রেহানা, একটা মোটা খাম আমার হাতে দিয়ে বললো, এটা নাও। কি এটা। আগে ধর তারপর বলছি। আমি নিলাম ওর হাত থেকে। তারপর খুলতে যেতেই রেহানা বাধা দিয়ে বলল এখন নয়, পরে এক সময় খুলো। কেন? কি আছে এতে। আমার কৃতজ্ঞতা। তুচ্ছ করোনা প্রান্তিক। ও আর সামনে দাঁড়ালো না। আমি ডাকলাম, রেহানা শোন ও আবার এসে দাঁড়ালো আমার কাছে। বললাম বস। ও বসল। আমি বললাম, ওতে কি আছে আমি হয়তো অনুমান করতে পারছি। কিন্তু রেহানা, আমিও তো মানুষ। পশু বা দেবতা নই। ভুল যদি করে থাকি, তার শাস্তি এ ভাবেই দিতে হবে। তোমরা কি ভাবো বলতো আমাকে।
রেহানা আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আমি বললাম তোমার কিছুই বলার নেই? ও বলল, আছে। তবে বল। ওতেই যা বলার বলেছি। আমি বড্ড ক্লান্ত। ও প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। আমি কোন ভাবে ওকে ধরে ফেললাম। কতক্ষণ ওকে ওই ভাবে ধরে ছিলাম মনে নেই। সম্বিৎ ফিরে পেলাম, ও যখন বলল, ছাড়, মা আসছেন। আফরোজ বেগম গরম গরম লুচি, বেগুন ভাজা আর মিষ্টি নিয়ে এলেন। বললেন, রাত অনেকটা হয়েছে, খেয়ে নাও বাবা। আপনি আবার এসব করতে গেলেন কেন? কই আর করলাম। আমাদেরও তো খেতে হবে। আমি দ্বিরুক্তি না করে খেয়ে নিলাম। আফরোজ বেগম বললেন, খাওয়া শেষ হলে একবার সেলিনার সঙ্গে দেখা করে যেও। ও কারো সঙ্গে কোন কথা বলছেনা। বলছে খাবেনা। আমি বললাম কেন? কি জানি বাবা, ওকেতো কোনদিনও বুঝিনি। আজই বা বুঝবো কি করে। আফরোজ বেগম চলে গেলে রেহানা তাকালে আমার দিকে। ওর চোখে কি যেন মায়া আছে। বেশীক্ষণ তাকাতে পারিনা, আপনিই চোখ নামিয়ে নিতে হয়। বললাম, কি হয়েছে বলত, কি করে বলি প্রান্তিক। সত্যিই মাঝে মাঝে নিজের উপর ঘৃণা হয়, ধিক্কার হয়। বললাম তুমিও চল, ও আবার তাকালো আমার দিকে তার সেই মায়াবী চোখ তুলে। বলল না তুমি যাও প্রান্তিক। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না।
সেলিনা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ডাকলাম, সেলিনা। কোন উত্তর নেই। আবারও ডাকলাম, তেমনি নিরুত্তর। এবার ওর কপালে হাত ছোঁয়াতে চোখ মেলে তাকালো। বলল, আপনি এখনো যাননি প্রান্তিক ভাই? আমি ওর কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললাম তোমার কি হয়েছে বলত। হাসপাতালে কি কিছু হয়েছে? কেন বলুনতো। না মাসীমা বললেন তুমি কারো সঙ্গে কথা বলছনা। এমন কি খাওনি পর্যন্ত। আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা। তা কি হয়। সেই কখন খেয়েছে। খাবেনা কেন? খেয়ে নাও। বোঝনা কেন, তুমি না খেলে এরা খায় কি করে? আজ দুদিন ধরে তুমি রেহানার কথা একবারও জিজ্ঞাসা করনি। এখানে এসেও তুমি ওকে এড়িয়ে গেলে, কেন? ও সে সবের দিকে না গিয়ে বলল, কাল থেকে তো আর আপনি আসবেন না, তাই না? কে বলেছে? আমি জানি, আর আপনি আসবেন না। তারপর নিজেই বলল, আসতে হবে না। কেন আসবেন? আমরা আপনাকে দুঃখ ছাড়া কি দিয়েছি? আমি অবাক হয়ে বললাম, এসব তোমাব মাথায় কে ঢুকিয়েছে? তারপর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, যতদিন না তুমি সুস্থ হয়ে আবার বক্সিংএর