বাসায় যখন ফিরলাম, তখন রাত ১১টা বেজে গেছে। ভয়ে ভয়ে বাড়ী ঢুলাম। কোথায় ভাবলাম পিসিকে আজ নতুন কথা শুনিয়ে অবাক করে দেবো, তা নয়। এযে দেখছি আষাঢ়ের মেঘ। আমি বেল দিতেই তিনি গেট খুলে দিলেন ঠিকই, কিন্তু কোন কথা না বলে ভিতরে ঢুকে গেলেন। আমি পিছনে পিছনে এসে দাঁড়ালাম পিসির পাশে। পিসি বললেন, কোথায় গিয়েছিলে? সে অনেক কথা তোমাকে পরে বলব। আর বলার দরকার হবে না। আমার সব জানা শেষ হয়ে গেছে। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে বললাম, তোমার কি হয়েছে পিসি। তুমি এমন করে কথা বলছ কেন? পিসি আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা সাদা খাম, যার উপরে সুন্দর পুরুষালী হাতে নীলাঞ্জনা নাম লেখা। আমার হাতে দিয়ে বললেন আমার ছাড়পত্র। তুমি পড়, তারপর বল আমার কী করণীয়। পিসি খামটা দিয়ে নিজের ঘর থেকে চলে গেলেন যে ঘরে আমি থাকি। আর তারপরে সে ঘরের বিছানায় নিজের দেহটা এলিয়ে দিলেন হয়তো কোন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আমি খামটা খুলে পড়তে লাগলাম।
নীলাঞ্জনা,
তোমাকে আগের মতো হে আমার সন্ধ্যাকাশের তারা এই নামে ডাকতে পারলাম। জীবনের অনেক গুলো বছর তোমার সঙ্গে কাটিয়ে গেলাম নিখুঁত অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে। অভিনয়ও তো কখনো কখনো ভালবাসায় পর্যবেশিত হয়। একদিন তাই তোমাকে সত্যিই ভালোবেসেও ছিলাম। পেয়েও ছিলাম তোমার কাছ থেকে ভালোবাসার প্রতিদান। কিন্তু যে বন্ধন এতদিন আমাদের এক সূত্রে গেঁথে দিয়েছিল আজ আর তা নেই। কেন নেই তারজন্য কাউকে অভিযোগ জানাব না। অপরাধের বোঝা সব নিজের ঘাড়ে নিয়ে তোমার জীবন থেকে সরে যাচ্ছি। ইচ্ছে করলে আমার বিরুদ্ধে তুমি কোর্টে যেতে পার। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করব না। যে মিথ্যে অভিনয় এতদিন তোমার সাথে নিখুঁত ভাবে করেছি, আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি তার শাস্তি হওয়া উচিৎ। তোমাকে ভুল বোঝাবার জন্য আমি দুঃখিত। হয়তো আর কোনদিনই তোমার সাথে দেখা হবে না আমার। যদি কোন নতুন জীবন বেছে নাও, আমি ঈশ্বরের কাছে তোমার ও তোমাদের মঙ্গল কামনা করবো পরিমল।
একবার নয়, বার বার পড়লাম পরিমলবাবুর চিঠি। তার মানে কাল তিনি যাবেন যুঁথির কাছে। যদি এই জীবনটুকু না জানতাম, ভালো হতো। নীলাঞ্জনা পিসির যেমন অনেক কথা বলার আছে, তেমনি যুথির যে অনেক কথা বল।অহ ৩ ব ক করে। এতদিনে, এত অবিচারের পরেও যুঁথি কি ভুলতে পেরেছেন পরিমলবাবুকে? না। পারেননি, তাহলে নীলাঞ্জনা পিসি বা ভুলবেন কি কবে? যৌবনের উষালগ্ন থেকে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন। আজ যদি হঠাৎ তা বালির বাধের মত ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায় তাতেই কি মুছে যায় তার স্মৃতি রেখা। কি বলব পিসিকে সব মেনে নাও। একথাটা বলা যত সহজ, মেনে নেওয়াটা কি ততই সোজা? ভেবে দেখলাম সত্যিকারের অপরাধ যদি কেউ করে থাকেন তিনি পরিমলবাবু। আবার একথাও সত্য