আমি চুপ করে রইলাম। অশ্রুকণার এত কথার কোন উত্তর দিতে পারলাম না। জীবনের অনেক ছোট ছোট ঘটনা মনে হতে লাগল। রাগ অনুরাগ-মান, অভিমান-জেদ, ঈর্ষা। হাসপাতালের স্মৃতি, ফুল দুটো ছুঁড়ে ফেলাতে তার তীব্র অভিমান, সব কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল একেব পর এক। সেলিনার প্রতি পিসির আলাদা আকর্ষণ। পিসির বাড়ীর সবকিছুর প্রতি তার এক ধরণের অনুভূতি। অশ্রুকণার ইঙ্গিতে যেন নতুন মাত্রা পেল। ও বলল, কি ভাবছ? না ভাবছিনা কিছুই। এতক্ষণতো তোমার কথা শুনলাম। আমাকে একটু ভাবতে দাও। তারপর বললাম, বিশ্বাস কর কণা, আমি আলাদা করে কোনদিনই তোমাদের ভাবতে শিখিনি। তুমি, রেহানা, অনুতপা, টুম্পা, পিঙ্কি, সুমিত, সুব্রত, রাহুল এদের কাউকে বন্ধুত্বের বাইরে গিয়ে কিছু ভাবা ভাবনার অতীত ছিল আমার কাছে। তারপর কেমন করে যে ধীরে ধীরে রেহানা এসে গেল আমার জীবনে, চিন্তায়, মননে, কল্পনায়, কেমন করে যে সে তার নিঃশব্দ পদসঞ্চারকে আরো গতিময় করে তুলল, সে এক চরম রহস্য। কিন্তু সেলিনার মধ্যে খুঁজে পেলাম আমার কৈশোরে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া বোনের স্মৃতি। তার হাসি ঠাট্টার মধ্যে একটি নারীমন যে ধীরে ধীরে পাখা মেলতে পারে ভাবিনি। ও যখন বাগান থেকে ফুল তুলে আমায় বলতো, দিননা প্রান্তিক ভাই আমার বেনীতে গুঁজে, কখনো মনে হয়নি, তার ভিতর কোন প্রেমিকার আকুতি থাকতে পারে। আমার বোনটিও মাঝে মাঝে বলতো, দে-না দাদাভাই এই ফুলটা আমার চুলে গুঁজে। আমি গুঁজে দিয়ে তাকে বলতাম, তোকে ঠিক রাজকন্যার মত দেখাচ্ছে। সেলিনাকে সে কথা কোনদিন বলতে পারিনি, যদি অন্য অর্থ করে, তবুও ওকে সাজিয়ে দিতে গিয়ে আমার মনে পড়তো আমার বোনের কথা। হাসপাতালে তার কিছু কিছু দুর্বলতা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি কলা, তবু তাকে আমি অন্য কোন ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারিনি। শুধু সেদিনই প্রথম খটকা লেগেছিল, যেদিন পিসি ওকে পিসির জন্য কেনা আমার পছন্দ করা শাড়িতে সাজিয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় ওর খোঁপায় খুঁজে দেওয়া ফুল দুটো অবহেলায় ফেলে দিয়েছিলাম। দেখে ছিলাম সে দিন তার তীব্র অভিমান। রেহানাকে বলেছিল, ওতে নাকি আমি ওকে অপমান করেছি। আমি ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক হতে চেয়েছি, কিন্তু সেলিনা যেন কেমন অস্বাভাবিক হয়ে গেল আমার জীবনে। সব থেকে অবাক লাগে আফরোজ বেগমের এই পরিবর্তনে। কি চান তিনি আমি জানিনা। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে পড়তে চাইলাম। ও বলল আরেকটু বোস না। আমি বসলাম। সামনে বয়ে চলেছে গঙ্গা। জোয়ারের জলে কানায় কানায় ভরে গেছে সিঁড়ির খাদগুলো। আর একটু হলে পা ভিজে যাবে। ও তাকালো আমার দিকে। বলল। আমায় বিশ্বাস করতে পারবে প্রান্তিক, বলে ও বলল, আমার মনে হয় রেহানার কাছ থেকেও তোমার কাছে একদিন এ অনুরোধ আসবেই, সেলিনাকে গ্রহণ করার। কি করবে সেদিন? আমার সমস্ত অন্তরটা পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল। আমার এই ছোট . জীবনে ভালবাসা যে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে ভাবিনি কোনদিন। বললাম, আজ থাক কণা। যদি সত্যি সেদিন আসে, রেহানাকে পাবোনা জেনেও সেলিনাকে মেনে নিতে পারব না কিছুতেই। কেন পারবে না? সেলিনা তোমাকে সতি ভালবাসে প্রান্তিক সেদিনই তা বুঝেছিলাম, যেদিন রেহানার পরিবর্তে ও গিয়েছিল আমাদের ওখানে তোমার সাথে। যদি বুঝেছিলে তবে বললেনা কেন? ভাবতে পারিনি তুমি এত অন্ধ প্রান্তিক। বললাম তোমার কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে তো আমি সত্যিই অন্ধ। কখন যে সূর্য গড়িয়ে গেছে পশ্চিম আকাশে খেয়াল নেই। বললাম, কণা আজ মনে হচ্ছে কি জান? কি? তোমার থেকে বোধ হয় ওরা কেউ আমাকে বেশী ভালবাসে না। অশ্রুকণা আবারও আমার হাতটা তার হাতের মধ্যে নিয়ে আস্তে আস্তে তার মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে হাতেই একটা চুমু খেয়ে বলল, তোমার স্বীকৃতিটুকু আমি চিরদিন মনে রাখব প্রান্তিক। যদি কখনো তোমার জন্য আমার প্রয়োজন হয়, বলল, দাঁড়াবো তোমার পাশে এসে, করবনা তোমার বিশ্বাসের কোন অমর্যাদা। তাই বলে প্রত্যাঘাত দিতে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিওনা প্রান্তিক খারাপ লাগবে। আমি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালাম ওর দিকে। বললাম, মনে রাখব তোমার কথা, এবার বলত কেন প্রিন্সিপাল সাহেব ডেকেছেন রেহানাকে। সে তুমি ওর কাছেই জেনে নিও। তারপর বলল ও হয়তো বলতে চাইবেনা, যা অদ্ভুত চাপা মেয়ে। আর একটা কথা, সেলিনাকে এড়িয়ে চলো না, যত এড়াবে, ততই জড়িয়ে যাবে প্রান্তিক। একেবারে স্বাভাবিক ভাবে ওকে বুঝতে চেষ্টা করো। আমি বললাম তাই হবে কণা। কিন্তু তুমি আমায় একটা কথা বলবে? কি কথা? তুমি এসব জানলে কি করে? তোমাকে জানতেই হবে? হ্যাঁ। অশ্রুকণা বলল, জানতাম আমি একদিন তুমি আমার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবে। তারপর বলল, দরকার কি প্রান্তিক উৎসকে জানার, বরং অপেক্ষা করো একদিন রেহানাই হয়তো তোমাকে সব বলবে। আর কেউ জানে? হয়তো জানে। কে? মিনতি সেন। মিনতি সেন? মানে পিসি? যিনি রেহানাকে তার মেয়ের মতন ভালবাসেন। কেন বিশ্বাস হচ্ছে না। তা বলছিনা। কিন্তু আমায় তো উনি কিছুই জানালেন না। অশ্রুকণা বলল, এতো চিন্তিত কেন? হয়তো তিনি নাও জানতে পারেন। তবে আমার অনুমান তিনি জানেন এবং হয়তো একদিন বলবেনও তোমাকে। আর কেউ? অশ্রুকণা বলল, তোমাকে যা জানাতে চেয়েছিলাম, সবই জানিয়েছি আর কোন প্রশ্ন করোনা। শূন্য হৃদয় একদিন যে ভালবাসার আস্বাদ লাভ করে ছিল, ভেবেছিল এর কোন ক্ষয় নেই। কোন দুর্বল মুহূর্তে তা যে ক্ষয়ে যেতে পারে, মন তা স্বীকার করে না বলেই এত দুঃখ এত বেদনা। ওঠো প্রান্তিক। আমি আকুল হয়ে বললাম, এই তোমার শেষ কথা। না এ আমার শেষ কথা নয়। আমি জানি আবার তুমি আসবে একদিন এই ঘাটে, অথবা অন্য কোথাও, পারলে সেদিন আমি তোমাকে নতুন জীবনের গান শোনাব প্রান্তিক। সেটা কবে? তাতো জানি না। আমি শুধু জানি রেহানার ভালবাসাই একদিন তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে, অথবা আমি আসব তোমার কাছে। জানি সেদিন আমাকে ফেরিয়ে দেওয়ার কোন ক্ষমতাই থাকবেনা তোমার। আমিতো আজো তোমাকে ফিরাতে চাইনে কেন তবে ভয় পাচ্ছ? ভয় নয়, হাসল অশ্রুকণা। আমি বললাম, চল ওঠা যাক। ও বলল চল, তাহলে।