রিংএ ফিরে না যাচ্ছ ততদিন রোজই আসব। ম্লান হেসে সেলিনা বলল, কেন মিথ্যে সান্ত্বনা দেন প্রান্তিক ভাই। আমিতো আর বক্সিংএর রিংএ ফিরতে পারবনা সেতো আপনি ভাল ভাবেই জানেন। তারপর যেন আপন মনে বলল, দরকার নেই রোজ আসার কিন্তু মাঝে মাঝে আসবেন বলন। বলে একটা হাত আমার ওর নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে বলল, কেন যে প্রান্তিক ভাই বেঁচে ফিরলাম। এতদিনে আপনার পরিচিত সেলিনার যে মৃত্যু হয়েছে। দুটিচোখ দিয়ে ওর জল গড়িয়ে পড়ল। একবার ভাবলাম মুছে দিই। পরে মনে হল, না, ওর কান্নার প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন। বললাম ছাড় আমাকে যেতে হবে। রাত হয়েছে অনেক। ও আমাকে ছেড়ে দিল। তারপর বললাম, শোন যদি আগের মত হওয়ার চেষ্টা না করো তাহলে আর কোনদিন আসবোনা। আরেকটা কথা, নিয়মিত খেয়ে নেবে। মাকে কষ্ট দেবেনা। আপনি কষ্ট পাবেন না? জানিনা বলে ওর কাছ থেকে বেরিয়ে দেখি রেহানা দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর ওর সঙ্গে কোন রকম কথা না বলে বেরিয়ে এলাম।
বহুদিন পরে অশ্রুকণার সঙ্গে দেখা হল কলেজ ক্যান্টিনে, অথচ কি অদ্ভুত আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতে উদ্যত হতেই আমি বললাম, কি ব্যাপার চিনতে পারছনা? কেমন যেন হঠাৎ দেখা হয়েছে, তারই আনন্দের রেশ টেনে বলল, আরে প্রান্তিক। তুমি কি গ্রামের বাড়ীতে গিয়েছিলেন নাকি? বহুদিন কোন খোঁজ টোজ নেই। খোঁজ কি রাখার চেষ্টা করেছে? কেন বলত। না তা হলে জানতে পারতে আমি কোথায় আছি। ও তাই বল। তবে এর মাঝে তোমার পিসির সঙ্গে দেখা হয়েছিল জান? আমার পিসি? কই বলেননি তো। তোমার সঙ্গে দেখা হলেতো বলবে। আমি আসলে তোমার মিনতি পিসির কথা বলছি। মনে মনে বললাম মিনতি সেন। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার কি এখন ক্লাস আছে? না। তাহলে এস না চা খাওয়া যাক। আচ্ছা চল। চা ও টোস্টের অর্ডার দিলাম। তারপর ওকে বললাম, হ্যাঁ অনেকদিন যাওয়া হয় না মিনতি পিসির ওখানে। কেন যাওনি কেন? তোমার কথা অনেক করে বলেছিলেন। তোমার দাদুর অবস্থাও খুব ভাল না। প্রায়ই তোমার নাম করে বলে, প্রান্তিক এসেছে? পিসি যখন বলেন, যে না আসেনি, তখন আবার চুপ করে যান, তুমি একবার যেও প্রান্তিক। তোমার পিসি ও দাদু তোমার কথা খুব ভাবেন। আমি বললাম, হ্যাঁ এবার একদিন যাব। মনে মনে ভাবছিলাম তার আগে একদিন প্রতীম বাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। ও বলল, কিছু বলছ? না, কিন্তু কণা, তুমি আমাকে জানাওনি কেন? আমিতো জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার পিসি এমন করে না করলেন যে, আমি তোমার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করিনি এতদিন, যদি দেখা হলেই বলে ফেলি। তাহলে আজ কেন বললে? কি করে জানব এত দিনেও তোমার যাওয়া হয়নি। চা খেয়ে উঠে পড়লাম। ও বলল, চললে? হ্যাঁ, আমার ক্লাস আছে। ও আমি উঠতেই বলল, রেহানাকে দেখছিনা, ওকি কলেজে আসেনি? আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। বলে আর কোন কথার অপেক্ষা করে বেরিয়ে এলাম।
