মিনতি সেন কোন কথা না বলে, রেহানার পড়া শেষ হলে চিঠিটা এক নিমেষে পড়ে নিলেন। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাকে বুকের পরে তুলে নিয়ে ওনার বিছানায় শুইয়ে দিলাম। রেহানাকে বললাম, চল আমরা নীচের ঘরে যাই, ওনার এখন একা থাকা দরকার। দরকার ভীষণ ভাবে দরকার কান্নার, তবেই যদি হাল্কা হতে পারেন। রেহানা বলল, কি অদ্ভুত তাইনা। অথচ এত ব্যথা যে দুজনেই বয়ে বেড়াচ্ছেন দেখে বোঝার উপায় নেই। আমি বললাম ঠিক তোমার মত। যা!
অনেকক্ষণ পরে, জবার মা আমাদের ডেকে পাঠালেন উপরে। মিনতি সেন কাঁদতে কাঁদতে একটু শান্ত হয়েছেন, চোখ দুটো লাল। চুল এলোমেলো। শাড়ী অবিনস্ত। তবু যেন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। রেহানা ওকে নিয়ে ভিতরের ঘরে গিয়ে একটু বিন্যস্ত করে নিয়ে এলো। উনি বসলেন খাটের রেলিংএ হেলান দিয়ে। তারপর বললেন, তোমরা দুজনেই বাবার চিঠি পড়ছে? এখন তোমরাই বল আমার কি করণীয়।
আমরা সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। কারো মুখে কোন কথা নেই। উনি বললেন, কি হলো প্রান্তিক কিছু বল। আমি বললাম পিসি। আজই কিছু করতে হবে, তারতো কোন প্রয়োজন নেই। থাক না কয়েকদিন পর করলেও হবে। আরো কয়েকবার পড়ন চিঠিটা। তারপর নিজেই বুঝতে পারবেন কি করা সম্ভব, বা কি করা উচিত। মিনতি সেন বললেন, বাবার বুকে যে এত ব্যাথা জমা ছিল আমি বুঝতে পারিনি। সব সময় মনে হয়েছে মায়ের মৃত্যুর জন্য বাবাই দায়ী। তাই তার অহঙ্কার আমি মেনে নিতে পারিনি। আর তাই তার সবকিছুকেই প্রাণপনে এড়িয়ে চলেছি। মায়ের যে কোন ভুল থাকতে পারে মনেই হয়নি কখনো। এখনতো আবার নতুন করে সব কিছু ভাবতে হবে। বললাম, তাই ভাববেন, তার আগে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন। মিনতি সেন বললেন, সময়ই সব ঠিক করে দেবে জানি, হয়তো এমনও হতে পারে তোমাদেরও আমি আর সহ্য করতে পারছি না, তাই আমি বাবার সব কিছু তোমাদের দিয়ে যেতে চাই প্রান্তিক। বললাম তার মানে আপনার বাবার প্রতি অভিমান আজো তেমনি আছে, তার চেয়ে আমি বলি কি, এই মুহূর্তে তার কোন প্রয়োজন নেই। আমরা তো পালিয়ে যাচ্ছিনা। আর তাছাড়া আপনিও কোন দিন পারবেন না আমাদের এড়িয়ে চলতে। মা কি পারে তার সন্তানদের এড়িয়ে চলতে। পেরেছেন কি আপনার বাবা। পারেন নি? তাই কেন এসব ভাবছেন পিসি? অতীতের তিক্ততা মুছে ফেলুন। বরং ভাল করে নিজের অন্তরের দিকে তাকিয়ে দেখুন, সেখানে প্রতীমবাবুর কোন জায়গা আছে কি না। যদি থাকে, তাকে গ্রহণ করুন একান্ত আপন করে। তা হয় না প্রান্তিক। কেন হয় না। জানিনা। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তই আবেগের বশে নেবেন না। আপনার হিতাকাঙ্কীর অভাব নেই। ব্যারিষ্ট্রার ভট্টাচার্য সাহেব, পুলিশ কমিশনার আপনার কাকাবাবু, এদের সবার সঙ্গে নিজের কথা নিয়ে আলোচনা করুন। তাদের কথা শুনুন। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আপনি নিজেই নিন। আপনার বাবার ব্যাথাটাও বোঝবার চেষ্টা করুন। নিজের জেদটাকে বড় করবেন না পিসি। সত্যিকারের সত্যের আলোকে নিজেকে যাচাই করুন। এরপরও যদি মনে হয়, আপনার জেদটাই বড়, তবে জেদ নিয়েই থাকবেন, শুধু অকারনে কারো প্রতি কোন অবিচার করবেন না, এই আমাদের অনুরোধ। মিনতি সেন তাকালেন রেহানার দিকে, কি রে মেয়ে তুই কিছু বলবিনা?
