ততক্ষণে ট্রেনটি ব্যারাকপুর স্টেশনে ঢুকে পড়েছে। সবাই নামার জন্য ব্যস্ত। আমি বললাম, কি হলো নামবেন না। হ্যাঁ নামব। এ ট্রেনের শেষতো এখানেই, অত তাড়াহুড়োর কি আছে? সত্যিইতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই। এই জন্যই আমার আপনাকে ভীষন ভালো লেগেছে। মানে? এতক্ষনে বুঝেছি, আপনি ধৈর্য্য ধরতে জানেন। জানেন এটা মেয়েদের একটা বিশেষ গুন। আপনি বুঝি মেয়েদের খুব ভালো ভাবে চেনেন। এই দেখুন আপনি কেমন অবাস্তব কথা বল্লেন। মেয়েদের চেনে না এমন কেউ আছে নাকি? মা, বোন, বৌদি, পিসি, মাসি এমন কি স্ত্রী পর্যন্ত সবাইতো মেয়ে। আপনি কি বলতে চান এদের আমি চিনিনা? তারপর বললাম, না এবার নামতে হবে, ট্রেনে আর কেউ নেই দেখছি।
আমরা প্লাটফরম থেকে বেরিয়ে এলাম। যুঁথি বললেন, কই আপনার বন্ধু নেই? না দেখছিনা। তা হলে কি করবেন? হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললাম, চলুননা ওইতো চায়ের দোকান, ওই দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাড়ে চা খাওয়া যাক। আপনার বোধহয় মাঝে মাঝেই চা তেষ্টা পায়। মাঝে মাঝে নয়, তবে সঙ্গে কেউ থাকলে চা খাওয়ার একটা বিশেষ জেদ চেপে যায়। শুধু চা আর কিছু খেতে ইচ্ছে করেনা? না করেনা, কারণ পকেট ওর বেশী পারমিট করে না। আবারও হেসে উঠলেন যুঁথি, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ট্রেন প্রায় ৪০ মিনিট পরে ছাড়বে, আমার বাড়ী কাছেই, যদি আপত্তি না হয় তা হলে চলুন না, বাড়ীতে চা করে খাওয়া যাবে। আবারও সেই মুখচোরা হাসি। বুঝতে পারছি আমার কথাবার্তা তার কাছে যেন হঠাৎ পাওয়া মজার সামগ্রী। খুব গম্ভীর কিন্তু হতাশ কণ্ঠে বললাম। যেতে তো ইচ্ছে করে কিন্তু বাড়ীতে কেউ যদি কিছু ভাবেন। ভাবলোই বা। মানে? মানে আবার কি, যদি কেউ কিছু ভাবতে চান, ভাববেন, তাতে আপনার কি। আমিতো আপনার বন্ধু কি তাই না? কিন্তু ওরা যদি বিশ্বাস করতে না চান। ওদের বিশ্বাসে কি যায় আসে, আমিতো বিশ্বাস করছি। আমি অবাক হয়ে বললাম সত্যি? কেন আমাকে আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। না ঠিক তা নয় আসলে। কি আসলে? আসলে আপনি সত্যিই বলছেন তো যে, আমি আপনার বন্ধু। কেন আমার বন্ধু হতে আপত্তি আছে আপনার না ঠিক তা নয়। তারপর বললাম আপনি আমাকে কতটুকু চেনেন? যতটুকু চিনি তাতেই চলবে। চলুন এবার।
সত্যি কাছেই বাড়ী। একতলা, ছিমছাম, সত্যিই সুন্দর বাড়ীটা। ছোট বাড়ী, উনি নিজের চাবি দিয়ে তালা খুলে ভিতরে এলেন। ছোট্ট বসার ঘর। এক দেওয়ালে দেওয়াল ঘড়ি, আর এক দেওয়ালে একটা বড় ফটো সুন্দর করে বাঁধানো। এগিয়ে ভাল করে দেখি পরিমলবাবুর ছবি। আমি বললাম, আপনি এখানে একাই থাকেন? হ্যাঁ। দেওয়ালের ছবিটির দিকে তাকিয়ে বললাম ওটা কার ছবি? আমার বন্ধুর। আপনার বন্ধু? হ্যাঁ। আমাকে তো আপনি বন্ধু বললেন তাইনা? হ্যাঁ। তাহলে এবার আমার একটি ছবি বাঁধিয়ে আপনাকে দিয়ে যাব। কেন? বা এক বন্ধুর ছবি রাখবেন, আরেক বন্ধুর রাখবেন না।
