আমি ওকে বললাম, ঠাট্টা কিনা জানিনা, তবে এখানে যদি আসি তবে তোমার জন্যই আসবো। তপতী। আর কোন কথা না বলে ওর কাছ থেকে কোন প্রতি উত্তর না শুনেই, আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলাম। না, রেহানা ততটা সুস্থ হয় নি। আমাকেই তাই আসতে হল সেলিনাকে নেওয়ার জন্য। হাসপাতালের সমস্ত কিছু মিটিয়ে দিয়ে আমি যখন ওকে নিয়ে আসব, সেই সময়ের মধ্যে একবারও আসেনি তপতী। আমি আয়াকে দিয়ে ওকে সংবাদ পাঠালাম। তবুও এলোনা। সেলিনা বলল, প্রান্তিক ভাই তপতীদি আসবেনা। আমি কি কোন অন্যায় করেছি ওর কাছে? নানা তুমি কেন অন্যায় করবে। তুমি একটু বোস, আমি আসছি।
ডিউটি ঘরে গিয়ে দেখি, তপতী তার দু হাতের মধ্যে মাথা গুঁজে বসে আছে। আমি ডাকলাম, তপতী। ও তাকালো আমার দিকে। কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো লাল। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। ও শুধু বলল, আমি যাব না প্রান্তিক। আমি কিছুতেই সেলিনার কাছে যাবো না। কেন? কেন জানতে চাইছো? আজ কতদিন হয়ে গেল। এই মান অভিমানের অতীত হয়ে গেছি আমি। নিজেকে শুধু যন্ত্রের মত মনে হয়েছে এই দীর্ঘ বছরগুলো। আর আজ এতগুলো বছর পরে মেয়েটা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে প্রান্তিক। সবকিছু। বললাম, এ তোমার ভুল তপতী। বল জীবন তোমার কানায় কানায় ভরে দিয়েছে। তোমার স্বজাতি নয়, তোমার ধর্মেরও নয়, অথচ কি তীব্র অভিমানে ওর সামনে যেতে পারছনা, এর কি কোন মূল্য নেই তপতী? আমি তো দেখেছি অনেক দিন, কি ছটফটে আর অফুরন্ত জীবনশক্তির একটা মেয়ে, এই আঘাতে মিইয়ে গেছে। ওকে তুমি ভুল বুঝো না তপতী। তপতী বলল আমি ওকে ভুল বুঝেছি, এই কি তোমার মনে হলো? তারপর বলল তুমি জানো প্রান্তিক আমার বুকের মধ্যে যে কি হচ্ছে? এখানে তো সম্ভব নয়, অন্য কোথাও হলে তোমাকে বলতাম, আমার বুকে হাত দিয়ে বলতে প্রান্তিক সেলিনা কি আমার কেউ নয়? ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল তপতী। অদ্ভুত এই মানব চরিত্র, কার জন্য যে কোথায় কে অপেক্ষা করে আছে কেউ জানে না। কিন্তু না, পারলামনা, ওর চোখের জল মুছিয়ে দিতে। শুধু বললাম, চোখের জল মুছে ফেল তপতী। আঘাত তোমার যতই তীব্র হোক তুমি বড়। সেলিনা চাইছে তুমি একবার অন্তত এস ওর কাছে। নিজের আঁচলে চোখের জল মুছে নিয়ে ও বলল, তুমি এগোও প্রান্তিক, আমি আসছি।
আসামাত্র সেলিনা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার কথা তোমার মনে থাকবে তপতীদি? ওরে পাগলি মেয়ে তোকে কি আমি ভুলতে পারব। তুই যে আমাকে কি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিস তুই নিজেও তা জানিসনে। তোকে শুধু একটা অনুরোধ জীবনে অনেক ঝড় ঝপটা আসবে, কেটেও যাবে, কিন্তু প্রান্তিককে কখনো কোন দিন ভুল বুঝিসনি ভাই। ঈশ্বর ওর মত মানুষকে মাঝে মাঝে পৃথিবীতে পাঠিয়ে প্রমান করতে চান যে পৃথিবী এখনো, বাসের অযোগ্য হয়নি। সেলিনা তাকালো আমার দিকে, তারপর কি মনে হতেই, হঠাৎ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো তপতীকে। আর তপতী ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে ওর কপালে পরপর কয়েকটা চুমু খেল। সেলিনা বলল, তা হলে তুমি কবে যাচ্ছ আমাদের ওখানে। যাবরে পাগলি যাব! বোধ হয় কান্না চাপতে পালিয়ে গেল তপতী। ট্যাক্সিটা ছাড়বার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও পারলনা।