ফোনটা বেজে উঠলো। আমি গিয়ে ফোনটা ধরলাম। হ্যালো আমি ভট্টাচার্য বলছি, মিস সেন আছেন? হ্যাঁ ধরুন আমি দিচ্ছি। হ্যালো আপনি কে বলেছেন? আমি প্রান্তিক। হ্যালো, ইয়ং ম্যান তোমাকেই দরকার। এতদিন কোথায় ছিলে? খুব অসুখে পড়েছিলাম। আজ একটু ভাল হতেই এখানেই এসেছি? খুব দরকার? হ্যাঁ দরকার তো বটেই। তোমার থেকেও বেশী দরকার রেহানাকে। আমি বললাম ওতো এখানে আছে। যদি বলেন আসতে পারি। দরকার নেই। তোমরা কতক্ষণ আছ? আমি আধ ঘন্টার মধ্যেই আসছি। মিস সেনকে বলে দিও। মিনতি সেনের সঙ্গে কথা না বলেই ফোনটা ছেড়ে দিলেন উনি। আমি মিনতি সেনকে সব কথা খুলে বললাম। উনি শুনলেন, কিন্তু কোন কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। জবার মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, দিদিমনি, আপনাদের চা বা কফি দেব? হ্যাঁ দাও।
আধ ঘন্টার আগেই এলেন ব্যারিষ্টার সুরেশ ভট্টাচার্য। বড় এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়েই এলেন। মিনতি সেন বললেন কি ব্যাপার? মিষ্টি নিয়ে যে? হ্যাঁ ভাবলাম, এই ভাল সংবাদটি দেওয়ার জন্য আপনাকেই মিষ্টি খাওয়ানো দরকার। মিনতি সেন বললেন বুঝতে পারলাম না। অনুমান করুন না। কি অনুমান করি বলুনতো আপনাদের জীবন এত বিস্তৃত যে, কোনটা ভাল আর কোনটা ভাল নয় এতো বোঝা মুসকিল। পরে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ইয়ং ম্যান তুমি কিছু অনুমান করতে পার? আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। উনি চোখ ফেরালেন রেহানার দিকে। বললেন মা আজকের দিনে জবার মায়ের হাতের কফি রুচবে না। বরং তুমিই কফিটা করে নিয়ে এস। মিষ্টি মিষ্টি হাসতে লাগলেন ভট্টাচার্য সাহেব। রেহানা বলল, এই আনি কাকাবাবু। ও চলে গেলে, মিনতি সেন বললেন, সংবাদ যে খুবই ভাল বুঝতে পারছি, কিন্তু আমাদের এই সংশয়ে রেখে আপনি কি সত্যি আনন্দ পাচ্ছেন? কিন্তু আপনারা যে বুঝতে পারছেন না তাতেই আমার আনন্দটা মাটি হয়ে যেতে বসেছে। তা হলে বলেই ফেলুন বললেন মিনতি সেন। ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, এক নাম্বার ডালিমদের কেসটা যে এত তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হবে বুঝতে পারিনি। ডাক্তার সরকার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে এমন সাক্ষ দিলেন যে বিচারক আর জেরা করার প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি রায়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ডালিমরা প্রশ্নাতীত ভাবে দোষী বলে তিনি মনে করেন। ভারতীয় ফৌজদারী দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে তিনি তার রায়ে ১০ বছর সশ্রম দণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ডালিমকে। শুধু তাই নয়, দন্ড শেষ হলে, বাইরে এসে তারা যাতে এমন কোন অপরাধ না করতে পারে, তার জন্য পরবর্তী ১০ বছর পুলিশ যেন তাদের গতিবিধির উপর বিশেষ নজর রাখেন এ আদেশও দিয়েছেন। থামলেন ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্য। তারপর বললেন, তার এই রায়ের পিছনে পুলিশের ভূমিকাও উল্লেখ করার মত। তবে অবশ্য সমস্ত কৃতিত্ত্ব আপনার কাকা মাননীয় পুলিশ কমিশনারের।
