প্রায় রাত ১১টা। এক গভীর আনন্দ ও বেদনা নিয়ে ফিরে এলাম। অশ্রুকণা বলল কবি বলেছেন, কি যেন একটা কথা, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তারপর যেন আবৃত্তির মত একটু টেনে টেনে উচ্চারণ করল
“দেশে দেশে মোর ঘর আছে
আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া”
আসলে প্রান্তিক তোমার ভাগ্যটাকে আমার ভীষণ হিংসা করতে ইচ্ছে করে। বললাম আমারও। অবাক হয়ে ও বলল তোমারও। হ্যাঁ বন্ধু হ্যাঁ। আজ পর্যন্ত তোমাকে ছাড়া তো কোন পথই খুঁজে পাইনি। এমন অন্ধকে যে পথ দেখায় তাকে হিংসে না করে উপায় আছে?
অনেক রাত হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছেনা। সত্যভূষণবাবুর বাড়ী থেকে যখন ফিরেছি, ওই অতরাতেও অশ্রুকণা গেট বন্ধ করতে করতে বলল, একটু দাঁড়াও। আমি অবাক হয়ে বললাম এতরাতে লেটার বক্স খুলছ যে। অনেকদিন ভোলা হয় না। দেখি যদি কোন চিঠি পড়ে থাকে। সেটার বক্সটাও এমন যে বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই ভিতরে কিছু আছে কি না। একটা চিঠি পাওয়া গেল। উপরে প্রেরকের নাম নেই। এক দিকে শুধু অশ্রুকণার নাম ও তার ঠিকানা দেওয়া। খাম থেকে চিঠিটা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, কি জানি কদিন পড়ে আছে। তারপর ভিতরে ঢুকে, চিঠিটা ওর হাতে দিয়ে বললাম, তোমার চিঠি দেখ কে লিখেছে। তোমার খুব কৌতূহল হচ্ছে? তা একটু হচ্ছে বৈকি। তাহলে তুমিই পড়। কৌতূহলটা নিজেই মিটিয়ে নাও। আসার পথে বলেছিল, সেলিনারা আজ আসবেনা। চিঠিতে জানিয়েছেন, কাল সকালে, এখান থেকে প্রায় ২৫ কি মি দূরে একটা আদীবাসী গ্রামে ওরা আছেন, আমাদের যেতে বলেছেন। আমি একটু কৌতুক করে বললাম, সেলিনার সাহস আছে কি বল? তা আছে বৈকি? আমি কিন্তু পারতাম না। সে তো সত্যভূষণের কথা বলতে গিয়ে তোমার চোখ মুখে স্পষ্ট হয়েছিল। তারপর বলল, আচ্ছা প্রান্তিক, এই যখন তোমার মনের অবস্থা তখন আমাকে এই গভীর জঙ্গলে রেখে, কি ভাবে নির্লিপ্ত থাক। কোথায় আব থাকি। জান কতরাত আমার ঘুম হয় না। ও মৃদু হেসে বলল, এবার নিশ্চয়ই ঘুমাতে কোন অসুবিধা হবে না। হাজার হোক কণকের বরকে নিয়ে তোমার কোন দুশ্চিন্তা নেই। বললাম সে আমি জানিনা কণা, ভাবছি তোমাকে আর এখানে থাকতে দেব না। ও ভয় পেয়ে গিয়ে বলল সে কি কথা। তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে? আমার কাছে। প্রান্তিক এ ভাবে কথা বল না। তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? না যায়নি, তবে যাবে। কি চাও তুমি আমার কাছে? তুমি শুধু আমার এইটুকু চাই কণা। ও বলল, আমি তো তোমারি এই সামান্য কথাটা বুঝতে চাইছে না কেন? কেন আমাকে পাগল করে দিচ্ছ? বললাম, তুমি তোমার দাবী ছাড়বে কেন? দাবীটা কি, তোমাকে নিয়ে ঘর করা, না নিত্য ঝগড়া করা। তারপর মান