আনন্দে চিক্ চিক্ করে উঠলো ভদ্রমহিলার চোখ। পরিমলবাবু বললেন, সেই প্রথম দিনের মতো ফিরিয়ে দেবে নাতো। তোমার মনে আছে সেদিনের কথা। মনে থাকবেনা কেন? আজো সেদিনের কথা মনে পড়লে অপমানের জ্বালায় আমি কেঁপে উঠি। তাই বুঝি। হ্যাঁ যুঁথি তাই। তবুও তো ভুলতে পারলেনা। না পারলামনা। তারপর বললেন, হয়তো পারতাম তবে পারলে না কেন? ওরা ক্যান্টিনের বাইরে একটা ফাঁকা জায়গা বেঁছে নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমার যে কি হল আমি কিছুতেই পা নাড়াতে পারছি না। পরিমলবাবু বললেন পারলাম না তোমার জন্য? আমার জন্য? হ্যাঁ তোমারই জন্য। আরো বললেন, কারণ আমি কথা দিয়েছিলাম, আমার সন্তানের মা তুমি ছাড়া আর কেউ হবে না। বিজয়িনীর হাসি দেখা গেল যুঁথির মুখে। বললেন, কিন্তু আমি যে শুনেছি সন্তান দেওয়ার মতো ক্ষমতাই তোমার নেই। তাই বুঝি। বেশ কালতে যাচ্ছি। পরীক্ষা দেবে? হ্যাঁ পরীক্ষাই দেব, কিন্তু পাশ করলে কি দেবে বল? তার আগেতে প্রবেশাধিকার চাই। সেটা পাও আগে। তার মানে এখনো তোমার সেই হেঁয়ালি। আমার জন্য কি তোমার কোন মায়া হয় না? যুঁথি বললেন কালতে যাচ্ছ? কাল বলব। কাল কেন আজ বলা যায় না। হয়তো যায়, কিন্তু এখনো আমার নিজেকে জানা হয়নি। যাকগে চলি। চল তোমাকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি। কোন দরকার নেই। তুমি চলে যাও। আমি একাই যেতে পারব। বেশ জোর করবনা।
পরিমলবাবু সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেলেন। আর যুঁথি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে নেমে এলেন। টিকিট কাউন্টারে এসে টিকিট কাটলেন। হ্যাঁ ব্যারাকপুর এর টিকিট। আমি নিজে তার পিছনে দাঁড়িয়ে ব্যারাকপুরের টিকিট কাটলাম।
চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে খুব কিন্তু চায়ের ফেরিওয়ালা, অন্যদিকে থাকায় আমি জোবে ডাকলাম, এই চা। কিন্তু ও বোধ হয় শুনতে পায়নি। ও অন্য কম্পার্টমেন্টে চলে গেল। আমি আপন মনে বললাম, ভীষণ চা তেষ্টা পেয়েছিল কিন্তু চাওয়ালা শুমতেই পেলনা। হাসলেন যুঁথি। হাসলে ভীষণ সুন্দর লাগে ভদ্রমহিলাকে। ভদ্রমহিলার চেহারার মধ্যে এমন একটা আলাদা জৌলুস আছে যা যেকোন পুরুষকে তার দিকে তাকাতে বাধ্য কববে। উনি নিজের ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলে আমি বললাম, না থাক আপনি খান। অবারও হাসলেন যুঁথি। লজ্জা করছে? ছেলেদের লজ্জা আমার কাছে কেমন বোকা বোকা মনে হয়। আমি বললাম আমারও তাই মনে হয়। কি? ঐ যে আপনি বললেন না লাজুক ছেলেদের আপনার কেমন বোকা বোকা মনে হয়।
ট্রেনের যাত্রীরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সুতরাং আমাদের দিকে তাকাবার তাদের সময় কোথায়? তবু যে ২/১ জন আড়চোখে তাকাচ্ছেনা তা হলপ করে বলা যায় না। যুঁথি বললেন, তাই বুঝি। বুঝতে পারছি যতটা বোকা তিনি আমাকে মনে করেছিলেন আমি যে তা নই এটা বুঝতে পেবেই একটা সমীহের দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। বললেন আপনি তো ভারি সুন্দর কথা বলতে পারেন। আপনি কি ব্যারাকপুরেই থাকেন? এত জায়গা থাকতে হঠাৎ আপনার ব্যারাকপুরের কথা মনে হলো কেন? আস্তে আস্তে বললেন, আপনাকে আমি টিকিট কাউন্টার থেকে লক্ষ কবছি। আপনি ব্যারাকপুরের টিকিট কেটেছেন তাও দেখেছি। আমি হেসে ফেললাম। হাসলেন যে। না এতলোক থাকতে আপনি আমার গতিবিধি লক্ষ কবেছেন কীনা তাই। তারপর বললাম না আমি