কেটে গেছে এর পরে আরো বেশ কয়েকটা মাস। ঈদ ও পূজা কেটে গেছে প্রায় এক সাথে। রেহৃনাকে একদিন বললাম, আমার সাথে যেতে অসুবিধা হবে নাতো। ও বলল, বার বার তুমি আমায় কি পরীক্ষা করতে চাও প্রান্তিক? পরীক্ষা নয় ভয়? ভয় কেন? তুমি বোঝনা কেন ভয়? আগের মত কি তোমাদের বাড়ী আমাকে মেনে নিতে পারছে? রেহানা ভালভাবে জানে, কথাটা পুরো না হলেও আংশিক সত্য। সেলিনা যেমন অনেক বাঁকা বাঁকা কথা বলে, আফরোজ বেগমও অন্যের সঙ্গে যখন তখন বেরোনো পছন্দ করেন না। আমি এর অর্থ খুঁজে পাইনা। মানুষের কি অদ্ভুত পরিবর্তন। স্বপ্নেও ভাবিনি কোনদিন। জীবনের পরিবর্তন গুলো এ ভাবে বিপরীত গামী হয়ে নেমে আসতে পারে। রেহানা বলল, তোমার ব্যাথা বুঝি। আর এও বুঝি, আমাকে এসব কথা জিজ্ঞাসা করে আমার মনের সন্দেহকে যাচাই করে দেখতে চেয়েছে তাই তো? আজ যারা আমাকে তোমার মাধ্যমে চেনে, তুমি সরে গেলে বলতে পার আমি তাদের কাছে কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবো। বললাম, রেহানা ভালবাসা কাকে বলে আমি জানিনে। রূপ বা সৌন্দর্য ভালবাসাকে প্রভাবিত করতে পারে কী না তাও জানিনে। আমি শুধু জানি প্রান্তিকের জীবনে রেহানাই একমাত্র সত্য। যদি জানো তা হলে ব্যথা দাও কেন? তোমাকে বুঝতে পারিনা বলে। আজ কাল দুম দাম বলে দাও আমার সময় হবে না, তুমি একা যাওনা লক্ষ্মীটি। কেন বলি সে কি বোঝনা? হয় তো বুঝি কিন্তু মন মানেনা। আগেতো তুমি এমন ছিলে না? না ছিলাম না, কিন্তু তুমি কি ছিলে? কি করে তোমাকে বুঝাবো, রেহানা শুধু তোমার? একমাত্র তোমার, আর কারো নয়।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, দুপুর আড়াইটায় ব্যাবাকপুর লোকাল। টিকিট কেটে অপেক্ষা করব। আচ্ছা বলে ও ক্লাসে চলে গেল। ওই ক্লাসটা আমার নেই। মধুদার চায়ের দোকানে ঢুকেছি, অবাক হয়ে দেখি অশ্রুকণা একা একা চা খাচ্ছে। ও আমাকে দেখে বললে প্রান্তিক অনেক অনেক দিন বাঁচবে তুমি। আমি হাসতে হাসতে বললাম, আমায় কি তুমি তাড়াতাড়ি মেবে ফেলতে চাও কণা? ও বলল সব তাতেই তোমার বাঁকা বাঁকা কথা? তারপর বলল, আজ প্রিন্সিপাল রেহানাকে ডেকে পাঠিয়েছে জান? বলেনি তো ও কিছু? আজকে ওর সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে? হ্যাঁ এইতো ওর সঙ্গে কথা হল, ও ক্লাসে গেছে, আমার কোন ক্লাস নেই তাই মধুদার চায়েব দোকানে এলাম। তারপর চিৎকার করে বললাম, মধুদা দু কাপ চা। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বললাম তুমি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এখানে? তোমার জন্য। আমার জন্য? আশ্চর্য ব্যাপার। ও আস্তে বলল, ঠাট্টা নয় প্রান্তিক তোমার সঙ্গে সত্যি কথা আছে আমার? আমি আরো অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। বললাম কি ব্যাপার? ও বলল, যদিও আজ তোমাকে কোথাও ডেকে নেওয়ার অধিকার হয় তো হারিয়েছি তবু চল না, আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটু গঙ্গার পার দিয়ে ঘুরে আসি। বললাম আমার যে ক্লাস আছে? জানি আমি, তবু বলছি চল তোমার সঙ্গে সত্যি কথা আছে এবং তা তোমার শোনা একান্ত দরকার। বেশ চল তা হলে।
