রেহানার আনন্দে চোখে জল এসে গেল। মিনতি সেন ওকে বুকের পরে টেনে নিয়ে বললেন, অপরাধের শাস্তি একদিন হবেই এ বিশ্বাস আমার ছিল বলেই ভট্টাচার্য সাহেবকে কেসটি নিতে এমন অনুরোধ করেছিলাম। ভট্টাচার্য সাহেব অবশ্য একটা কথা বললেন, ডালিমরা অপরাধ নিজমুখেই স্বীকার করে নিয়েছে তাই বিচারকের পক্ষে রায় দান অনেকটা সহজ হয়েছে।
আর ডালিমরা অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে এই একটা কথাতেই কেমন যেন হয়ে উঠলো রেহানা। তারপর অবশ্য সব ঠিক হয়ে যায়। মিনতি সেন বললেন, তাহলে তো মিষ্টি আপনাকেই খাওয়ানো উচিত। সে আর বলতে, তবে এই ভালো সংবাদটা দেওয়ার জন্যই আমি কিন্তু মিষ্টি নিয়ে আসিনি, আমি মিষ্টি নিয়ে এসেছি, আমার মেয়ে শান্তা আজ আমাকে সকালে বাঙালী কৃষ্টি অনুসারে প্রণাম করছে বলে। আমরা সবাই অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। বলেন কি ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্য। সামান্য একটা প্রণাম এত অসামান্য হয়ে উঠতে পারে তার মত ব্যক্তির কাছে ভাবতেও অবাক লাগে। মিনতি সেন বললেন এটাতো স্বাভাবিক ভট্টাচার্য সাহেব। জানি এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতা যে কত অস্বাভাবিক হতে পারে আপনারা তা বুঝবেন না। আমার নিজেরও একদিন জীবনের সহজ স্বাভাবিকতা মেনে নিতে অসুবিধা হতো। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়েছে। যেদিন রেহানা বিধর্মী হয়েও আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল, কি যে হল মিস সেন তা আমি আপনাকে বোঝাতে পারবো না। মনে হল এ যেন যুগ যুগান্ত প্রবাহিত এক স্রোতস্বিনী ধারা। জীবনের তন্ত্রীতে তন্ত্ৰীতে এ যেন এক সঙ্গীতের অনুরনন। মনে হল, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি যা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে, সেতো মায়ের আশীর্বাদ। বিলেতে প্রণামের মর্ম বোঝেনা। এর ভিতর যে মাধুর্য, সৌন্দর্যের আধারে জীবনকে তা রসারিত করে। যে প্রণাম করে তার স্বকীয় অবনমতায় ভাস্বর করে তাকে যাকে সে প্রণাম করে। জিজ্ঞেস করলাম শান্তাকে, হঠাৎ প্রণাম কবলি যে। বলল জানিনে কেন করলাম বাপী, এও এক পরিবর্তন মিস সেন যে কোনদিন ড্যাড ছাড়া বলেনি, সে বলছে বাপী, তারপর বলল, হঠাৎ ভারতীয় কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস পড়তে গিয়ে মনে হল কোন মানুষই তার মাটির স্পর্শ ছাড়া বড় হতে পাবে না। ঔদার্যের সঙ্গে অপরকে গ্রহণ করা যেতে পারে তাচ্ছিল্য করে নিজেকে অস্বীকার না করে। কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছিলাম, কি যেন ভাবছে মেয়েটি। একদিন বলল, ডন একদিন আসতে চেয়েছে নিয়ে আসব? ডন মানে যে ছেলেটিকে শান্তা ভালবাসে। আমি বললাম অবশ্যই আনবি। যাকে নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চাস তাকে একবার দেখাবিনা। ও ভেবেছিল আমি বোধ হয় প্রতিবাদ করব। তাতে অবাক হয়ে বলল, আমি যাকেই পছন্দ করব তাকেই তুমি মেনে নেবে? বলেছিলাম না নেওয়ার কি আছে? জীবনটা তোমার, তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। আজীবন ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে এসে নিজের মেয়েব ক্ষেত্রে তা মানবনা তাতো হয় না। বলল, যদি তোমার সামাজিক আদর্শের সঙ্গে তার আদর্শের মিল না খায়? বলেছিলাম নাই বা খেল। আমিতো ধর্ম মানিনা মা, সমাজও বোধ হয় আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না। তার জন্য মাঝে মাঝে অনুতাপ হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, এ অহংকার বোধ হয় ভাল নয়। যে মাটিতে আমার জন্ম তার রস না নিয়ে টবের ফুলের মত অন্যের পরিচর্যায় বড় হয়ে ওঠা হয়তো আপাত সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে তবে তার অপমৃত্যু হতে বেশীক্ষণ লাগে না। পরিচর্যার অভাবে তা শুকিয়ে যায় যে কোন মুহূর্তে, কিন্তু মাটির রসে যে ফুল ফোটে তাতে পরিচৰ্য্যার দরকার হয় না। সঞ্চিত জলধারাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। জাতীয় কৃষ্টি ও সভ্যতা তাই। সেতো মাটির নীচে সঞ্চিত জল ধারা। তাকে অস্বীকার করে কখনোই মহত্ত্বে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না।
