ভেবেছিলাম, রেহানাই বলবে, কেন প্রিন্সিপাল তাকে ডেকেছিলেন, কিন্তু বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল ও কোন কথাই বলল না। কেন বলল না আমাকে কি ওর সন্দেহ হয়? না আমাকে আর আগের মত বিশ্বাস করতে পারছেনা। মন জানতে চায় ওর কথা। কিন্তু আমারও যে কি হয়েছে, কে জানে? তবে কি আমিও মনে মনে ওর কাছ থেকে সরে আসতে চাইছি!
একটা অফ পিরিয়ড। ওরও অফ। বললাম চলনা এ সময়টুকু কোথাও থেকে ঘুরে আসি। বলল, তুমি যাও প্রান্তিক আমার ভাল লাগছেনা। কেন কি হয়েছে তোমার? একদিন বাড়ীতে এসো বলব। বাড়ীতে? বাড়ীতে বলতে পারবে? কেন তোমাকে কি বাড়ীতে কোন কথা কোন দিন বলিনি? বলেছ। কিন্তু সেদিনগুলো কি আর আছে আমাদের? কেন নেই কেন? আমার তো মনে হয় না কোন কিছু হারিয়ে গেছে। তাই যেন হয় রেহানা। ও হঠাৎ বলল তোমার কি হয়েছে বলত। কেন? আজ কাল কিছুই জিজ্ঞেস করো না আমাকে। সব সময় কি যেন চিন্তা করো। সেলিনা তোমাকে কিছু বলেছে? সেলিনা আবার আমাকে কি বলবে? কিছুই বলবেনা? ওর কি কিছুই বলার নেই তোমাকে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, এ সব কি বলছ রেহানা। তুমি যেন আমার কাছে ক্রমশঃ রহস্যময়ী হয়ে উঠছে। আমি তো চিরদিনই রহস্যময়ী, শুধু তোমার কাছে কেন সকলেরই কাছে। তারপর নিজেই বলল, তোমার তো এর পরের ক্লাসটা আছে তাই না? হ্যাঁ। ফাঁকি দাওনা। কেন? চলনা ঘুরে আসি কোন জায়গা থেকে। কোথায়? যেখানে তোমার ইচ্ছে। তুমি কি ঠাট্টা করছ? তোমার সঙ্গে যাব এতে আবার ঠাট্টার কি হল? আচ্ছা কোথায় যেতে চাও। গড়ের মাঠে। বেশ চল। তাতে কিন্তু সারাদিনের ক্লাস ফাঁকি দিতে হবে। তাই দেব।
এ এক নতুন রেহানা। এ যেন কোন কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আমরা এলাম গড়ের মাঠে, মাথার উপর চড়া রোদ। শীতকাল তাই রোদটা যেন প্রেমিকার কবোষ্ণ পরশ। আমরা শুধু হাঁটতে লাগলাম। কোথাও যেন আমাদের বসার জায়গা নেই। ও বলল, আর পারছি না প্রান্তিক। একটু খানি বসা যাক। বেশ ঐ গাছটার নীচে চল। আমরা পাশাপাশি বসলাম। হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠে কে যেন তার সঙ্গীকে বলছে, দেখ কেমন কপোত কপোত বসে আছে আর তোমার সবতাতেই লজ্জা। রেহানার কানে যেতেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। বলল, চল আর বসবনা। আমি বললাম, এই গড়ের মাঠে হয়তো আরো অনেক কথা শুনতে হবে, তার থেকে চল, তপতী একদিন তোমাকে দেখতে চেয়েছিল ওর ওখানে যাই।
০৯. মেয়েলি কণ্ঠস্বর
