প্রান্তিক।
আমি জীবনে কাউকে কোনদিন কোন চিঠি লিখিনি। লেখার প্রয়োজনও হয়নি। আজ তোমাকে লিখছি, মুখে সব কথা বলতে পারবনা বলে। তোমার ঈশ্বর আর আমার আল্লাহ কেউ বোধ হয় চায়নি, আমরা এক সাথে পথ চলি। মানুষ যে কেন, এমন করে প্রতিরোধ খাড়া করে বুঝতে পারিনা। তোমাকে বোধ হয় ডালিমের কথা বলিনি কোনদিন। ওকে একদিন ভাল লেগেছিল। আস্তে আস্তে বোধ হয় ভালও বেসে ছিলাম, কিন্তু কি যে হলো জানিনা, ও সেলিনাকে যে ভাষায় চিঠি লিখলো ঘৃণায় তা উচ্চারণও করা যায় না। ভুলে গিয়েছিলাম সব। ডালিম নামের কোন ছেলে যে এই পৃথিবীতে বাস করে তাও মনে হয়নি পরে কোনদিন।
এর মাঝে পরিচয় হলো তোমার সাথে। আস্তে আস্তে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যেতে লাগলাম, সেলিনা আমার থেকে ২ বছরের ছোট। কিন্তু ও আমার সব থেকে কাছের বন্ধু। আমার দুর্বলতাকে আরো দুর্বল করে দিয়ে আমাকে পৌঁছিয়ে দিতে চাইল তোমার কাছে। জানিনে কতটুকু পৌঁছাতে পেরেছিলাম। কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি করিনি প্রান্তিক। তোমার আর ডালিমের মধ্যে আছে এক দুস্তর ব্যবধান। তুমি তোমাকে বুঝতে দাওনা, আর ডালিম, সে তার অধিকার জোর করে ছিনিয়ে নিতে চায়, আর তার জন্য কোন নিষ্ঠুরতাই যেন তার কাছ কোন বাধা নয়।
নিজেকে প্রস্তুত করেছিলাম যাব তোমার সাথে, জানি অনেক বাধা আছে, তবু আমি চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে একাকী কাটিয়ে দেব কয়েকটি দিন। আগের দিন রাতেই বলছিল সেলিনা যে সে যাবে না। ওকে অনেক করে বলেছিলাম, কিন্তু ওর ওই এক কথা, না রেহানা তোরা যা। আমি এ কয়দিন খিদিরপুর মাসির ওখানে গিয়ে থাকবো। মাও যাবেন আমার সাথে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সব গোলমাল হয়ে গেল।
ডালিম এলো আরো কয়েকটি ছেলেকে নিয়ে। ওতো আসেনা বহুদিন। সেলিনা প্রথমে ওদের ঢুকতে দিতে চায়নি, কিন্তু মা বললেন আসতে দে ওদের। শোন ওরা কি বলতে চায়। সেলিনা ওদের বসবার ঘরে বসতে বললে মা বললেন না ওদের ভিতরের ঘরে নিয়ে আয়। ওরা ভিতরের ঘরে গেলে আমিও গেলাম ও ঘরে। আমার চোখের পরে চোখ রেখেডালিম বলল, তোমরা নাকি একটা কাফের ছেলের সাথে তাদের গ্রামে যেতে চাইছে। সেলিনা বললো, এ ভাবে কথা বলছেন কেন? কাফের বলে আমাদের কাছে কিছু নেই। হ্যাঁ, ওর সাথেই ওদের গ্রামের বাড়ীতে যাব আমরা। না যেতে পারবেনা এটা আমার আদেশ। আদেশ? আপনার বোধ হয় সেদিনের কথা মনে নেই সেলিনা বলল। ডালিম তার উত্তরে বলে আছে। আর আছে বলেই আমরা সেই ভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছি। কি বলতে চান আপনি? ডালিম বলল, আমি মৌলবীকে বলে এসেছি, আজই রেহানার সাথে আমার বিয়ে হবে?
