দুর্গাপুরে একটি ফার্মে ম্যানেজারের পোস্টে চাকরি করতেন প্রতীমবাবু। কিন্তু ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন লিলুয়াতে। ওখানে গিয়েই জানতে পারলাম। পরের দিন আবার তাই লিলুয়া। বেশ বড় ফার্ম। এখানকার সিনিয়র ম্যানেজার প্রতীম চৌধুরি। বড় বড় অক্ষরে নামের ফলক। আমি একজন স্বাক্ষাৎ প্রার্থী। স্লিপ দিয়ে অপেক্ষা করছি। প্রায় ১৫ মিনিট পরে, অনুমতি এল। আমি ঘরে ঢুকতেই উনি একবার চোখ তুলে তাকালেন আমার দিকে। সুন্দর সৌম্য চেহারা। প্রায় ৬ ফুট লম্বা গৌরবর্ণ ছিপছিপে মানুষটি। কানের কাছে জুলপির ২/১টা চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু তা সযত্নে রক্ষা করা হয়েছে। গোফ কামানো। দামী ফ্রেমের চশমার মধ্যে দিয়ে চোখের ঈশারায় বসতে বললেন।
বেল দিতেই এক ভদ্রমহিলা ঢুকলেন। বললেন দু কাপ কফি। আমি অবাক হয়ে ভাবছি উনিকি তবে সব সাক্ষাৎ প্রার্থীকে কফি খাওয়ান? কি জানি? পরিমলবাবুও কলকাতার একটা মার্চেন্ট ফার্মে কাজ করেন। কোন দিনতো যাইনি, তাই জানিনে নিয়ম কানুন। কফি আসতেই, উনি এক পেয়ালা তুলে নিয়ে বললেন, কফিটা নিন, তারপর বলুন আমি আপনার জন্য কি করতে পারি? আমার জন্য? আমার ঘরেতো আর কেউ নেই। হাসলেন উনি, তারপর বললেন, ও আপনি ভাবছেন আপনার জন্য কফি কেন? না, আপনার জন্য আলাদা করে কফির অর্ডার দেওয়া হয়নি। আসলে আপনি আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনায় লিখেছেন, প্রয়োজন ব্যক্তিগত। তাই আপনাকে ইচ্ছে করে দেরি করে ডাকা হয়েছে। আমার সাক্ষাতের নির্দিষ্ট সময় শেষ। অবশ্য এর মাঝে কয়েকবার আপনার নামটায় চোখ বুলিয়ে নিয়েছি, আগে কখনো আপনার নাম শুনেছি কিনা! নিশ্চয়ই শোনেননি। আপনি কি মনে করেন শোনা উচিৎ? হাসতে হাসতে বললাম, কি যে বলেন। না না আমি সে সব কথা বলিনি। কথার পরে কথা বলতে হয় তাই বলা। উনি বললেন, তাহলে বলুন আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, আমার নাম প্রান্তিক। হ্যাঁ, মিপে তাই লিখেছেন। কি করেন আপনি? আমি ওনাকে বাধা দিয়ে বললাম, আপনি একজন কর্মব্যস্ত মানুষ। হয়তো অনেক অমূল্য সময় আমি নষ্ট করে দিচ্ছি। তবু এসে যখন পড়েছি, তখন কি আরেকটু সময় আমায় দিতে পারবেন? যদি বলেন, সম্ভব নয় তাহলে কবে সম্ভব হবে জানালে আমি সেদিন আসতে পারি। কতক্ষণ লাগবে? যদি আপনি কিছুই না বলতে চান তাহলে ১০ মিনিট আর যদি শুনে কিছু বলতে চান তাহলে অন্তত আধঘন্টা। বা আপনিতো বেশ মজার মানুষ। কি করেন? কিছুই করিনা। তবু। আমি এবার ফাঁইনাল ইয়ারের ছাত্র। ও তাহলে তো তুমি বলা যেতে পারে। নিশ্চিন্তে। আর তা হলে আমার পক্ষেও ভাল হয়। কেন ভাল হয় কেন? আসলে আপনি বললে অনেকটা দূরের বলে মনে হয়। তুমি বললে অনেকটা কাছের মনে হয় তাই আরকি। বেশ বল তাহলে।
আমি একটা গলা খাঁকানি দিয়ে বললাম, আপনার বাড়ীতে কে কে আছেন? কেউ। কিন্তু কেন? তাহলে বাড়ীতে গিয়ে বললে ভাল হয়। খুব কি গোপন কথা। মোটেই, কিন্তু অফিসে কথা বলতে বলতে দেখা গেল, আপনার কাজের ফাঁইল এসে গেছে, আমাকে থেমে যেতে হবে। তারপর আবার যখন আরম্ভ করব তখন হয়তো দেখব, যা বলছিলাম তা ভুলে গেছি, উনি একটু হাসলেন শুধু। তারপর বললেন, তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পার। আপাতত এখানে কোন ফাঁইল আসবেনা। আমি কি বলব ভাবছি। উনি বললেন কই কিছু বললে না। বললাম, আপনার এখানে কেউ নেই, তার মানে বাড়ীর সব কি দেশের বাড়ীতে? তুমি চেন