একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিলেন প্রতীম চৌধুরী। তাকালেন আমার দিকে। তারপর বলেলেন ভাবছি কি হবে তোমাকে সে সব কথা বলে? না আমাকে বলে হয়তো আপনার প্রতীক্ষার অবসান হবে না, তবু আমার এই ছোট্ট জীবন দিয়ে বুঝেছি নিজের দুঃখের বোঝ কাউকে না কাউকে ভাগ করে দিতে হয় এবং তা বললে মনটা হয়তো একটু হাল্কা হতে পারে। উনি বললেন বেশ আমি বলছি, কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে প্রান্তিক, একথা আর কেউ জানবেনা। তোমার গবেষণা পত্রেও এ ঘটনার কোন ছায়াপাত ঘটাবে না তুমি। কথা দিলাম। উনি ধীরে ধীরে বললেন, না জীবনে কোন মেয়েকে কোনদিন ভালবাসিনি। আসলে ক্যারিয়ার এবং পড়াশোনার বাইরে যে একটা জগৎ আছে তাই আমার জানা ছিল না। তারপর একদিন একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা হয়। পছন্দও হয়। মনে মনে স্বপ্নও দেখি ওকে নিয়ে। একটু থামলেন প্রতীম চৌধুরী। বললেন কফি খাবে? যদি আপনি খান তাহলে আপত্তি নেই। বেয়ারা এলে উনি কফির অর্ডার দিলেন এবং বললেন, আধ ঘন্টা পরে দুই প্লেট লাঞ্চ। উনি তারপর বলে চললেন, পাকা দেখার দিন, কি হয়েছিল জানিনা, সব কিছু ঠিক ঠাক হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এ বিয়ে হল না। মেয়েটির মা আত্মহত্যা করলেন। ওর বাবাকে পুলিশ এ্যারেষ্ট করলেন। জেল হল তার পরে একদিন জেল থেকে ফিরেও এলেন, চরম ট্রাজেডির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমরা কিন্তু রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটি রাজী হলেন না। স্বপ্ন ভেঙে গেল প্রান্তিক। তবু আজো আমি সেই স্বপ্নই দেখি। বললাম মেয়েটির সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়নি কোন দিন? না। কেন দেখা করেননি কেন? ভয়ে। কিসের ভয়? যদি মুখের পরে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি বললাম চিঠি লিখেও তো জানতে চাইতে পারতেন তার মনের কথা! তুমি ঠিকই বলেছো। আমি আমার মনের কথা তাকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু ভালোবাসার চিঠিতে কোন দিন লিখিনি হয়তো তা লেখার জন্য আলাদা মুন্সিয়ানার দরকার। যা হৃদয়কে ছুঁয়ে যেতে পারে। আমার চিঠিটা ছিল খুবই সোজাসুজি। জানিয়েছিলাম, আমি অপেক্ষা করতে রাজী। মৃদু হেসে বললাম, তিনি কি উত্তরে কিছু বলে ছিলেন? না প্রান্তিক। তাই এখন যদি জানতে চাও তার ঠিকানা আমি জানি কীনা। কিন্তু জানলেও সে ঠিকানা তো আমি তোমায় দিতে পারব না প্রান্তিক।