অভিমান অবশেষে একই জিনিষের অনুশীলন হয়তো। বললাম জানিনা কণা, যে ভাবেই তুমি ব্যাখ্যা কর না কেন, আমি কিছুতেই তোমাকে এখানে একলা রেখে থাকতে পারব না। তবে কি তোমাকে সেলিনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে বলছ? না। তবে? আমি সম্পূর্ণ ভাবে তোমার হতে চাই। তাহলে কি আমাকে মেনে নিতে হবে, সেলিনার মোহ তোমার কেটে গেছে? তাও বলতে পারবো না। রেগে গিয়ে বলল, কিছুই যখন বলতে পারবেনা, তাহলে কেন সে দাবীর অধিকারের বড়াই কর। শোন প্রান্তিক, অযথা রাত করে লাভ নেই। শুয়ে পড়। আমাকে ঘুমোত হবে।
ও অন্য ঘরে চলে গেল। আমি শুধু ভাবতে লাগলাম কেন আমার এমন হচ্ছে। যতই না সেলিনার কথা ভাবতে চাইছি ততবার অশ্রুকণার মুখটা ভেসে উঠছে কেন? আমি কি তবে সারা জীবন ধরে অশ্রুকণাকে চেয়েছি? চিঠিটা পড়েছিল তুলে নিলাম। নিপুণ ভাবে মুখটা কেটে নিয়ে ভিতরের চিঠিটা বের করে নিলাম। সুন্দর চিঠির প্যাড। ডান দিকে প্রেরকের ঠিকানা। বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট হসপিটাল, বাকুঁড়া, পশ্চিম বাংলা। লিখেছে, অশ্ৰুদি, তোমার সাথে আমার পরিচয় অতি সামান্য সময়ের। সেদিন যতদুর মনে হয়, আমাকে তুমি তপতীদি বলে ডেকেছিলে। আমি তোমাকে কি ভাবে ডেকেছিলাম মনে করতে পারছি না। পরিচয়টা ক্ষণিকের হলেও অন্তরের একটা টান ছিল। সেই অধিকারে দিদি বলেই সম্বোধন করলাম। প্রায় মাস খানেক হল আমাদের হাসপাতালে একজন পেসেন্ট ভর্তি হয়েছেন। ওকে দেখে প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। অবিকল যেন রেহানা। কিন্তু ও বলল ওর নাম রুকসানা। তাতে আমার সন্দেহ কিছুতেইনা মেটার জন্য বলি, আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন। আপনি কিছুতেই রুকসানা নন। আপনি রেহানা। আপনার বোন সেলিনা। প্রান্তিক আপনার বন্ধু, অশ্রুকণা আপনার বন্ধু। আমি তপতী। আমাদের হাসপাতালে আপনার বোন দীর্ঘদিন ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু তার ওই এক কথা, না না, আমি এদের কাউকে চিনিনা, আমি রুকসানা।
প্রান্তিককে লিখব ভেবেছিলাম। কিন্তু জেনেছি ও সেলিনাকে বিয়ে করেছে। যাকে সে মন থেকে ভুলে গেছে কেন তার জীবনে আর এই বিপত্তি ঘটাই? নীলাঞ্জনা পিসি এবং মিনতি পিসিকেও একই কারণে বলতে পারিনি, যদি আমার ভুল হয়। তাই তোমাকে বলছি অশ্রুদি, মিনতি পিসির কাছ থেকে তোমার ঠিকানা নিয়েছি। একটু দেরি হয়ে গেল। যদি তাড়াতাড়ি আস, দেখা হবে। শরীরের অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। কিন্তু রেহানার মিষ্টি মুখটা চির উজ্জ্বল। তারপর কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন। কেমন আছ? প্রান্তিক ও সেলিনা কি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে? ওদের সঙ্গে যদি দেখা হয় বলে আমার কথা।