আমার দেশের বাড়ী? না চিনি না, তবে জানি। তারপর জানতে চাই আচ্ছা আপনার মা বাবা বেঁছে আছেন এখনো? না ওরা কেউ আর নেই এখন। আপনিতো বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান তাইনা? হ্যাঁ, কিন্তু এত কথা তুমি জানলে কি করে? সে তো পরের কথা, আপনি একা থাকেন মানে …। উনি বললেন তুমি জানতে চাইছো আমি বিয়ে করেছি কিনা তাইতো। হ্যাঁ। না করিনি। এরপরে তুমি জানতে চাইবে কেন করিনি। ঠিক তাই। কেন তোমার এসব কথা জেনে কি হবে। আমি বললাম আসলে আমি একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উপর সমীক্ষা চালাচ্ছি। যারা বিভিন্ন প্রাইভেট কনসার্নে এক্সিকিউটিভ আছেন, তাদের ব্যক্তিগত জীবন কাজকে কি ভাবে প্রভাবিত করে। উনি বললেন ভেরি ইনটারেস্টিং। এমন কোন সমীক্ষা হয়েছে বলেতো জানা নেই। তা কতদিন তুমি এটা করছ। তা বেশ কিছু দিন হল। কতজনের কাজের ধারা, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব ইত্যাদি সমীক্ষা শেষ করেছে। তা কয়েকজনের হয়েছে। আসলে আমার কাছে আপনার যে ঠিকানা ছিল, তা দুর্গপুরের। আমি সেখানেই গিয়েছিলাম। কিন্তু শুনলাম আপনি আর ওখানে নেই। হ্যাঁ, সেতো অনেক দিন আগের কথা, পরে আমি জার্মানি যাই, এবং সেখান থেকে ফিরে বছর তিনেক হলো আমি এখানে জয়েন করেছি। বললাম খুব ভালকথা, আপনি কি মনে করেন একাকী জীবনে কাজ করা সহজ না সংঘবদ্ধ পারিবারিক জীবন থেকে তা সহজ। দেখ। তোমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। তাহলে আপনি ভাবুন, আমি বরং পরে একদিন আসব। কোন প্রয়োজন নেই, আমার যা মনে হয় তাই তোমাকে বলতে পারি। তাইতো বলবেন, আমিতো আপনি যা মনে করেন তাই জানতে চাই। কি মনে হয় আপনার?
দেখ আমি একাকী থাকি। তাই সময়ও আমার অফুরন্ত ইচ্ছে করলে অনেক কাজ করতে পারি। তবে করেন না কেন? মাঝে মাঝে একঘেয়েমি মনে হয় তাই। এই একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে আপনি কি চান? কি আর চাইব। আমি বললাম পরিবার, সঙ্গ এসবতো জীবনে প্রয়োজন। উনি বললেন মাঝে মাঝে হতাশ মনে হয় নিজেকে। কেন কাজ করব? কার জন্য করবো? তাহলে অবকাশ সময় কাটান কি করে? কাটাবার তো বিভিন্ন উপায় আছে তবে আমার ভালো লাগেনা। কেন? একটা বিস্মৃত অধ্যায় মাঝে মাঝে আমাকে তাড়া করে ফেরে। আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? বল। আপনি কি কাউকে ভালবাসতেন? কেন বলতো? ঐ যে আপনি বললেন না একটা বিস্মৃত অধ্যায় তাই আর কি। কি হবে সে সব কথা শুনে। না আমি জোর করবনা। তবে যে সমীক্ষা আমি চালাচ্ছি, তাতে ঐ বিস্মৃত অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারলে আমার ভাল হতো। আমার কাজের সুবিধা হতো। নাম ধাম গোপন করে ঘটনা বলতে কি আপনার আপত্তি আছে। না তা নেই তবে সে সব অতীত অতীতই থাকুক না। ঠিকই বলেছেন, অতীতের তো অতীতেই থাকা উচিৎ বর্তমানে তাকে টেনে এনে যন্ত্রণা বাড়ানো কেন? কিন্তু অতীতকে ভুলে থাকাকি অতই সহজ? না, স্যার তা মোটেই সহজ নয়। এই যেমন ধরুন, প্রানপনে আপনি আপনার অতীতকে ভুলতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন কি? যদি পারতেন তাহলে তো আপনাকে এই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হতো না। তারপর বললাম আপনার কাছে তা অতীত নয় বলেই তো এখনো অপেক্ষায় আছেন আপনি তাইনা? চমকে উঠলেন প্রতীম চৌধুরী। তিনি কি সামান্য সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন আমাকে?