আমি যে আপন কৃষ্টি ও সভ্যতার পক্ষে এত ডিবেট করতে পারি, ও তা ভাবতেও পারেনি। বলল, তোমার কি হয়েছে বলতো ড্যাড? নিজের সভ্যতা কৃষ্টি আচার আচরণকে নিয়ে এত যে ওকালতি করছ, তার মানে কি এতদিন তুমি যা বিশ্বাস করে এসেছে তা ভুল। বললাম ভুল কি না জানিনে মা, তবু একটি মেয়ে সে আমার জাতের নয়। সে আমার ধর্মের নয়, তবু কাকাবাবু বলে সে যখন প্রণাম করল, কি যে হল তোকে বোঝাতে পারবো না। আমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে লাগল এক আনন্দের স্রোত ধারা। ও অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে, বলল, দেখ ড্যাড তাকে স্নেহ করতে গিয়ে আবার আমাকে অস্বীকার করো না? হয়তো ঠাট্টাই। কিন্তু ভাল লাগেনি মিস সেন। বলেছিলাম। যদি সে বলে তোকে অস্বীকার করলে সে আমার হবে, জানবি মুহূর্তও লাগবেনা তোকে অস্বীকার করে সেই শূন্যস্থানে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ও ভয় পেয়ে বলল, ড্যাড! আমি বললাম ভয় পেলিতে, আমার মনে হয়, রেহানা যে আদর্শে বিশ্বাস করে, যদি তার বাবা বা মা তাকে বলে, তোর আদর্শ ত্যাগ না করলে আমাকে হারাবি, সে হয়তো হাসিমুখে রাজী হয়ে যাবে। আমি তোমাকেই হারাবো তবু আমার বিশ্বাস আমার আদর্শ আমি ত্যাগ করতে পারবনা। শান্তা অবাক হয়ে বলে একটি দিন মাত্র তাকে দেখেছে তাতেই এত। দরকার নেই ডনের তোমার কাছে এসে। তুমি থাক তোমার সেই মেয়েটিকে নিয়ে। একথা বলে অভিমানে আমার কাছ থেকে সরে গেল ও। আমি তাকে ডাকতেই পারলাম না। এতদিন ধরে তার সঙ্গে আমার কোন কথা নেই। ডনও এলো না। হঠাৎ আজ সকালে ও আমার কাছে এসে আমাকে প্রণাম করে বলল, বাপী, আমারই ভুল। সেই অদেখা মেয়েটি জানিনা সে আমার থেকে বড় না ছোট তাকে বল, সে যদি পর হয়ে তোমার হৃদয় জয় করতে পারে আমি মেয়ে হয়ে কেন পারবো না। কি যে ভাল লাগল মিস সেন। ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম একবার দেখবি সেই মেয়েটিকে? ও রাজী হওয়াতেই আমি ফোন করলাম আপনাকে। এতক্ষনে ভট্টাচার্য সাহেবের কথাগুলো শুনছিলাম আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতন। সুঁচ পড়লেও যেন টের পাওয়া যায়। রেহানাই প্রথম এগিয়ে এলো ভট্টাচার্য সাহেবের কাছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথার চুলের মধ্যে আঙুল গুলো সঞ্চালিত করতে করতে বলল, কাকাবাবু আপনার মনের মধ্যে যে এমন কোন দুঃখ থাকতে পারে সে তো ভাবনারও অতীত। তারপর বলল চলুন, আমি যাব। যাবি মা? যাব না কেন? এমন ভাবে কে আমার হৃদয়ের মর্মস্থলে আঘাত করতে পেরেছেন? আমি এক সামান্য মেয়ে কাকাবাবু, সেই সামান্য মেয়েকে অসামন্যতায় যে মেয়ে দেখতে চেয়েছে সে যে আমারও প্রণাম্য। আবেগে বুঝি কথা বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, সত্যি যাবি মা। তা হলে চল্। মিস সেন, আপনিও চলুন না। আর একটা ভাল সংবাদ দেব, প্রান্তিক তুমিও চল। রেহানা বলল, একটু অপেক্ষা করুন কাকু। কেন রে? ও আস্তে আস্তে বলল, সেদিন আপনাকে প্রণাম করেছিলাম বয়কনিষ্টের স্বাভাবিকতায়। আজ একটা প্রণাম করতে দিন শ্রদ্ধা ও ভক্তির অঞ্জলি হিসাবে। রেহানা। প্রণাম করলে ভট্টাচার্য সাহেব নিজের বুকের পরে টেনে নিয়ে কপালে বার বার স্নেহ চুম্বন একে দিতে লাগলেন যেন কোন হারানো মেয়ে ফিরে এসেছে অনেক অনেক দিন পরে তার বাবার বুকে।
