অসম্ভব ওঠানামা করছে তার হৃদপিন্ড। নাড়ীর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে তার বুকের ওঠা নামা। তামি হাতটা সরিয়ে নিলাম। বললাম পিসি থেকে গিয়ে ভালো করে স্নান করো, আমি গীজারে জল গরম করে দিচ্ছি। যাব তার আগে আমাকে বলতো, তুমিও কি আমার সঙ্গে নিখুঁত অভিনয় করছো? একদিন তুমিও কি এমনি করে ছেড়ে যাবে আমাকে। আবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন পিসি। আমি পিসিকে আমার বুকের পরে টেনে নিয়ে বললাম না পিসি কোনদিন তোমাকে ছেড়ে যাব না। আগেও বলেছি, আজ আবারও বলছি, তুমি তাড়িয়ে না দিলে আমি কোথাও যাব না। সত্যি? বলে তিনি আমার ওষ্ঠাধরে এক জ্বালাহীন চুম্বন এঁকে দিলেন। আর আমি? প্রতিদান দিলাম তার কপালে প্রতি চুম্বন এঁকে।
গতদিন কলেজ খুলেছে। ২/৩ দিন যেতে পারিনি, না রেহানার কাছে, না সেলিনার কাছে। তাই প্রথম কলেজ খোলার দিনটা কামাই করতে হল। সকালে চলে গেলাম হাসপাতালে। ডিউটিতে আছে তপতী। আমাকে দেখেই প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলল, তুমি কি প্রান্তিক? আজ তিন দিন তুমি আসনা। রেহানাও আসে না। প্রথম ২ দিন যদিও বা কিছু খাইয়েছি, কাল যে সারাদিন কিছুই খায়নি। সারাদিন সে এক কথা বলেছে না দিদি, হয় প্রান্তিক ভাইয়ের কিছু হয়েছে, না হয় রেহানার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। আমি কিছুই খাবনা। ডাঃ সরকার অনেক করে বোঝালেন কিন্তু তার সেই এক কথা, তোমাদের সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত সে কিছুই খাবে না। তারপর তপতী জানতে চাইল কি হয়েছিল তোমার? শরীর খারাপ, না রেহানার বাড়াবাড়ি কিছু হয়েছে? ওর মা-ই বা কেমন আছেন? কি করে বলি আমার নিজের অবস্থার কথা। রেহানার সংবাদ তো জানিনে ২/৩ দিন। ওতো অন্তত আসতে পারতো। তিন দিন আগে ওর সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, তখনতো ওর শরীর অনেক ভাললছিল। যাকগে, ওসব কথা ভেবে লাভ নেই। আমি তপতীকে বললাম, পিসির শরীরটা কয়েকদিন ধরে ভালো যাচ্ছেনা। আমার তাই, রেহানাদের ওখানে বা এখানে কোথাও আসা হয়ে ওঠেনি। সেলিনা যে এতটা পাগলামি করবে তা ভাবতে পারিনি। যাকগে আমি এখন কি করব বলতো তপতী। ও অবাক হয়ে বলল আমি বলে দেব তোমাকে যে তুমি কি করবে? বললাম, দেখ আমার মনের অবস্থা মোটেই ভাল নয়, এটা ঠাট্টা করার সময় নয়। তুমি সেবিকা সেবাই তোমার ধর্ম রোগীর ভাল মন্দ তুমি যেমন বুঝবে আমি কি তা বুঝব। তাছাড়া আমিতো বুঝতেই পারছি না সেলিনা আমাকে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যাবে না শান্ত হবে। তপতী কি যেন ভাবলো খানিকক্ষণ। তারপর বলল। তুমি দেখা করে যাও প্রান্তিক। না হলে এ বেলাও খাবেনা। বেশ তাই হবে।
