আমার শাড়ী কোথায় জানিনা, ব্লাউজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। ডালিমের নিষ্ঠুরতায় ঠোঁট দিয়ে রক্ত ঝরছে, মা জ্ঞানহীন। আর সেলিনা নারীর শেষ কৌমাৰ্যটুকু যদিও রক্ষা করেছে, কিন্তু হায়েনার দাঁতের আঘাতে সমস্ত দেহ ক্ষতবিক্ষত। সে কি দুর্বিসহ অবস্থা। তোমাকে বলে বোঝাবার নয়।
কি করব আমি, শরীরে এক বিন্দু শক্তি নেই। অথচ ডাক্তার ডাকতে হবে। মনে মনে চাইছিলাম আর প্রার্থনা করছিলাম হে করুণাময় আল্লাহ প্রান্তিককে এই সময় একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমার এই আকুল আহ্বান বধির আল্লাহর কানে পৌঁছালনা। কোন ভাবে শাড়িটা খুঁজে পেয়ে তা দেহের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিয়ে আমাদের মোড়ে যে ডাঃ সরকার আছেন, তার কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লাম। তিনি বললেন কি হয়েছে মা। সব সংক্ষেপে খুলে বললাম তাকে। তিনি এলেন দেখলেন, তারপর সেলিনাকে হাসপাতলে পাঠাবার ব্যবস্থা করে মাকে বাড়ীতেই যা করার করলেন। পুলিশে সংবাদ দিলেন ঐ ৪ জনকেই এ্যরেষ্ট করা হল। তারপর কি হয়েছে জানিনা।
আজ ভয় হয় প্রান্তিক, কি হবে সেলিনার ও মায়ের। আমার কথা ভাবিনা। নিজের মৃত্যুর পরওয়ানা নিজেই লিখে দিয়ে যাব একদিন। কিন্তু ওরা? ওদের কি হবে?
জানি, একদিন আমার কাছে জানতে চাইবে সব। পারবনা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এসব কথা বলতে। তাই তো আগে থেকে লিখে জানিয়ে দিলাম সব। আমার আর কিছুই বলার নেই প্রান্তিক। তোমার জীবনে আমার দুঃখের বোঝা নামিয়ে দিতে চাইনে। যদি কোন মুহূর্তে কোন দুর্বলতা তোমাকে স্পর্শ করে থাকে তার জন্য আমায় ক্ষমা করো। ভেবেছিলাম কোন কথাই বলব না তোমাকে কিন্তু কেন যে জানালাম তার উত্তর জানিনা। তুমিও জানতে চেয়োনা–রেহানা।
সেলিনাদের গোটা পরিবারের ঘটনায় এমন যে কিছু একটা থাকতে পারে অনুমান করেছিলাম। কিন্তু ডালিম যে সেই ঘৃণ্য ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছে ভাবতে পারিনি। সেলিনার কাছে ডালিমের কথা শুনেছি, মানে সেলিনা যতটুকু বলেছে, তাতে ডালিমের ঐ ব্যাপারটি যৌবনের এক হঠাৎ খেয়াল বলে মনে হয়েছিল। তাকে অত হিংস্র বলে কখনো মনে হয়নি। প্রেসিডেন্সির শিক্ষিত ছেলে কেন এত হিংস্র হবে। আর মধ্যযুগীয় বর্বরতা? এতো অসহনীয়। কিন্তু তাই বলে ঘটনার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। একদিনতো ফিরে আসবে ডালিমরা, সেদিন যে আবার প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠবে না কে বলতে পারে। কিন্তু আমিই বা কি করতে পারি। কতটুকু ক্ষমতা আমার। আমি আমার জীবন দিয়ে এদের পাশে দাঁড়াতে পারি, আমার ক্ষুদ্র সামর্থ দিয়ে এদের সাহয্য করতে পারি, তার বেশি ক্ষমতা কোথায়? আর ডালিমদের মোটেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। ওরা ভয়ংকর বিষধর সাপ। ছোবল মারার প্রতিক্ষায় থাকবেই। কি করব। কি করা উচিৎ কোনটাই বুঝতে পারছি না। রেহানাদের সংবাদও জানিনা ২/৩ দিন। কোন দিনই আমি আইন-আদালতের পাতা দেখিনা। কিন্তু আজ নিজের অজান্তেই চলে আসি এই পাতায়। হঠাৎ দেখি আগামী সোমবার একটি বিশেষ কেসের শুনানী হবে। আসামি ডালিম নুরুজ্জমান সহ চারজনকে সেদিন কোর্ট প্রাঙ্গণে আনবার জন্য পুলিশকে মহামান্য বিচারক আদেশ জারী করেছেন, চোখটা আটকে গেল ওখানে। কয়েকবারই পড়লাম লাইনগুলো। না কোথাও রেহানা, সেলিনা বা আফরোজ বেগমের কথা নেই।
চিন্তায় আছি ভীষণ। রেহানাদের যা অপমান ওদের হাতে হতে হয়েছে, ওতেই যেন শেষ হয় সব আর যেন কোন অপমান আদালত প্রাঙ্গণে না হয়। কারণ যদি ওদের সাক্ষী হিসেবে এই আদালতে আনতে হয়, তা হলে উকিলের উল্টো পাল্টা প্রশ্নে বেআব্রু হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।
কলেজ থেকে সোজা বাড়ী না ফিরে শিয়ালদা স্টেশান এবং সেখান থেকে ট্রেনে ঢাকুরিয়া, কে আমাকে নিয়ে এল আমি জানিনে। আমার এখানে আসার কোন পূর্বপরিকল্পনা ছিল না অথচ এলাম। কতদিন পরে। ঘড়িতে দেখলাম প্রায় ৪/৩০, তার মানে মিনতি সেনের ফিরে আসার সময় হয়েছে, আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম বাড়ীর দিকে।