মেয়েলি কণ্ঠস্বর আরো কাছে এগিয়ে এল। তাকিয়ে দেখি তপতী। সঙ্গের ছেলেটি নিশ্চয়ই সৌমেন্দ্র। বললাম তুমি? আবে তুমি প্রান্তিক একদম ভাবতে পারিনি। বাদাম খাবে? বলে অপেক্ষা না করে নিজেব বাদামেব ঠোঙাটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি ওটা নিয়ে বললাম, তোমার ওখানেই যাব ভাবছিলাম। তাই বুঝি। হাসল ও। হাসলে যে। না এমনি। তারপর রেহানার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বুঝি বেহানা? রেহানা এর কি উত্তব দেবে বুঝতে না পেরে চুপ করে বইল। তপতী বলল, জিজ্ঞাসা করলে না তো ছেলেটি কে? আমি নমস্কার করে বললাম নিশ্চয়ই সৌমেন্দ্র। সৌমেন্দ্র হাসল। তা হলে তুমি চিনতে পেরেছে? বললাম, আমি আমার ভুল স্বীকার করে নিয়েছি তাহলে আবার লজ্জা দেওয়া কেন? সৌমেন্দ্র বলল। চল না গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসা যাক। আমি বললাম তোমরা যাও, একবাব নিউসেক্রেটারিয়েট যেতে হবে। সেখানে কেন? একজনের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট আছে, সে অপেক্ষা করবে। তপতী বলল তার থেকে বল না এই মুহূৰ্ত্তটুকুকে তুমি হারাতে চাও না। তারপর রেহানাকেই উদ্দেশ্য করে বলল তোমার কথা অনেক শুনেছি। সেলিমাব ওখানে প্রথম প্রথম দুএক দিন দেখেছিও। কিন্তু তখনতো চিনতাম না। যাবে গঙ্গার ঘাটে? তোমার গল্প শোনা যাবে। ও আস্তে বলল, আমার তো কোন গল্প নেই তপতীদি। ও ঠাট্টা করে বলল সব বুঝি একজনকে সঁপে দিযেছো। ভাবছিলাম কি উত্তর দেবে একথার। যা চাপা মেয়ে, বলল, সঁপে দিতে আর পারলাম কই? আজও বুঝতেই পারলাম না, ওর মনের মধ্যে আমার কোন জায়গা আছে কি না। আমি অবাক হয়ে তাকালাম রেহানার দিকে। বলে কি? তপতী হাসল। সত্যিইতো, যে ছেলের মন জুড়ে শুধু একজন, তারতো এ সন্দেহ হবেই। না তপতীদি তুমি ঠিক বলনি। ও নিজেও জানেনা ওর মনের মধ্যে সত্যিকারের কাবো জায়গা আছে কি না। তপতী ভীষণ অবাক হয়ে বলল, কোন কিছু নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে? তবুতো সময় কাটতে, ভুল বোঝাবুঝিটা সত্যি কি না যাচাই করে দেখা যেত। কিন্তু ওতো পাষাণ। ওর মন বা হৃদয় বলে কিছু আছে নাকি? কঠিন ভীষণ কঠিন এ আঘাত।
রেহান যে এমন কথা কারোর সঙ্গে বলতে পারে তা কল্পনারও অতীত। তাও স্বল্প পরিচিত কারো সঙ্গে। এবার তপতী সিরিয়াস হয়ে বলল কি হয়েছে প্রান্তিক, ব্যাপার কি? ঝগড়া করেছ নাকি। অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ একটা দ্রুতগামী মটর সাইকেল ইচ্ছে করে রেহানাকে চাপা দিয়ে বেরিয়ে গেল। মাগো বলে পড়ে গেল রেহানা। তপতী ও সৌমেন্দ্র এগিয়ে এসে ধরা ধরি করে দেখে এমন ভাবে ধাক্কা দিয়েছে যে ডান হাতটায় প্রচণ্ড লেগেছে। পড়ে যাওয়াতে থেতলে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেছে। মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে গেছে রেহানা।
সৌমেন্দ্র বলল, একটু অপেক্ষা কর। দেখি কোন ট্যাক্সি পাই কীনা। অপেক্ষা করতে হলোনা, একটা দ্রুতগামী ফাঁকা ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল সৌমেন্দ্র। তারপর হাত ধরাধরি করে তুলে নিয়ে সোজা হাসপাতাল।