অনেকক্ষণ চুপচাপ। এর মাঝে কফি এল। নীরবে দুজনেই কফি খেলাম। তারপর আমি বললাম। আজো কি আপনি তার অপেক্ষায় আছেন। ঠিক জানিনা। তবে নতুন কাউকে জীবনের সঙ্গে মেনে নিতে পারিনি। সেতো দেখতে পারছ। আমি বললাম, আপনার এই নীরব পূজার মানে কি? এতো অর্থহীন। আর সত্যি সত্যিই যদি মন থেকে তাকে চান, খুঁজে বের করুন তাকে। দাঁড়ান তার মুখোমুখি, বলুন আপনার কথা নিজের অধিকারকে দাবী করুন তার কাছে। ভয় হয় প্রান্তিক ভীষণ ভয় হয়, যদি আবার ফিরিয়ে দেয়। দিলেনই বা। পৃথিবীর সব দাবী কি কারো মেটে? তাই বলে দাবী করার অধিকার যার আছে, সে কি দাবী করতে ভুলে যাবে? কি করে বুঝবো আমার দাবীর অধিকার আছে? এক নিঃসঙ্গ বিষণ্ণতা ধরা পড়ে তার কণ্ঠে।
আমি আস্তে আস্তে বললাম, তা অবশ্য ঠিক, কিন্তু তবু আপনাকে অনুরোধ করব, আপনি তার কাছে যান, বুঝুন তাকে। হয়তো এমনও হতে পারে, আপনারই অপেক্ষায় আজো বসে আছেন তিনি পথ চেয়ে। এরপর জোর দিয়ে বললাম কেন দুটো জীবন এমন ভাবে ব্যর্থ হয়ে যাবে? কোথায় খুঁজবো তাকে? কেন যেখানে তারা থাকতেন, সে ঠিকানাতো আপনার জানা। সেখানে কি তারা নেই? জানি না প্রান্তিক কিছুই জানিনা আমি, আমার ভয় হয় কি জান? কি? তুমি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সেই বিখ্যাত কবিতা পড়েছো? কোন কবিতা। ঐ যে ইয়াররা আনভিসিঢেউ এবং ইয়াররা ভিসিঢেউ। এখনো সে বেঁচে আছে আমার স্বপ্নে। কিন্তু গিয়ে যদি সে স্বপ্ন মায়ামরীচিৎকার মতো মিলিয়ে যায়। বললাম হয়তো বাস্তবের মুখো মুখি দাঁড়িয়ে একথা মনে হতে পারে আপনার। তাতে কি? স্বপ্ন আর বাস্তব যে এক নয় এটাও তো আপনার জানা দরকার। তারপর বললাম বলবেন কি তার ঠিকানা যদি কোন উপকারে আসে। না থাক প্রান্তিক। আমার সত্য আমার কাছেই থাক। তাকে গবেষণাগারে ফেলে লাভ নেই। তবে যদি কোন দিন চলতি পথে তার সাথে দেখা হয় নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করবো, আমার সেদিনের চিঠির উত্তর তিনি দিলেন না কেন? আর যদি এমন হয় আপনার চিঠির উত্তর তিনি দেননি ঠিকই, কিন্তু তিনিও তার জীবন বয়ে নিয়ে চলেছেন একাকিনী নিঃসঙ্গ তপস্বিনীর মতো আপনারই প্রতীক্ষায়। দিন গুনে গুনে, কি করবেন আপনি? আবেগে। আপ্লুত কণ্ঠ। বললেন জানিনা কি করব। সত্যি আমি জানিনা আমার কী করা উচিৎ।
আমার জানার যা তা জানা হয়ে গেছে। এবার আমাকে উঠতে হবে। অথচ উনি লাঞ্চের অর্ডার দিয়েছেন, তাই বসতে হয়। বললাম, জীবনে যদি এমন শুভ মুহূর্ত কোন দিন আসে। আমাকে জানাবেন তো? উনি বললেন তোমার ঠিকানাটা দাও। আমি ঠিকানাটা লিখে তার দিকে এগিয়ে দিলাম। লাঞ্চ এলো। খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
রেহানার চিঠিটা পড়েছি বেশ কয়েকবার। কি যে ও বলতে চায়, বার বার পড়েও উদ্ধার করতে পারিনি। কেন যে এত চাপা আর এত অস্পষ্টতা নিয়ে ও এগিয়ে চলেছে কে জানে। একবার বলেছে তোমাকে ছাড়া আর কাকে বলব? আবার বলছে আমায় ক্ষমা করো তোমাকে এসব কথা বলছি বলে। চিঠিটা আরেকবার পড়ি আমি। লিখেছে রেহানা।