দুপুরের গঙ্গা ঘাট, একেবারে নির্জন। বাঁধানো সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে ও বলল, আমায় একটা সত্যি কথা বলবে প্রান্তিক? কি? আজ যদি কোন কারণে রেহানা তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। মানে? আমি তো অনুমানের কথা বলছি, মানে খুঁজছো কেন তবু কারণ তো নিশ্চয়ই কিছু আছে কণা? আছে, কিন্তু তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও? অসম্ভব। কি অসম্ভব? তোমার এই অনুমান। ও একটু ম্লান হেসে আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই প্রান্তিক। তুমি হয়তো জানো, একদিন তোমার ভালবাসা পাওয়ার জন্য কি না করেছি আমি? আমি ঠাট্টা করে বনলাম, আজ কি চাও না আমাকে? না। আমি যদি চাই? তাহলেও না। কেন? ওই যে বললাম জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। বুঝলাম তোমার কথা। কিন্তু তোমার কেন মনে হচ্ছে রেহানা আমার জীবন থেকে হরিয়ে যেতে পারে। পারে না বুঝি? না পারে না। তারপর বললাম তুমি জানো ও আমার জীবনে কি ভাবে জড়িয়ে আছে। থাকগে সে সব কথা, তুমি তারপর বল? ও বলল, তোমার কথা মেনেও বলছি, সত্যি ও তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারে। আমি চিৎকার করে বললাম কণা? আমার কথা প্রতিধ্বনিত হলো গঙ্গার নিঃশব্দতায়। কেঁপে উঠলো আমার সমস্ত শরীর। ও দুহাত দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে বলল রেহানার অবস্থা তুমি বুঝতে চাইছে না প্রান্তিক। ওকে একটু বুঝবার চেষ্টা কর। আজকাল কলেজে যে সমস্ত আলোচনা হয় তুমিতো তার কিছুই জানো, জানবার চেষ্টাও কর না। অবশ্য রেহানার এই অবস্থার জন্য তোমার পিসিও কম দায়ি নয়। পিসি? তুমি কি বলছ কণা? আমি ঠিকই বলছি। তোমার পিসি সব কিছু জেনেও সেলিনার প্রতি তার দুর্বার ভালবাসা, সেলিনাকে তোমার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করছেন। আমি চিৎকার করে বললাম আমি বিশ্বাস করি না, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না তোমার কথা। অধৈর্য হয়োনা প্রান্তিক। সেলিনাকে তুমি সত্যিই স্নেহ কর। তাই তোমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু সেলিনা তো মেয়ে। তুমি কোন দিনও তাকে একটা মেয়ে হিসাবে ভাবতে শেখোনি, তাকে তুমি তোমার আপন ছোট বোনের মর্যাদায়, তার সব দাবি মিটিয়ে এসেছো? তোমরা পুরুষরা এখানেই ভুল করে প্রান্তিক। তারপর বলল আজ তোমাকে একজনকেই বেছে নিতে হবে, যা তোমার পক্ষে অসম্ভব। না হলে দুজনার কাছ থেকেই দুরে সরে যেতে হবে। আরো বলল ঠিক জানিনা, শুধু বিশ্বাস করি, রেহানা চাইবে তুমি সেলিনাকে নিয়ে সুখী হও, সে থাকবে তোমার স্বপ্নের মানসী হয়ে। তাইতো সে চলে যেতে চাইবে তোমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আর তাই বলছিলাম, আজ যদি সে তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়।