বিশ্বাস কর প্রান্তিক, আমি মাটির সাথে মিশে যেতে লাগলাম। বলে কি এবা? এটা কি মধ্যযুগ নাকি? আধুনিকতার শিক্ষা কি এরা পায়নি? বললাম, এ তুমি কি বলছ ডালিম। তুমিতো শিক্ষিত ছেলে। প্রেসিডেন্সিতে পড়াশোনা করেছো। জোর করে কাউকে বিয়ে করা যায় নাকি? ওদের মধ্যে একজন ছিলেন নুরুজ্জমান, সেও ভালো ছেলে, বলল এক হিন্দু কাফের তোমাকে শয্যাসঙ্গিনী করবে সেটা বুঝি ভাল হবে? আজকেই তোমাদের দুই বোনের সঙ্গে আমাদের বিয়ে হবে। সেলিনা বলল, আবদার নাকি?
এই সময় বেল দিলে তুমি। কয়েকবারই দিলে। সেলিনার ঐ অবস্থায় তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। আমি জানালা দিয়ে বিমর্ষ ভাবে তোমার ফিরে যাওয়া দেখলাম। কিন্তু তোমাকে ডাকতে পারলাম না। পারলাম না আমাদের চরম লজ্জার মধ্যে তোমাকে নিয়ে আসতে।
এতক্ষণে মা বলল, তোমরা কি বলতে চাইছো ডালিম। তোমাদের কারো সঙ্গে আমি আমার কোন মেয়েরই বিয়ে দেবোনা। তোমরা বেরিয়ে যাও। সেলিনা বলল ডালিম ভাই, ভাল ভাবেই বলছি আপনারা বেরিয়ে যান, তা না হলে কিন্তু অপমানিত হতে হবে। ডালিম উদ্যত হয়ে বলল অপমানিত হতে হবে? একজন কাফেরের রক্ত কি আমার রক্তের থেকে দামী। তাহলে আজই সেই রক্তের দাম আমাকে মিটাতেই হবে? বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে সেলিনাকে টেনে নিল ওর বুকের মধ্যে তারপর বীভৎস ভাবে জোর করে তার কোমাৰ্য্য লুষ্ঠিত করতে চাইলে দরজার ডাঁসা দিয়ে ডালিমের মাথায় আঘাত হানেন মা। আমি ভয়ে লুটিয়ে পড়ি মেঝেতে। তবু ওর মধ্যে থেকে দেখি, ডালিম পড়ে গিয়েও মায়ের হাত থেকে কেড়ে নেয় সেই ডাশা, এবং তাই দিয়ে আঘাত হানে মায়ের ডান হাতে, মা পড়ে যান। কিন্তু তাতেও লম্পটটা ছাড়ে না, ঐ উঁশা দিয়ে মায়ের পায়ে আঘাত করলে, সেলিনা কোন ভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে রান্না ঘরে গিয়ে বড় আঁস বটিটা নিয়ে এসে আক্রমণ করে ওদের। নুরুজ্জমান সহ তিনজন পালিয়ে যায়। কিন্তু ডালিম শেষ বারের মত চেষ্টা করে আমাকে তুলে নিয়ে যেতে। কোন ভাবে সেলিনার বটির একটা কোপ বাঁচিয়ে, নিজের পকেট থেকে পিস্তল বের করে গুলি করে সে সেলিনার মাথা লক্ষ করে। গুলিটা কানের পাশ দিয়ে মাথার একটা অংশ ক্ষত করে বেরিয়ে যায়। সেই অবস্থাতেই আমি শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ওর কাছ থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে সেন্নিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। ডালিম ততক্ষণে আবার গুলি করে, কিন্তু তা সেলিনার পায়ে লাগে, এবার আমি ভয়ংকর মুর্তিতে সেই আঁস বটি নিয়ে এগিয়ে যাই ডালিমের দিকে। সম্ভবত ওর পিস্তলে আর গুলি ছিল নাওকোন ভাবে পালিয়ে যায়। আমি তখন ভয়ংকরী।