সারাটা পথ উদাস দৃষ্টিতে, গাড়ীর জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো সেলিনা। একটি কথাও বললোনা আমার সাথে। আমি বললাম, মন খুব খাবাপ লাগছে তাই না? অথচ দেখ সেলিনা, হাসপাতাল থেকে চলে আসার জন্য কি আকুলতা তোমার। আর এখন সেই হাসপাতাল, ওখানকার প্রতিটি মুহূর্ত বার বার তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে। এই হয় সেলিনা। এই ভালবাসা, এই মমতা, এই মুগ্ধ স্মৃতি এটুকু বয়ে নিয়ে চলি বলেই আমবা মানুষ। কিন্তু আমার কথার কোন উত্তর দিল না সেলিনা। একবারও বাইরের দৃষ্টিকে ভিতরে এনে আমার দিকে তাকালোনা।
তারপর বেহানাদের ওখানে যখন পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় ৯টা হয়ে গেছে। রেহানা তার দুর্বল শরীর নিয়ে এগিয়ে এলো। কানের পাশের কপালের ঘাটা প্রায় শুকিয়ে এসেছে, তবে দাগ যে কোনদিন মুছে যাবে না এটা নিশ্চিত। ট্যাক্সি থেকে নামতেই সেলিনাকে জড়িয়ে ধরল রেহানা। কিন্তু তার সাথেও কোন রকম কথা না বলে ভিতরে চলে গেলো সেলিনা। আফরোজ বেগমের অবস্থা এখন অনেক ভালো। সংসারের কাজও একটু একটু করে করা আরম্ভ করেছেন। সেলিনাকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে ওকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। আমি বসার ঘরে বসলাম। রেহানা বলল, চা খাবে? না। সেলিনার কি হয়েছে বলত। কোন খারাপ সংবাদ কিছু আছে? আমি আঁতকে উঠে বললাম, কি খারাপ সংবাদ থাকবে বলতো। না হলে এতদিন পরে দেখা হলো, অথচ কোন কথাই বলল না আমার সাথে। সেতো আমার সাথেও বলেনি সারাটা পথ। গাড়ীর কাঁচ খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটিয়ে দিল। রেহানা বলল কেন ও এসব করছে? আমাদের কি এসব ভাল লাগবে? আমি বললাম রেহানা, হাসপাতালে মানুষ অনেক আশা নিয়ে যায়, ফিরে আসে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে। ও কিন্তু ফিরে এসেছে অনেক স্মৃতি নিয়ে। হাসপাতালের মায়ায় পড়ে গিয়েছে, কাটিয়ে উঠতে তো সময় লাগবে। তারপর জানতে চাই তুমি এখন কেমন আছো? ভালো। ছোট উত্তর। আমি বললাম যখনি জানতে চাই তখনি বল ভাল। কিন্তু তোমার চেহারা যে দিন দিন কত খারাপ হয়ে যাচ্ছে দেখ কি? ও তোমার মনের ভুল, না হলে আমি সত্যিই ভালো আছি। ভালো আছো না ছাই। আসলে তুমি আমার কাছে নিজেকে লুকাচ্ছো। আমাকে কি তুমি একটুও বিশ্বাস করতে পারনা। থাক ও সব কথা, ওই দেখ, তুমি চা খাবে না বলেছো, অথচ মা তোমার জন্য চা নিয়ে এসেছেন, চাটা খাও। আমি আসছি। আফরোজ বেগম বললেন, তোমার ঋণ কি ভাবে শোধ করব জানিনা। আমি বললাম, ছিঃ মাসীমা। ছেলের কাছে কি মায়ের কোন ঋণ থাকে নাকি? এ কথা শোনাও যে পাপ। আফরোজ বেগম আর কোন কথাই বলতে পারলেন না। রেহানা আসতে, উনি আবারও ফিরে গেলেন নিজের কাজে।