ভালবাসাতে কোন আইন মানেনা যে নিক্তিতে ওজন করে ভালবাসতে হবে। তবুও আমার মনে হয় পরিমলবাবু যদি বলতেন আমি তোমাকে সত্যি ভালবাসি নীলাঞ্জনা, কিন্তু সব ভালবাসাই যেমন মিলনে শেষ হয় না, তোমার আমার ভালোবাসাও মিলনে শেষ হবে না কারণ আমি বিবাহিত আর এদেশের আইন দ্বিতীয় বিয়েকে সমর্থন করবেনা। তাই আমাদের ভালবাসা শুধু ভালবাসাতেই তার পূর্ণতা পাক নীলাঞ্জনা। তাহলে পিসি হয়তো তার নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
আমি এখন বিশ্বাস করি যে পিসির এই দূরে সরে যাওয়াটা সত্যি না হলেও পরিমলবাবুকে একদিন পিসিকে ছাড়তেই হতো। কিন্তু কেন পরিমলবাবু এটা করলেন যুঁথি যথেষ্ট সুন্দরী বলে। আমারতো মনে হয় পিসির চেয়েও সুন্দরী। তাহলে? কেন যুঁথিকে দূরে সরিয়ে রেখে সেদিন পরিমলবাবুকে নীলাঞ্জনার কাছে আসতে হল? কেন মিথ্যা অভিনয়ে নীলাঞ্জনার বুকের মধ্যে পরিমলবাবু তার স্থায়ী আসন অধিকার করে নিলেন? যদি না জানতাম, মিথ্যে সন্দেহ করতাম হয়তো পিসিকে। বলতাম, এ দাম্পত্যকলহ একদিন মিটে যাবে পিসি এটাই নিয়ম, কিন্তু আমি যে জানি সব। আমার জানা কথাটি কি ভাবে যে বলব পিসিকে বুঝতে পারিনা। তবু আস্তে আস্তে ধীর পায়ে আসি একসময় আমার ঘরে যেখানে পিসি আছেন। বসি তার মাথার কাছে। আলতোভাবে আমার ডান হাতটা রাখি পিসির মাথায়। আর তাতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে আমাকে তার বুকের পরে টেনে নিয়ে বলেন, আমি কি করব প্রান্তিক, আমাকে বলে দাও কি আমার করণীয়। পিসির কান্নার অশ্রুবিন্দু ছোঁয়াচের মতন আমাকেও সংক্রামিত করতে থাকে। আমিও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। তারপর বললাম, আমি জানি না পিসি, আমি কিছু জানি না, এখন কি তোমার করণীয়। তারপর একসময় নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে, পিসির আঁচলে পিসির চোখের জল মুছে দিয়ে বললাম, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মেনে নিতে হবে পিসি। জানি আমি যা বলছি, এই মুহূর্তে তোমার ৩. পক্ষে তা মেনে নিতে কষ্ট হবে, কিন্তু এ ছাড়া পথ কি? পিসি কোন কথা না বলে, উঠে বসলেন, তারপর বললেন, জানতাম একদিন এমন কিছু ঘটবে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে ঘটবে তা ভাবিনি। আমি বললাম, তুমি যদি জানতে, তা হলে শুধু সময়ের হেরফেরের জন্য অভিযোগ করে কি লাভ? আমি শুধু বলব, পরিমলবাবু যতই নিখুঁত অভিনয় করুন না কেন তুমিতো করনি। তোমার ভালবাসা, তোমার একনিষ্ঠতা তাকে তোমার কাছে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে কীনা জানিনা। কিন্তু কেউ ছোট হয়ে গেল বলে তুমি নে ছোট হবে। পিসি বলেন, তোমার কথা ভাববে প্রান্তিক। একদিন মনে করতাম এত কাজ না করে ও একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসুক, তাতে ও-ও বাঁচবে আমিও বাঁচব। কিন্তু শেষের সে দিন যখন সত্যিই এল তখন আমার বুকের মধ্যে এত ধড়ফড় করছে কেন? বলে তিনি আমার একটা হাত টেনে নিয়ে রাখলেন তার বুকের ওপর।
