আগে দরকার, ওর সুস্থ হয়ে ওঠা। ডাঃ পালকে তাই বললেন, আপনি একটু দেখুন ডাঃ পাল যাতে মেয়েটি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। ডাঃ পাল বললেন আমি ডাক্তার, আমার কর্তব্য মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়। কিন্তু ৭২ ঘন্টা না গেলে আমি কোন কথাই বলতে পারবো না। এটা এমন এক সিদ্ধান্ত যার বিরুদ্ধে সরব হওয়া যায় না।