ব্যারাকপুর থাকি না। তবে আমার এক বন্ধুর ওখানে অপেক্ষা করার কথা, কি জানি অপেক্ষা করে আছেন না চলে গেছেন। চলে গেলে তো খুব দুঃখের কথা। কেন দুঃখ হবে কেন? বা দুঃখ হবে না, আপনি এত কষ্ট করে গিয়ে দেখলেন যে যার থাকার কথা তিনি নেই। এতো দুঃখেরই কথা। আমি খুব গম্ভীর ভাবে বললাম। আমি কোন কিছুকে মূল্যহীন মনে করিনা কারণ উনি না থাকলেও আমার সঙ্গে তো একজন নতুন বন্ধু রয়েছেন। কে? কেন আপনি? অবাক হয় যুঁথি? এ ছেলেটি বলে কি? মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে যে অধিকাংশ ছেলের লেজেগোবরে অবস্থা হয়, এ ছেলেটির মধ্যেতে তার বিন্দুমাত্র লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কত সহজ এবং স্বাচ্ছন্দ্য। কোন আড়ষ্টতা নেই, নেই কোন অস্পষ্টতাও। নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে জানাতে পারে। এমন ছেলেদেরইতো মেয়েদের সাধারণত ভাললাগার কথা। যুঁথির তাই ভাল না লেগে উপায় নেই। এমন একজন সহজ সাবলীল এবং সোজাসুজি কথা বলতে পারে এমন যুবকের সঙ্গে কথা বলতে পারা যে অনেক মেয়ের কাছে ঈর্ষণীয় তাকে অস্বীকার করবে কি করে যুঁথি। বললেন, আমাকে আপনি বন্ধু বলে মনে করেন? অবশই যতক্ষণ ট্রেনে চলছি ততক্ষণ তাতে আপত্তি কি? সময়টাতে অন্তত ভালো কাটবে। যুঁথির যেন আর কোন কথা জোগায় না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। কোন তরফের থেকেই কোন কথা নেই। সামনে একজন রহস্যময়ী সুন্দরী মহিলা বসে আছেন। হোকনা তিনি আমার থেকে বেশী বয়সী তাতে কি? সৌন্দর্যের পরিমাপ কি বয়স দিয়ে মাপা যায়? সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাখা না থাকলে অনেক পুরুষের বুকে যে আগুন জ্বালাবার সৌন্দর্য আকর্ষণ তার আছে তাকে অস্বীকার করা যায় না। আর তা ছাড়া ট্রেনে চলতে চলতে হয় উদাস দৃষ্টিতে বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে হয় না হয় চোখ দুটিকে নিবদ্ধ রাখতে হয় ঠিক আমার সামনে যিনি বসে আছেন তার দিকে। দুটোই সমস্যার। অনেক সময় কথা না বলেও এত কথা বলা যায় যে নিজেকে ক্লান্ত মনে হয়। ঠিক কিনা বলুন? শেষের কথাটায় একটু জোর বেশী দিলাম যাতে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। কিন্তু আমার কথা শুনে হেসে ফেললেন উনি, বললেন না আপনার সঙ্গে সত্যি পেরে ওঠা যাবে না, বললাম আপনি যে বেশীক্ষণ পারবেন না তা আমি জানি। যাক গে সে সব কথা। এবার বলুনতো আপনি কি করেন? যুঁথি সহজ ভাবে বললেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এত খোঁজ নিচ্ছেন কেন বলুনতো? আপনার সঙ্গে হয়তো ভবিষ্যতে আমার আর কোন দিন আর দেখা নাও হতে পারে। হতেও তো পারে। আবার সেই কথার মারপ্যাঁচ। হয়তো যুঁথি মনে মনে ভেবে চলেছেন, ছেলেটার বয়স বেশী নয়, কিন্তু যেকোন বয়সের মেয়েদের সঙ্গে যে তার সাবলীল মেলা মেশার অধিকার আছে তাকে অস্বীকার করা যায় না। হয়তো মনে মনে ভেবে নিয়েছেন যুঁথি যে যতক্ষণ একসঙ্গে পথ চলা হচ্ছে, ততক্ষণ চুকরে না থাকাই ভাল। বললেন আপনার এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পেলেন বলুনতো? ঠিক বুঝলামনা আপনার কথা, উনি বললেন এই যে আমার কথার প্রতি উত্তরে অমন করে বললেন, আপনি যে বেশীক্ষণ পারবেন না তা আমি জানি। এই আত্মবিশ্বাস। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। পাশের যাত্রীরাও চমকে উঠে তাকালেন আমার দিকে ঠিক যুঁথির মতো।