আমি যখন সেলিনার কাছে এলাম দেখলাম দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ও। আমার উপস্থিতি টের পায়নি মনে হয় আমিও ডাকিনি তাকে ইচ্ছে করে। একটু পরে এল তপতী। আমি ওকে ঈশারায় না ডাকবার জন্য বললাম। ও একটু হেসে বেরিয়ে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দেখা করার সময় প্রায় আধ ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে, আর দেরি করলে হয়তো কথাই বলা যাবে না। ওর মাথায় আলতো হাত রাখতে আমার দিকে ফিরেই কেঁদে ফেলল। আমি তো ভীষণ অপ্রস্তুত। বললাম, ছিঃ সেলিনা কাঁদেনা। তুমি কাল সারাদিন খাওনি কেন? ও বলল, আমি কিছু খাবনা, আর আপনার সঙ্গে কথাও বলবনা। কেন এত রাগ করছ কেন? এ কয়দিন আসেননি কেন? আপনি আমাকে একটুও ভালবাসেন না, আমি আর এখানে থাকবোনা, আমি আজই বাড়ী চলে যাবো। আমি বললাম পাগলামি করেনা সেলিনা। আমি আজই ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে যাবো। তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম তুমি যে খেলে না কিছু, কাল সারদিন পোকও বদলালে না এতে তপতীদির দুঃখ হয় না? না হয় না। আমার জন্য কারও কোন দুঃখ হয় না। আমি বললাম, তুমিতো এমন ছিলে না। এমন হয়ে যাচ্ছ কেন? তপতীদি যা যা বলেন অবশ্যই করবে। তিনি তোমাকে ভালবাসেন। আমি বিকালে আবার আসবো। রেহানাকেও সঙ্গে নিয়ে আসবো। জানতে চাইল ও কেমন আছে? আগের থেকে ভালো। তারপর উঠে আসার আগে ওর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, তপতীদির কথা শুনবে না? ও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, হ্যাঁ শুনবো। আঃ কি শান্তি।
আমি বেরিয়ে এলাম। আর ও, আমি যতক্ষণ না অদৃশ্য হয়ে যাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে, কি যে চায় ও, কে জানে? মনটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। নিজের চোখের জলকে চাপতে গিয়ে আর এক বার তাকিয়ে দেখি, এক দৃষ্টিতে ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। বললাম, আমি বিকালে আবার আসব। তপতী পাশেই ছিল বলল, অভিমান ভেঙেছে? বাবা। পারও বটে তুমি। কথাটা কেমন যেন বেসুরো লাগে আমার কানে। বললাম, তোমাকে সত্যি অসুবিধায় ফেলেছি তপতী। কিন্তু এ দায়িত্ব তো তুমি নিজেই গ্রহণ করেছিলে। আমি কি তা অস্বীকার করছি? না বরং তুমি তোমার দায়িত্ব ষোল আনার জায়গায় ১৮ আনা পালন করেছে আর তাতেই ওর ধারণা হয়েছে, আমাদের উপর অভিমান করার ওর সত্যি সত্যি অধিকার আছে। তারপর বললাম আর কয়েকটা দিন একটু দেখ তপতী। তপতী বলল, আমার কথায় রাগ করলে প্রান্তিক? কেন রাগ করবো কেন? তোমার উপর কি রাগ করা সাজে? কিন্তু যাকগে সেকথা, তুমি জানকি, ওকে আর কয়দিন হাসপাতালে থাকতে হবে? কাল ওর ব্যান্ডেজ খোলা হবে। সব ঠিক থাকলে কালই ছেড়ে দেওয়া হবে। সত্যি বলছ? নীরব আনন্দে দুচোখ আমার যেন উছলে উঠছে। তারপর বললাম, একেতো ডানপিটে মেয়ে, তারপর মা ও দিদিকে ছাড়া। এই হাসপাতালের বন্ধ ঘরে ওর নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। তা ছাড়া এখানে ও আর একদম থাকতে চাইছেনা। ঠিক আছে তুমি আর চিন্তা করোনা, ওকে যাতে ছেড়ে দেয় তার জন্য ডাক্তারবাবুকে যা বলার আমি বলবো। তারপর সম্পূর্ণ প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললো এরপরতো তুমি আর আসবে না তাইনা প্রান্তিক। তপতীর একথার মানে হয়তো খানিকটা অনুমান করতে পারছি। বললাম, আসব না একথা তুমি ভাবলে কি করে? কেন আসবে? কার জন্য আসবে? গলাটা কেমন যেন ভারি মনে হয় তপতীর। বললাম কে যে কার জন্য কোথায় যায় আর কার জন্য কত কি ভাবে কেউ বলতে পারে? আমিতো তোমার জন্যও আসতে পারি তপতী? আমার জন্য ঠাট্টা করছ?