বেল দিতেই এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন। কাকে চাই? আমি বললাম, পিসি, মানে মিনতি সেন আছেন? আপনি ভিতরে আসুন। ভিতরে গিয়ে দেখি, মিনতি সেনের বাবার অবস্থা বেশ খারাপ। মিনতি সেন তাই কয়েকদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। আমাকে দেখে বললেন, প্রান্তিক তুমি এসেছো? তোমার কথাই ভাবছিলাম। কয়েকদিন ধরে বাবা শুধু তোমার নাম করছে। তুমি একটু বোস বাবার পাশে। আমি বসলাম তারপর আস্তে ডাকলাম দাদু। বৃদ্ধ চোখ মেলে তাকালেন। দৃষ্টি ঘোলাটে। তবু আমাকে চিনতে পারলেন, আমার একটা হাত তার দুর্বল হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে বললেন, এতদিন আসনি কেন দাদু। আমি আর কি বলব, উনি আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলেন। মিনতি সেন মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এলেন। বললেন, কলেজ থেকে আসছ? হ্যাঁ। তারপর যে ভদ্রমহিলা আমাকে দরজা খুলে দিয়েছিলেন তাকে বললেন, জবার মা, তুমি প্রান্তিক কে কিছু খেতে দাও। আমি বললাম দরকার নেই পিসি। উনি বললেন, দরকার তোমার নেই, কিন্তু আমার আছে। তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে এসো তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। আমি আর অন্যথা না করে তাড়াতাড়ি খেয়ে এলাম। উনি বললেন স্টেশান পেরিয়ে গেলে দেখবে ডাঃ অমল মজুমদারের চেম্বার। তোমাকে একবার তাকে নিয়ে আসতে হবে। যাবে আর আসবে। একদম দেরি করবে না।
০৬. বেরিয়ে পড়লাম
আমি আর কোন কথা না বলে বেরিয়ে পড়লাম। চেম্বারে তখন রোগী ভর্তি, এদের সবাইকে এড়িয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে তার কাছে। তাই একজন রোগী ভিতর থেকে বেরোতে জোর করে ঢুকে পড়ি ভিতরে ডাঃ বাবু খুব রেগে গেলেন কি ব্যাপার এ ভাবে না বলে ভিতরে ঢুকে পড়ছো যে। আমার উপায় নেই, আপনাকে একবার আমার সঙ্গে যেতেই হবে। কোথায়? এই কাছেই। অসম্ভব। আমি কাকুতি মিনতি করে বললাম, অসম্ভব হলে চলবেনা ডাঃ বাবু আমার দাদুর অবস্থা খুব খারাপ। সেতো বুঝলাম, কিন্তু চেম্বারের এত রোগী এদের ফেলে যাই কি করে? আমি বুঝতে পারছি আপনার অবস্থা। কিন্তু ডাক্তার বাবু এদের অবস্থা তো খুব খারাপ নয়, ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারবে। কিন্তু আমার দাদু যে সে সময়টুকও পাবেন কীনা জানিনা। কে তোমার দাদু? আমি বললাম, আপনি নিশ্চয়ই মিনতি সেনকে চেনেন? ওনার বাবা। আমার কথা শুনে যে ভাবে ডাঃ বাবু উঠে পড়লেন, তাতে বুঝতে পারছি রোগী বা মিনতি সেনদের ডাঃ বাবু ভালভাবেই চেনেন। বললেন চল, আমি একটা রিক্সা ডাকতে চাইলে উনি বললেন, তুমি আমার গাড়ীতে এসো। ডাঃ বাবু এলেন। রোগী দেখলেন। মিনতি সেন বললেন কাকাবাবু কি হবে? উনি বললেন, ভয় নেই মা। আমি একটা ইনজেকসান দিচ্ছি ঘুমাবে। তবে তোমরা কেউ না কেউ কাছে থাকবে। জাগলে যেন কাউকে না কাউকে দেখতে পায়। মিনতি সেন বললেন, কোন হাসপাতাল বা নাসিংহোমে ভর্তি করার প্রয়োজন আছে? কোন প্রয়োজন নেই মা। তুমি সর্বক্ষণের জন্য একজন কাজের লোক রাখ। যিনি প্রয়োজনে সব সময় ওনার কাছে থাকতে পারে। আপনার কথা মতো রেখেছিতো কাকাবাবু। রেখেছো? খুব ভাল করেছো। আচ্ছা বলত মা, উনি কি চান? মানে? কাউকে দেখতে চান কিনা, হা কাকাবাবু, প্রায়ই প্রান্তিকের নাম বলে। ও কেন আসেনা? লাস্ট কবে এসেছিল? কে সে? আমার ভাইপো। সেকি এসেছে? আমি এগিয়ে এসে বললাম আমার নাম প্রান্তিক? ও তুমি। ভেরি গুড ইয়ংম্যান। তুমি এখানে থাক কোথায়? নর্থ ক্যালকাটায়? তা তুমি মাঝে মাঝে আসতে পারতো? তারপর বললেন মাঝে মাঝে আসবে বুঝেছ? মিনতি সেনকে বললেন উঠি মা। চেম্বারভর্তি রোগী। উনি উঠে পড়লেন। যাওয়ার সময় আমায় ইশারায় ডাকলেন। আমি গাড়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালে উনি গাড়ীতে উঠতে উঠতে বললেন, এমনিতে ভাল আছেন, ভাল হয়ে যাবেন, তুমি কিন্তু মাঝে মাঝে এস, আচ্ছা চলি।