আবার সেই মন পাগল করা হাসি। বললেন, আচ্ছা দেবেন, রাখব? সতি? হ্যাঁ সত্যি? যাঃ তাই হয় নাকি? কি হয়না। উনি আপনার সত্যি কারের বন্ধু হতে পারেন। কিন্তু আমিতো চলতি পথের সাথী হারা বন্ধু মাত্র। যুঁথি বললেন, কেউ সাথী হারা নয়। চলতি পথে কোন সাথী হারিয়ে গেলে নুতন সাথী জুটে যায়। যেমন আপনি। ওর কথা শেষ হতেই হো হো করে হেসে উঠলাম, আর আমার সঙ্গে হেসে উঠলেন যুঁথিও।
মিনিট পাঁচেক পরে কফি, কিছু মিষ্টি এবং নিমকি নিয়ে এলেন যুঁথি। আমি অবাক হয়ে বললাম কফি? হ্যাঁ, আপনি পছন্দ করেন না। ভীষণ ভীষণ পছন্দ করি, কি করে যে আমার মনের কথাটি বুঝতে পারলেন। আবার সেই কৌতুক হাসির রেখা ওষ্টা ধরে বিলিয়ে দিতে দিতে বললেন, মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স আছে জানেন? হা জানি। তা হলে? আমিতো সেই জন্যই ভাবি যারা মেয়ে চায়না বলে …। থাক, বলে থেমে গেলাম।
কফির কাপটা তুলে নিলাম। বললাম, কই আপনি নিলেন না? এই নিই। কফি খাওয়া শেষ হলো। বললাম তা হলে উঠি। আচ্ছা। কিন্তু একটা কথা জানা হল না? কি? আবার কি আমাদের দেখা হতে পারে। আপনিতো বাড়ী চিনে গেলেন, আসবেন সময় করে। আপনি বুঝি একা থাকেন? আপাতত। আচ্ছা আপনাকে চিনবো কি করে? আই মীন কি পরিচয়ে। আমার নাম যুঁথি। এই নামেই এ পাড়ার সকলেই চেনেন আমাকে। আবাল বৃদ্ধ বনিতা যাকেই বলবেন, তারাই চিনিয়ে দেবেন আমার বাড়ী। তা তো না হয় হলো, কিন্তু তারা যদি জানতে চান, আপনি আমার কে হন? তা হলে? আপনার যেমন ইচ্ছে আমার পরিচয় দেবেন। যদি বলি আমার বন্ধু। তাই দেবেন। আচ্ছা যাওয়ার আগে একটি কথা জিজ্ঞাস কবি, ঐ ছবির মানুষটি আপনার স্বামী তাই না? চুপ করে থাকেন যুঁথি। আমি বললাম, আমি জানতাম, তাই বলেছিলাম, ওই ছবির পাশে কিছুতেই আপনি আমার ছবি টাঙাতে পারবেন না। তা উনি কি এখানে থাকনে না? না। কেন? আমাকে না জানিয়ে উনি আবার একজনকে বিয়ে করেছেন তাই। আমি অবাক হয়ে বললাম, সেকি সাংঘাতিক কথা, আপনার মতো একজন সুন্দরী স্ত্রী থাকতেও আবার বিয়ে করেছেন? আপনিতো ওর বিরুদ্ধে কোর্টে যেতে পারতেন। আজ থাক বলে কি যেন একটা সম্বোধন করতে চাইছিলেন আমাকে। বললাম, আমার নাম প্রান্তিক, আপনি প্রান্তিক নামেই ডাকবেন আমাকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, ইস? অনেক দেরি হয়ে গেল। আবেক দিন আসব হাতে সময় নিয়ে। সেদিন শুনবো আপনার কথা। তারপর বললাম না ভদ্রলোক যথেষ্ট অন্যায় করেছেন। দেখতে পাচ্ছি যুঁথির মনটা মেন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি কিন্তু বলেই চলেছি আপনাকে এব; স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে। যুঁথি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কিসের স্থির সিদ্ধান্ত। আমি বললাম, বাঃ আপনিতো কোন অশিক্ষিত গ্রাম্য বধু নন, যে স্বামীর অন্যায় অবিচার মুখ বুজে মেনে নেবেন, কোন উপায় নেই বলে। আপনি শিক্ষিত নারী। প্রচলিত আইন যে জানেন না তাও নয়। তাই আপনার নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ততো আপনাকেই নিতে হবে, অন্যায়কে মেনে নেবেন না প্রতিবাদ করবেন। তারপর হেসে বললাম, যাই হোক, এটা আমার ব্যক্তিগত অনুযোগ মাত্র। আজ তাহলে চলি আবার দেখা হবে। শুভরাত্রি। যুঁথিও বললেন শুভরাত্রি। কিন্তু তাকে খুব বিষণ্ণ দেখায়।
